নারায়ণ (NARAYANA)

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

“নার” – জল , “অয়ন” – অবস্থান ৷ মানে যিনি জলের উপর শয়ন করেন ৷ জল যেহেতু প্রথম সৃষ্টি তাই সৃষ্টিকর্তা নারায়ণ সেখানে অর্থাৎ ক্ষীরসমুদ্রে অনন্তনাগের উপর শয়ন করেন ৷ যদিও তাঁর চিরন্তন স্থান বৈকুন্ঠে ৷ তিনি সূর্য মন্ডলস্থিত পুরুষ ৷
“ধ্যেয়ঃ সদা সবিতৃমন্ডল মধ্যবর্তী
নারায়ণঃ সরসিক্তাসনসন্নিবিষ্ট ঃ
কেয়ূরবিন্ কনককুন্ডলবান্ কিরীটী “
হারী হিরন্ময় পুর্ধৃত শঙ্খ চক্র ৷”
৷ আবার “নর” অর্থ
মানুষ যেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে তিনি “নারায়ণ” ৷
নার + অয়ন = নারায়ণ ৷সংস্কৃত শব্দের সাধারণ , ভাবরূরার্থ ও যোগরূরার্থ মানে হয় ৷ “নার” শব্দের একটি মানে জল , দ্বিতীয় অর্থ পরম প্রকৃতি এবং তৃতীয় মানে হল ভক্তি ৷ অর্থাৎ উনি পরমা প্রকৃতির আশ্রয় পরম পুরুষ ৷ Cosmic Consiousness , Supreme Cognition. অয়ন মানে আশ্রয় ৷ তাই , দেবর্ষি নারদ সবসময় নারায়ণ , নারাপণ জপ করেন ৷ ৷মানবাত্মা নর দিব্যাত্মা নারায়ণের চিরসঙ্গী ৷”নারায়ণ ” উপলব্ধির প্রাথমিক বোধ ৷তিনি অসংখ্য জগত সৃষ্টি করে প্রতিটিতে জগদীশ্বর রূপে প্রবেশ করেছেন ৷ তিনিই
হলেন “মুকুন্দ” ৷ যিনি জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি বা মোক্ষ প্রদান করেন ৷ তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ
বা পুরুষোত্তম হরি ৷ হরি মানে হরনকারী ৷যিনি শোক , তাপ , দুঃখ হরণ করেন ৷ “হরি” আরেক অর্থে জ্যোতি বা আলো ৷অনাদির আদি পরমব্রহ্ম ভগবান ৷ তিনি “মাধব” – মা অর্থে লক্ষ্মী আর ধব মানে স্বামী বা লক্ষ্মীর স্বামী ৷জাগতিক বিশ্বের বাইরে নারায়ণ বৈকুন্ঠে অবস্থান করেন ৷যা পরম ধাম বা আনন্দময় স্থান ৷কোন কোন সময় তিনি ক্ষীরসমুদ্রে অনন্তনাগের উপর শুয়ে থাকেন ৷ যা স্থানীয় বৈকুন্ঠ নামে পরিচিত ৷তিনি পুরুষোত্তম বা শ্রেষ্ঠ পুরুষ ৷আদি শঙ্করাচার্য বলেছেন ” শালিগ্রামে বিষ্ণুবুদ্ধি বিজ্ঞান গ্রাহিকা ভবতি ” ৷ তাঁকে আমরা শালগ্রাম শিলারূপে পুজো করি ৷ শিবলিঙ্গ যেমন আমরা মহাদেবের প্রতীক রূপে পুজো করি ৷ নারায়ণের প্রতীক চিহ্ন হিসাবে তেমনি পূজিত হন শালগ্রাম শিলা বা নারায়ণ শিলা ( Ammonite fossile) ৷ নেপালে নারায়ণের মুক্তি তীর্থ হিমালয় পর্বতের ১২৫০০ ফুট উপরে মুক্তিনাথে কালি গন্ডকী নদী এবং হিমাচল প্রদেশের স্পিতিতে পাওয়া এক বিশেষ ধরনের জীবাশ্ম বা বজ্রকীট যাকে বিজ্ঞানে বলে মোলাস্কা ৷প্যালিয়োজোয়িক যুগের ৬০ কোটি বছরের পুরানো কালো ও সাদা রঙের ৷ একচক্রী , দ্বিচক্রী ও বহুচক্রী হয় ৷ মোট ৫১ রকমের ৷ এক চক্রী হয় ১৯ রকমের ৷ শিলার চক্র নষ্ট না হলে শিলা , ভাঙা বা ফাটা হলেও পুজো করা যায় ৷ আকৃতি ও রং দেখে শালগ্রামের নাম হয় -শ্রীধর , দামোদর , লক্ষ্মী জনার্দন প্রভৃতি ৷বেশ চক্র থাকবে গোমুখী ৷ শালগ্রাম স্বয়ং সিদ্ধ বিগ্রহ ৷ তাই দেবদেবীর বিগ্রহের মত এর প্রাণপ্রতিষ্ঠা বা বিসর্জন হয় না ৷ শবাসনা দেবী যেমন কালী ইত্যাদি ছাড়া শালগ্রামেও শিবলিঙ্গের মত সব দেবতার পূজা করা যায় ৷পঞ্চাঙ্গ স্বস্ত্যয়নের মধ্যে একটি হলো শালগ্রাম শিলায় তুলসী দান ৷ শালগ্রাম হলো স্থাপিত বা স্বয়ং প্রকাশিত ৷ পাথর , মাটি ,কাঠ , ধাতুর মূর্তি হলো প্রতিষ্ঠিত ৷ ৷ব্রহ্মান্ড একটি শালগ্রাম ৷তামার পাত্রে নারায়ণ শিলা রেখে শাঁখের জল দিয়ে আমরা শ্রীভগবানকে স্নান করাই ৷
“ওঁ সহস্র শীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ ৷
স ভূমি সর্বতঃ বৃত্বা অত্যতিষ্ঠৎ দশাঙ্গুলম ৷৷
ওঁ নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি ৷
তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ ৷
নার মানে মোক্ষ আর পুণ্য অয়নের অর্থ ঈপ্সিত জ্ঞান ৷ তাই মোক্ষ ও বাঞ্ছিত জ্ঞান লাভ হয় বলে তিনি “নারায়ণ” বলে স্মৃত হন ৷
“সকৃন্নারায়ণেত্যুক্ত্য্যা পুমান্ কল্পশতত্রয়ম্ ৷
গঙ্গাদি সর্ব্বতীর্থেষু স্নাতো ভবতি নিশ্চিতম্ “৷
মানুষ একবার “নারায়ণ ” নামটি উচ্চারণ করলে তিনশো কল্প গঙ্গা সহ সব তীর্থে স্নান করা হয়ে যায় ৷”নারা” শব্দের মানে সারূপ্য মুক্তি ৷ যিনি তার আশ্রয় তিনিই নারায়ণ ৷ যিনি পাপ মুক্ত করেন ৷
“নারঞ মোক্ষণং পুণ্যময়নং জ্ঞানমীপ্সিতম্ ৷
তয়োর্জ্ঞাণং ভবোদ্ যস্মাৎ সোহয়ং নারায়ণঃ স্মৃতঃ” ৷ ” নারায়ণ পরাবেদা নারায়ণ পরাক্ষরা ৷ নারায়ণ পরামুক্তি নারায়ণ পরাগতিঃ”৷৷ ” ওঁ ত্রৈলোক্যপূজিতঃ শ্রুমান্ সদাবিজয়বর্ধনঃ ৷ শান্তিং কুরু গদাপাণে নারায়ণ নমোহস্তুতে “৷শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতর আদিলীলা ,৩/৬৯ – এ বলা হয়েছে ” জলাশয়ী অন্তর্যামী যেই নারায়ণ ৷ সেহো তোমার অংশ, তুমি মূল নারায়ণ ” ৷ অর্থাৎ নারায়ণ ও কৃষ্ণ একই ৷সেজন্যই শ্রীমদ্ভাগবতে লেখা আছে ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণের স্তব করেছেন ,” নারায়ণস্ত্বং ন হি সর্বদেহিনা -মাত্মাস্যশাখিললোকসাক্ষী ৷ নারায়ণোহঙ্গং নরভূজলায়নাৎ তচ্চাপি সত্যং ন তবৈব মায়া “৷ ওঁ নমঃ নারায়ণায় ৷