ভাদু উৎসব #BHADU FESTIVAL

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

“ভাদু উৎসব /পরব” , পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া , বাঁকুড়া , বীরভূম , পশ্চিম মেদিনীপুর , ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম বর্ধমান এবং ঝাড়খন্ডের রাঁচি ও হাজারী বাগ জেলার অন্যতম প্রধান হিন্দু ধর্মীয় তথা লোক উৎসব ৷ মনে করা হয় এসব এলাকার পূর্বতন শিকার ও পরের কৃষি উৎসব পরিণত হয়েছে ভাদুতে ৷ ভাদ্র মাসের শুরু থেকে আরম্ভ হয়ে শেষ হয় ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির ভাদু পুজো বা ব্রত ৷পয়লা ভাদ্র একটি কুলুঙ্গিতে পাত্রে ফুল দিয়ে কুমারী মেয়েরা এই উৎসব শুরু করে ৷ ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে আনা হয় ভাদুর মূর্তি ৷ সংক্রান্তির আগের দিন রাতে তারা সারা রাত জাগে বলে “ভাদু -জাগরণ” ৷ পরদিন সারাদিন ধরে মেয়েরা প্রতিমা সহকারে সারা গ্রাম ঘোরে ৷এখানে মরদরা মানে পুরুষরা ব্রাত্য ৷ তবে , নারীর স্বর ও শরীরী ভঙ্গি লক্ষ্য করে যুবকরা বলে ,” ভাদু পুজোর দিনে , সারা রাত উড়াব ফুর্তি হে , কাটাব জাগরণে , বাকি আজ রাইখনা কিছু , যা ইচ্ছা মনে, রাখো লোক লজ্জা , দাও দরজা “! যেন বিরহী রাধিকা ৷ সঙ্গে চলে ভাদু গান ও নাচ ৷ কোন মন্ত্র নয় ৷ কোথাও কোথাও পুরোহিত ভাদু প্রতিমার পুজো করেন ৷ তবে , অধিকাংশ জায়গায় গানেই আবাহন ও বিসর্জন হয় ভাদুর ৷ “ভাদুকে আসছে লিতে মহুলবনের শ্রীনিবাস / যদি ভাদু যাব বলে আমরা লিব বনবাস “৷ “ভাদু আমার ছুটু ছেলে ” , “” ও ভাদু লে লে লে পয়সা দু আনা ” , “ভাদু আমার গরবিনী “, “আমার ভাদুর গলায় ফুলমালা ” এসব রাঢ় বঙ্গের জনপ্রিয় ভাদু গান ৷ভাদ্র সংক্রান্তিতে ঠাকুর অর্থাৎ ভাদু বিসর্জনের আগে মহিলারা করে “ভাদু চুমানো ” বা বরণ ৷ পয়লা আশ্বিন হয় জলাশয়ে ভাদু বিসর্জন ৷ আর্যেতর সমাজের হিন্দু আয়ণ বলে কোন কোন গবেষক বললেও লোকজ উৎসবতো হিন্দু ধর্মেরই অঙ্গ ৷ নানা জায়গায় বিভিন্ন রকম ৷ ভাদ্র মাসের লক্ষ্মী পুজো এখানে ভাদু বলে পুজিত হয় ৷ এখন তিনি শস্যদেবী ৷ কুললক্ষ্মী তথা ভাগ্যলক্ষ্মী ৷ ভাদুর জন্ম সময় মোটামুটিভাবে সিপাহী বিদ্রোহের সমকালীন ৷ পঞ্চকোটের রাজা সিপাহী বিদ্রোহে শরিক হয়েছিলেন ৷ ভাদুর ভালো নাম ভদ্রাবতী বা ভদ্রেশ্বরী ৷ তবে, কোথায় এর উৎপত্তি এ নিয়ে মতান্তর আছে ৷ তবে, অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস পুরুলিয়ার কাশীপুরের পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের মেয়ে ছিলেন ভাদু ৷ তাঁর মায়ের নাম কলাবতী বা অনুপকুমারী ৷ ১৮৪১ সালে ভদ্রাবতীর জন্ম৷ কেউ কেউ সীতার মত ভাদুকে এক চাষী তাঁর ক্ষেতে পরে থাকতে দেখে কুড়িয়ে এনে বড় করে ৷কিন্তু , রূপে গুণে ভাদু যেন গরিব কৃষকের কুঁড়েতে বেমানান ৷ তাই কাশীপুরের রাজা ভাদুকে নিজের মেয়ে হিসাবে দত্তক নিয়েছিলেন ৷ সরকারী নথিতে নীলমণি বাবুর দশটি ছেলের কথা থাকলেও মেয়ে আছে লেখা নেই ৷ আবার কারো মতে ভাদু তাঁর তৃতীয়া কন্যা ৷ লোক বিশ্বাস সতেরো বর্ষীয়া রূপবতী গুণবতী ভদ্রাবতীর বিয়ের ঠিক হয়েছিল ৷ বর বিয়ে করতে আসার সময় ডাকাতদের আক্রমণে প্রাণ হারালে ভাদু মন্দিরে ধ্যানস্থ অবস্থায় ১৮৫৮ সালে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন ৷ তারপর ভাদুর স্মৃতিকে ধরে রাখতে রাজার আনুকূল্যে রাজ্য জুড়ে ধূমধাম করে ভাদু উৎসবের সূচনা হয় ৷ মীরা বাঈয়ের মত ভাদু ছিলেন কৃষ্ণভক্তি পরায়ণা ৷ভাদ্রমাসে গড় পঞ্চকোট ও ছাতনার রাজাদের মধ্যে যুদ্ধে পঞ্চকোট রাজা জয়ী হলে এই উৎসব আনন্দোৎসবের চেহারা নেয় ৷ ভাদুর প্রধান অনুষ্ঠান এর সঙ্গীত ৷ এখন ও অলিখিত এই লোক গান বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সমসাময়িক বিষয় , বারোমাস্যা , ইতিহাস , ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গরিমাকে তুলে ধরে ৷ তবে , প্রথমে এই গান ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ৷ পঞ্চকোট রাজ পরিবারের ধ্রুবেশ্বরলাল সিংদেও , প্রকৃতীশ্বরলাল সিংদেও এবং রাজেন্দ্রনারায়ণ সিংদেও ” দরবারী ভাদু ” সৃষ্টি করেন ৷ পাখোয়াজ ,হারমোনিয়াম , তবলা ও সানাই সহ মার্গ ধর্মী উচ্চ সাহিত্য নির্ভর ভাদু গান শুরু হয়েছিল ৷ রাজ পরিবারের দরবারী গান নেমে এসেছে গরিব , অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মানুষের মধ্যে ৷ এখনকার প্রচলিত ভাদুতে পাঁচালি , টুসু , ভাদা বা ভাজা গান , ঝুমুর ,কীর্তন , বাউল , আগমনী , বিজয়া ও চুটকির প্রাধান্য ৷ সমাজ জীবনের নানা অসঙ্গতির সরস আকারে প্রকাশ ৷ তবে , এতে প্রেম কথা ও রাজনৈতিক বক্তব্য রাখা হয় না ৷ ভাদু পরবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এতে উপোস বা উপবাসের বিধান নেই ৷ সবটাই আনন্দ , উল্লাস , গান ও নাচের সঙ্গে ভক্তির মেলবন্ধন ৷ ভাদু উপলক্ষ্যে দেখেছি লাল মাটির দেশে বিশাল আকৃতির মিষ্টি বিশেষত জিলিপি , মতিচুর , গজা , খাজা ইত্যাদি তৈরী হয় ৷ হয় পেট পুরে পঞ্চাব্যঞ্জন সহকারে খাওয়া দাওয়া ৷ আগেই বলেছে ভাদু আসলে কোথাকার এনিয়ে মতভেদ আছে ৷ সাংবাদিক ও লোক গবেষক হিসাবে ঘুরে বেড়িয়েছি সেসব জায়গা ৷ যেমন বীরভূমের হেতমপুরের রাজ বাড়ী দেখতে গিয়ে সেখানকার মানুষের কাছে শুনেছি ভাদু বা ভদ্রাবতী হলেন হেতমপুরের রাজকন্যা ৷ বর্ধমানের রাজপুত্রের সাথে তাঁর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ৷ কিন্তু , বীরভূমের ইলামবাজারের কাছে চৌপারির শালবনে ডাকাতদের আক্রমণে বর ও বরযাত্রীরা নিহত হয় ৷ শোক সামলাতে না পেরে ভাদু ঐ রাজপুত্রের সঙ্গে একই চিতায় সহমরণে যান বা সতী হন ৷ আবার একটি কাহিণী আছে ৷ ধান ক্ষেতের আলে কুড়িয়ে পেয়ে লারা গ্রামের মোড়ল ও তাঁর বৌ ভাদুকে পালন করেন ৷ কিন্তু রাজা ঘোষণা করেন এ রাজকন্যা এবং কেড়ে নেন ভাদুকে ৷ রাজ পরিবারে বড় হওয়া ভাদুর সঙ্গে গ্রামের কবিরাজের ছেলে অঞ্জনের ভাব হয় ৷ রাজা অঞ্জনকে বন্দী করলে ভাদু নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেন ৷ পাগলী হয়ে ভাদু রাস্তা রাস্তায় গান গেয়ে ঘুরতে থাকেন ৷ গানে মুগ্ধ হয়ে রাজা অঞ্জনকে মুক্তি দিলেও ভাদুকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ শোনা যায় নদীতে ডুব দিয়ে ভদ্রাবতী আত্মঘাতী হয়েছেন ৷ এরপর ছড়িয়ে ভাদু গান। মানুষ ভাদুর প্রতিমা গড়ে পুজো শুরু করেন ৷ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য লোকজ ভাবনার আত্তীকরণ সনাতন হিন্দু ধর্মের বৈশিষ্ট্য ! এভাবে নানা ধর্মীয় উৎসব সনাতনী সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে ।