বিশ্বকর্মা পুজো ও ঘুড়ি উৎসব

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

বিশ্বকর্মা ও ঘুড়ি ওড়ানো সমার্থক হয়ে গেছে ৷ ভারতের কোথাও কোথাও উত্তরায়ন্তির দিন ” ঘুড়ি উৎসব ” হয় ৷ পৃথিবী ব্যাপি এটি একটি মজার খেলা ৷চীন , জাপানের মত না হলেও ভারতবর্ষেও ঘুড়ির প্রচলন বেশ পুরানো ৷ মানুষের উপরের ওঠার সখ অন্যভাবে মিটছে বলে হয়তো ঘুড়ির জনপ্রিয়তা কমছে৷ ঘুড়ি হলো – কাগজ , সিল্কের কাপড় বা কোন পাতলা জিনিস দিয়ে সমদ্বিবাহু আকৃতির একটি খেলনাহলো ” ঘুড়ি ” ৷ যার মাঝে থাকে সরু কঞ্চি ৷ ভারসাম্য রাখতে অনেক সময় লেজ জুড়ে দিতেহয় ৷ বিশ্বকর্মা সমস্ত সৃষ্টি কর্মের দেবতা ৷ আমরা দেবতার অবস্থান বুঝি আকাশে ৷ তাই বোধ হয় এই সময় ঘুড়ি ওড়ানো হয় ৷ আমার ছোটবেলা মামারবাড়ীর যে গ্রামে কেটেছে সেই পাটুলীতে সেখানে ঘুড়ি ওড়ানো হত উত্তরায়ন্তির মেলায় পয়লা মাঘ ৷শ্রদ্ধেয় ননী মাস্টার মশাই দু পয়সা দামের ছোট্ট ঘুড়ি করতেন ৷ আমরা বলতাম “ননী ফিচিক” ৷ আমাদের ছোটদের কপালে তাই জুটতো ৷ পাটুলি দাস পাড়ায় ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে কয়েকবার দূর্ঘটনা হয়েছে ৷ গুজরাটে ও নেপালে সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে ঐসময় ঘুড়ি ওড়ে ৷ কেউ বলে আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে গ্রিসের টারাস্টাস শহরের ” আর্কিটাস ” আবার অন্য মতে ২২০০ বছর আগে চীনের ওয়ে ফ্যাং শহরের সেনাপতি “হান সিন ” প্রথম ঘুড়ি তৈরি করেছিলেন ৷ আবার ২৮০০ বছর আগে ছুলছিউ যুগে চীনা দার্শনিক” মুওছু ” প্রথম কাঠের তৈরী একরকম ঘুড়ি নির্মান করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয় ৷মোজি ও লু বান নামের দুই বন্ধু প্রথম ঘুড়ি আকাশে উড়িয়েছিলেন ৷ তবে , চীনই ঘুড়ির জন্মদাতা ও প্রচারকএই ধারনাই প্রতিষ্টিত হয়েছে ৷আমাদের মত দক্ষিণপূর্ব এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে চীন থেকেই ঘুড়ি এসেছে ৷ এমন কি ইউরোপেও ঘুড়ি পৌঁছায়চীন ঘুরে আসা ইতালীয় পর্যটক মার্ক পোলোর হাতধরে ১৬০০ বছর আগে ৷মধ্য যুগে ভারতবর্ষে ঘুড়িরপীঠস্থান ছিল নবাবী শহর “লক্ষ্ণৌ” ৷ সেখানকার নবাব বিলায়েত আলির হাত ধরে কলকাতায় ঘুড়ির আগমন ৷ উনবিংশ শতকের বাবু কালচারেরঅন্যতম অঙ্গ ছিল ঘুড়ি ওড়ানো ৷ ঘুড়িতে একশো টাকার নোটও বেঁধে অর্থের গরিমা দেখানো হতো ৷অনন্ত আকাশের বিশালতা যেমন মানুষকে টেনেছে , তেমনি চিরন্তন আকাশের ওঠার শখ ৷পাখির মত উড়তে চাওয়া থেকে ঘুড়ি , বেলুন বা প্লেন থেকে মহাকাশযানে মানুষের জয়যাত্রা এগিয়েছে ৷ ঘুড়ি খানিকটা সেই শখ মিটিয়েছে ৷ মানুষের অবসাদ মোচনেও ঘুড়ি সাহার্য্য করে বলে মনোবিজ্ঞানের ছাত্র তথা একজন চিকিৎসক হিসাবে দেখেছি ৷তাই , আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ঘুড়ি ওড়ানো ৷যোগাযোগ স্বল্পতার যুগে ঘুড়ি যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের এমনকি প্রেমিক – প্রেমিকার মধ্যে যোগাযোগের কাজে লেগেছে ৷ ১৭৪৯ সালে আলেকজান্ডার উইলসন ঘুড়িতে থার্মোমিটার বেঁধে আকাশের তাপমাত্রা মাপেন ৷ আবার ১৯০১সালে ইটালির মার্কনী ঘুড়িতে এন্টেনা লাগিয়ে আকাশের ম্যাগনেটিক ওয়েভ ধরতে সর্মথ হন ৷আবার বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি উড়িয়ে আবিষ্কার করেন বজ্রপাতের বিদ্যুৎ ও কৃত্রিম ভাবে তৈরী বিদ্যুৎ এক ৷ এখন বৃহত্তম ঘুড়ি উৎসব হয় অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বান্দাই সৈকতে ৷মালেয়েশিয়ায় ঘুড়ি উড়িয়ে “ভূত” তাড়ানো হয় !বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুড়ি উৎসবের হরেক নাম – থাইল্যান্ডে ” সংক্রান” , মায়ানমারে ” থিং ইয়ান” ,লাওসে ” পিমলাও ” , নেপালে” মাঘী ” প্রভৃতি ৷হোলিতে এলাহাবাদে , দীপাবলিতে লক্ষ্ণৌ এ, জন্মাষ্টমীতে বেরিলি , মথুরা ও বৃন্দাবনে ,সরস্বতী পুজোয় বালি ও উত্তরপাড়ায় এবং আমার মামারবাড়ী বর্ধমানের পাটুলীতে পয়লা মাঘ উত্তরায়ন্তিতেঘুড়ি ওড়ানো হয় ৷ ভারতে ঘুড়ি উৎসব সবচেয়ে জনপ্রিয় গুজরাটের রাজধানী আহমেদাবাদে ৷ মকর সংক্রান্তির দিন ভোর থেকে সেখানে লাখো ঘুড়িপ্রেমীর ঢল নামে ৷২০১৬ সাল থেকে জানুয়ারী মাসে হায়দ্রাবাদের প্যারেড গ্রাউন্ডে আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসব হচ্ছে ৷যেখানে ঘুড়ি তৈরী ও ওড়ানোর ওয়ার্কশপ হয় দেখে এসেছি ৷অনুষ্ঠিত হয় লাটাই নামের কাঠের একটা জিনিসে সুতো জড়িয়ে ঘুড়ি ওড়ানো ৷ সুতোয় আঠা – কাঁচের গুঁড়োা দিয়ে মাঞ্জা দেওয়া হয় ৷ আমরা ছোটবেলায়নিজেরা ভাঙ্গা কাঁচ গুঁড়ো করে মাঞ্জা দিতাম ৷ এখন সেখানেও ঘটেছে চীনা মাঞ্জার অনুপ্রবেশ ৷ বিভিন্ন ঘুড়ির এত রকম ভেদ আছে না দেখলে বোঝা যাবে না ৷যেমন চৌরঙ্গী( চার রঙা), চাঁদিয়াল( পেটে চাঁদ আঁকা) , পেটকাটা ( দো রঙা) ইত্যাদি ৷ আধুনিক উপকরণ দিয়ে তৈরী ডায়মন্ড বা এডি ঘুড়ি খুব ভাল বাতাসের পরিসীমায় থাকতে পারে ৷ তাই , এখন বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ৷যদিও ডায়মন্ড ঘুড়ির পুরানো রূপটির জন্ম ১৮৫০ সালে ৷অনেক জায়গায় ট্রেনের গায়ে বার্ন ডোর ঘুড়ি লাগিয়ে আনন্দ করা হয় ৷ ১৮০০ সালে বড় আয়তক্ষেত্র আকারের বার্ন ডোর ঘুড়ি তিন কাঠির ৷ ১৮০০ সাল থেকে আমেরিকায় প্রচলিত ৷ডোপিরো ঘুড়িতে লেজ থাকে না ৷ দুটি ডানা মেলে আকাশে উড়ে যায় ৷আরেক রকম হালকা বায়ু ঘুড়ি হল রোলার ঘুড়ি ৷১৯৩০ সাল থেকে বিশ্ব জুড়ে প্রচলিত ৷সাগর বেলায় প্যারাসুটের মত স্লেড ঘুড়ি উড়তে দেখা যায় ৷ফ্রেম ছাড়া তৈরী