বেল গাছ – হিন্দু ধর্মে ও আয়ুর্বেদে

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

সংস্কৃত বিল্ব বাংলায় হয়েছে বেল ৷ বেলের বিজ্ঞান সম্মত নাম Aegle marmelos . রুটাসি বা লেবু পরিবারের ফল ৷ ইংরেজিতে বলে Marmelos fruit বা Wood Apple বা Bell. সারা বছর গাছে বেল হয় ও নতুন পাতা জন্মায় তাই এর আরেক নাম সদাফল ৷ বেল গাছের তিনটি পাতাকে তিনটি চোখ বলে ৷ একত্রে থাকা তিনটি পাতা হল ত্রিদেব বা ব্রহ্মা , বিষ্ণু ও মহেশ্বর ৷ সেরকমই বেলডাল সৃষ্টি , স্থিতি ও লয়কে বোঝায় ৷ হিন্দুর কাছে বেলের তিনটি পাতা পূজা , স্তোত্র ও জ্ঞান ৷ বেল গাছস্বতঃ, রজ ,তম এই ত্রিগুণের অধিকারী ৷ একসঙ্গে তিনটি পাতাই হল পরিপূর্ণ বেলপাতা ৷ সামনের অংশ হল অমুর্যাম ৷ শিব পুজোয় অবশ্য প্রয়োজনীয় বেলের আরেক নাম শ্রীফল ৷ তন্ত্র মতে বেল গাছ লক্ষ্মী স্বরূপ ৷ লক্ষ্মী শিব পুজো করার সময় শিব লুকিয়ে দুটি পদ্ম তুলে নিলে পদ্ম সদৃশ নিজের স্তন কেটে শিবকে অঞ্জলি দিতে গেলে শিব আবির্ভূত হয়ে মা তুমি তোমার অঙ্গ ফিরে পাবে ৷ তোমার অঙ্গের অনুরূপ একরকম ফলের গাছ পৃথিবীতে জন্মাবে তার নাম “বেল গাছ” ৷ তার পাতা হবে আমার ত্রিনয়ন ৷ তোমার নাম স্মরণ করে লোকে ঐ বৃক্ষকে বলবে “শ্রী” ৷ তার ফলকে “শ্রীফল” ৷ পাতাকে “শ্রীপত্র” বলবে ৷ এর পাতা দিয়ে আমার পুজো করলে আমি সর্বাধিক তুষ্ট হব ৷ এভাবে শিবের কৃপায় বৈশাখের অক্ষয় তৃতীয়ার তিথিতে মর্ত্যে “বেলবৃক্ষের ” জন্ম হলো ৷ আবার শিব পুরাণ কাহিনী অনুসারে মা দুর্গার কপালের ঘাম মাটিতে পড়ে জন্ম হয়েছিল বেল গাছের ৷ একবার দেবী পার্বতী তাঁর তিন সখী জয়া , বিজয়া ও জয়ন্তীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন৷ দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত ভগবতীর এতে কপালে ঘাম হয় ৷ এই স্বেদ বিন্দু বা ঘাম মাটিতে পড়ে জন্ম হয় বেলগাছের ৷ এই বিল্ব বৃক্ষ নামটিও পার্বতীর দেওয়া ৷ তারপর নিজের শরীরের নানা অংশ তিনি ঐ গাছের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করেন ৷ গিরিজা রূপে তিনি রইলেন শিকড়ে ৷ বেল ফলে থাকলেন কাত্যায়ণী হয়ে ৷ আর দুর্গা রূপে তিনি রইলেন ঐ ফুলে ৷ তাই এই গাছের অংশ দেবাদিদেব মহাদেবকে অর্পণ করা মানে ভগবতী পার্বতীকে শিবের কাছে দেওয়া ৷ শিবের মাথায় বেলপাতা দেওয়া মানে নিজের তিন গুণ , তিন লোক , সর্ব দেবতাকে সবকিছু সার্বিকভাবে অর্পণ করা ৷ বেলগাছের বাগান কাশী বা বারাণসীর মত পবিত্র ৷ বনে , নদীর তীরে কিংবা শ্মশানে বেল গাছ থাকলে তাকে সিদ্ধ পীঠ ধরা হয় ৷ শিব জ্ঞানে বেল গাছকে রোজ জল দিতে হয় ও অর্চনা করতে হয় ৷ সনাতনী শাস্ত্রে বেলগাছ কাটা নিষেধ এবং যজ্ঞ ছাড়া কোন জ্বালানী রূপে ব্যবহার করা পাপ ৷ বেল গাছ বিক্রি করতে নেই ৷ তবে , যজ্ঞের জন্য বেলকাঠ দান ও বিক্রি