মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

“পূজ” ধাতুর অর্থ বর্ধনশীলতা ৷ সেখান থেকে এসেছে “পূজা” ৷ “উৎসব” শব্দের অর্থ “উৎস মুখে গমন” ৷ দুর্গা পুজোর সাংসারিক ও আধ্যাত্মিক দুটি ব্যাখ্যা ৷ তাঁর দশ হাত দশদিকের কর্মযোগ্যতা বা দক্ষতাকে বোঝায় ৷ একজন নারী স্বয়ং দুর্গা হয়ে ওঠে যখন সংসারের সর্বক্ষেত্রে দক্ষতা দেখায় ৷ মা দুর্গা ঐক্য ও সংহতিরও প্রতীক ৷তাই সঙ্গে থাকেনসর্বক্ষেত্রের দেবদেবী লক্ষ্মী ,গণেশ , সরস্বতী ও কার্তিক ৷ একতা ও পারদর্শিতা অর্জনই আমার মতে দুর্গা পুজোর লক্ষ্য ৷ আজ মহাসপ্তমী – নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন , সপ্তম্যাদিককল্পারম্ভ মহাস্নান ও সপ্তমী বিহিত পূজা ৷ আমাদের জানা উচিত ” নবপত্রিকা ” আসলে কি ৷ অনেকের মতে আমাদের পুজো এসেছে প্রকৃতি পুজো থেকে ৷ লাল পাড় সাদা শাড়ি পরিহিত ঘোমটা ঢাকা একটি কলা গাছকে আমরা”নবপত্রিকা” বলি ৷ গণেশের পাশে রাখা হয় বলেভুল করে অনেকে ভাবে উনি গণেশের পত্নী “কলা বউ” ৷ আসলে তিনি “মা দুর্গা”, গণেশের মা ৷ গণেশের দুই স্ত্রী হলেনঋদ্ধি ও সিদ্ধি ৷ শস্যদেবীকে দেবী দুর্গার সাথে একাত্ম হয়ে গেছে ৷ দুর্গা পুজো শুধু একান্নবর্তী পরিবারকে মনে করায় না ৷ সব জৈব বৈচিত্র্যকে স্মরণ করায় ৷ খাদ্য খাদক সর্ম্পককেও মনে করায় ৷ তাইতো লক্ষ্মীর ধানের পাশে থাকে গণেশের ইঁদুর আর তার পাশে থাকে লক্ষ্মীর পেঁচা ৷দুর্গার হাতে থাকা সাপের পাশে থাকে কার্তিকের ময়ূর ৷ সিংহ তলায় থাকে মহিষ ৷ সবার উপরে থাকেন মহাদেব শিব ৷ আর জগত সংসার চালান মহিষাসুরমর্দ্দিনী মা দুর্গা ৷ নবপত্রিকার আক্ষরিক অর্থ নয়রকম পাতা ৷ প্রকৃতপক্ষে ন’টি উদ্ভিদ দিয়ে তা তৈরী ৷”রম্ভা কচ্চী হরিদ্রাচ জয়ন্তী বিল্ব দাড়িমৌ ৷ অশোক মানকশ্চৈব ধানঞ্চ নবপত্রিকা ৷অর্থাৎ গাছগুলি হল – রম্ভা বা কলা , কচু , হরিদ্রা বা হলুদ , জয়ন্তী , বিল্ব বা বেল ,দাড়িম্ব বা দাড়িম অর্থাৎ ডালিম , অশোক , মান বা মানকচু ও ধান ৷এই গাছগুলি আমাদের রোজকার জীবনের সঙ্গে যুক্ত ও ভেষজ গুণ সম্পন্ন ৷প্রকৃতির অক্ষুন্ন রাখতে ও নতুন শক্তিকে জাগ্রত করতে সনাতনী সাধকরা মনে হয় নবপত্রিকার বিধান দিয়েছেন ৷একটি পাতা সহ কলাগাছের সঙ্গে ঐ আটটি গাছ দু’টি বেলের সাথে সাদা অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে শাড়ি পড়িয়ে ঘোমটা দিয়ে বৌ এর মত সাজানো হয়৷মানের দেবী চামুন্ডা ছাড়া আর আটটি গাছের দেবীদের আলাদা করে পুজো হয় না ৷ একসাথে হয় ৷অন্য দেবীরা হলেন – কলা- ব্রহ্মাণী , কচু – কালী , হলুদ- ঊমা , জয়ন্তী – কার্তিকী , বেল – শিবা , দাড়িম – রক্তদন্তিকা , অশোক- শোকরহিতা এবং ধান – লক্ষ্মী ৷ এই নয়টি দেবী একত্রে “নবপত্রিকা বাসিনী নবদুর্গা “৷ মহাসপ্তমীর ঊষা লগ্নে কোন নদী বা পুকুর বা মন্দিরে পুরোহিত কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান স্নান করাতে ৷এই স্নান আসলে নয়টি গাছের নয় বৃক্ষলতাগুলির মধ্যে অধিষ্ঠাত্রী নয়টি দেবীর স্নান ৷ পিছনে ঢাক ,কাঁসি বাজাতে বাজাতে বাদ্যকর ও উলু ও শঙ্খধ্বনি দিতে দিতে মহিলারা অনুগমন করেন ৷শাস্ত্রবিধি অনুসারে নবপত্রিকা স্নানের পর লাল পেড়ে শাড়ি পরিয়ে গণেশের ও দুর্গার ডান দিকে একটি কাঠের বেদী বা সিংহাসনের উপর নবপত্রিকাকে রাখা হয়া৷ এরপর দর্পণ বা আয়নায় হয় দেবীর মহাস্নান ৷ নবপত্রিকা প্রবেশের আগে পত্রিকার সামনে করা মা চামুন্ডার আবাহন ও পূজা ৷ এরপর থেকে পুজোর বাকী দিনগুলিতে অন্য দেবদেবীর সঙ্গে পূজিতা হন নবপত্রিকা ৷ মার্কন্ডেয় পুরাণে নবপত্রিকার কথা নেই ৷ নেই দেবী ভাগবতেও ৷সেখানে যদিও নবদুর্গার উল্লেখ আছে ৷তবে কালিকা পুরাণে রয়েছে পত্রিকাপূজার নির্দেশ ৷ বৃহন্নদিকেশর পুরাণে নবপত্রিকা পুজোর বিবরণ আছে ৷কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে লিখেছেন রামচন্দ্র নবপত্রিকা পূজা করেছিলেন ,” বাঁধিলা পত্রিকা নব বৃক্ষের বিলাস “৷”নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ”৷ “হ্রং দুর্গায়ৈ নমঃ ৷সবাইকে মহাসপ্তমীর অভিনন্দন ৷