এই ঘুড়ির আবিষ্কারক মার্কিন নাগরিক উইলিয়াম এলিসন ৷সমুদ্র সৈকতে জনপ্রিয় আরেক ঘুড়ি , অক্টোপাস ঘুড়ি ৷ ১৯৫০ সালে উনি প্রথম মির্মাণ করেন ৷বাক্সের আকৃতি বাক্স ঘুড়ির ডিজাইনের জন্য অনেক জায়গায় দারুন জনপ্রিয় ৷ ভারতের কয়েক শহরে দেখেছি ডেল্টা ঘুড়ি ৷ সর্বদা রেখার কোণে উড়তে পারে এই স্টান্ট ঘুড়ি ৷দুর্দান্ত ফ্লাইয়ার ডেল্টা ঘুড়ি খুব পাতলা হওয়ায় সহজে আকাশে উঠতে পারে এবং অন্য ঘুড়ি কেটে দিতে পারে ৷মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যানার , জাপানে ওয়াউ বালং ও চীনে ফ্লাইং ড্রাগন ঘুড়ি সবচেয়ে জনপ্রিয় ৷বর্ধমান রাজ মহতাব চাঁদ বর্ধমান শহরে ঘুড়ি উৎসব চালু করেছিলেন ৷দেব কারিকর বা স্থপতি বিশ্বকর্মার স্মরণে ঘুড়ি উৎসব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ৷অন্য খেলার মতঘুড়ি খেলারও নীতি নিয়ম আছে ৷ আছে “ভোকাট্টা” র প্রতিযোগিতা ৷তবে , দক্ষিণ কোরিয়াতে নেই মাঞ্জা , না আছে ভোকাট্টা ৷ শুধু আনন্দের জন্য সেখানে ঘুরি ওড়ে ৷ কেউ কাউকে কাটে না ৷ চীনের ওয়ে ফ্যাং শহরে রয়েছে “বিশ্ব ঘুড়ি ফেডারেশনের ” সদর দপ্তর ৷ বেলজিয়ামে অক্টোপাস , বিগ ব্লু বিস্ট ইত্যাদি বিরাট সাইজের ঘড়ি পাওয়া যায় ৷ আসুন সবাই ঘুড়ির মত আনন্দের খেলায় মেতে উঠি ৷ তবে , চীনা মাঞ্জায় ঘুড়ি ওড়ানোয় ঘুড়ি না কাটলেও পথচলতি মানুষের গলা কেটেছে ৷ যা বন্ধ হওয়া দরকার ৷ বিষ্ণুর ইচ্ছা হয় বিশ্ব সষ্টির ৷ তাই ব্রহ্মার সৃষ্টি করেন ৷ ব্রহ্মার নাভি থেকে সৃষ্টি হয় ” দেবানাং কার্যসাধক” – বিশ্বকর্মা ৷ইনি স্বর্গ , মর্ত্যর নির্মাতা ৷চতুঃষষ্টি কলার অধিষ্ঠাতা উপবেদ , স্থাপত্য বেদের প্রকাশক ৷তাঁর পাঁচ মুখ , দশ হাত ৷ কিন্তু , আমরা বর্তমানে পুজো করি বাংলার বিশিষ্ট কর্মকার নেতা হরষিত কেশরী রায়ের কল্পিত মূর্তি ৷দৈত্যরাজ প্রহ্লাদের মেয়ে বিরোচনা বিশ্বকর্মার স্ত্রী ৷মেয়ে সংজ্ঞা ৷ বিষ্ণু পুরাণ মতে , বিশ্বকর্মার পিতা হলেন অষ্টবসুর সপ্তম প্রভাষ ৷ মা যোগসিদ্ধা ৷ নয় শ্রেণীর গণদেবতার অন্যতম আট বসু ৷ আসলে বিশ্বকর্মা সৃষ্টিশক্তির রূপক নাম ৷ যিনি ধাতা , বিশ্বদ্রষ্টা ও প্রজাপতি ৷ ৷ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে শাপভ্রষ্ট হয়ে মর্তে এক ব্রাহ্মণ রূপে তাঁর জন্ম হয় ৷শাপভ্রষ্ট দেব নর্তকী ঘৃতাচী গোপকন্যা হয়ে জন্মালে উভয়ের বিয়ে হয়া৷তাঁদের ৯ টি সন্তান ৷ লোহা , মৃৎ , শাঁখ , বয়ন , আঁকা , ফুল ,অলংকার , কাঁসা ও কাঠ শিল্পে পারদর্শী হন ৷ এঁরাই শিল্পী জনগোষ্ঠী হিসাবে পিতা বিশ্বকর্মার শিক্ষায় বড় হন ৷গ্রীষ্মের শেষে সূর্য মেঘ তৈরী করে সব কর্ম তথা কৃষি সংরক্ষণ করেন ৷ তাই সেই কর্মক্ষান্তিতে মানে ভাদ্র সংক্রান্তিতে তাঁর পুজো করা উচিত বলে বৃহৎ সংহিতাতে বলা হয়েছে ৷