করা যায় ৷ ছেঁড়া , ফাটা বা অসম্পূর্ণ বেল পাতা ভগবানকে অর্পণ পাপ ৷ যজ্ঞে ১০৮ টি বেলপাতা দিতে হয় ৷বেলগাছের ছায়া মাড়াতে নেই ৷ বেলগাছে পা দিলে লক্ষ্মী নাশ হয় ৷বাড়ীর ঈশান অর্থাৎ উত্তর – পূর্ব কোণে বেলগাছ গৃহস্থের সম্পদ প্রাপ্তি আনে ৷ বিপদ আপদ দূরে রাখে ৷ পূর্ব দিকে বেলগাছে গৃহে লক্ষ্মী লাভ হয়, শান্তি আনে ৷ চুরি ডাকাতি , রাজ ভয় , ভূত প্রেত সহ সব থেকে মুক্তি দেয়৷ পশ্চিমে বেল গাছ লাগালে সুসন্তান লাভ হয় ৷ দক্ষিণ দিকে বেল গাছ থাকলে দূঘর্টনা হয় না বলে হিন্দুরা মনে করেন ৷ বাড়ীর মাঝখানে বেল গাছ বসাতে মানা করা হয়েছে ৷ অধ্যাত্ম গুণ ছাড়াও বেলের রয়েছে হরেক স্বাস্থ্যগুণ ৷পুষ্টিকর ও উপকারী এই ফল নানা রোগে ধন্বন্তরী ৷ এতে থাকে অর্ধেক পরিমাণ আমিষ ৷ এছাড়া স্নেহ পর্দাথ , শর্করা , ক্যারোটিন , থায়ামিন , রিবোফ্ল্যাবিন , নিয়াসিন , এসকর্বিক ও টারটারিক এসিড ৷ বেলের ল্যাকসটেভি উদরাময় বা ডায়রিয়া ও আমাশয়র মত পেটের গোলমালে তুলনাহীন ৷ এতে বিটা ক্যারটিন থাকায় ঠান্ডা জলে মিছরি সহ খেলে যকৃৎ বা লিভারের রোগ নিরাময় করে ৷ ওজন কমায় ৷ এর ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ৷ স্কার্ভি রোগে কাজ দেয় ৷ কিডনিকে ভাল রাখে ৷ হৃদপিন্ডের দূর্বলতায় গাছের শিকড় দুধে মিশিয়ে খেতে হয় ৷ রক্তার্শে সাদা দইয়ের সঙ্গে কাঁচা বেল ফলদায়ী ৷ বেলের ফুল গোলমরিচ দিয়ে খেলে তৃষ্ণা , বমি ও অতিসার প্রশমিত হয় ৷ মধুর সাথে মিশিয়ে খেলে চোখের ছানি ও চোখ জ্বালায় কাজ দেয় ৷এমনকি কোলন ক্যানসারর আশঙকা কমায় ৷ বেলের সরবত শরীর ঠান্ডা করে ৷ নাক দিয়ে রক্তপাতে ভাল কাজ দেয় বলে আয়ুর্বেদে বলা হয়েছে ৷ উচ্চ রক্তচাপেও বেলফল উপকারী ৷ মিছরি বা চিনি দিয়ে বেল ফল খেলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে ৷ বেল গুঁড়ো দুধে মিশিয়ে খেলে রক্তাল্পতা দূর হয় ৷ বেলগুঁড়ো ক্ষত স্থানের সংক্রমণ কমাতে পারে ৷ গায়ের দুর্গন্ধ দূর হয় বেল পাতা সিদ্ধ করে গায়ে মালিশ করলে৷ সরিষার তেলে মিশিয়ে মালিশ করলে বাতের ব্যথা কমে৷ সর্দ্দি ও জ্বরজ্বর ভাবে মধুসহ বেল পাতা বেশ কাজে আসে ৷ শ্বেতি রোগ উপশমেও কাজ দেয় ৷ পাকা বেল কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী কিন্তু , হজম করা কঠিন ৷ কাঁচা বেল পোড়া ও শুকনো উপকারী ৷ আর একটানা দীর্ঘকাল বেল খেলে যৌন শক্তি হ্রাস পায় ৷ অথচ , বেল গাছের শিকড় সামান্য জিরে বাটার সঙ্গে খেলে শুক্র গাঢ় হয় ৷ বেলপাতা রেডিও প্রটেক্টিভ ৷ তেজক্রিয়তা অনেকটা রোধ করতে পারে বলে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে ৷ শাস্ত্র মতে হরেক গুণের জন্য রোজ এই মন্ত্র বলে বেলপাতা চয়ন করতে হয়৷
” নমঃ বিল্বতরবে সদা শঙ্কররূপিণে ৷
সকলানি মমাঙ্গানি কুরুম্ব শিবহর্ষদ “৷