গণেশ চতুর্থী এবং গণেশ পূজা কেন ?

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

” আজ গণেশ চতুর্থী ” ৷ সিদ্ধিদাতা গণপতির কৃপা সবার উপর বর্ষিত হোক এই কামনা করি ৷
” লম্বোদর কূট-দন্ত শাল -কটঙ্কট ৷
কুষ্মান্ডগণপ মুন্ড – বিনায়ক বট ৷৷
বিকটগণপ রাজপুত্র প্রণবাখ্য ৷
বক্রতুন্ড একদন্ত ত্রিমুখ প্রত্যক্ষ ৷৷”
গৌরীর বরে শনিদেবের দৃষ্টি যেদিকে পড়বে তারই অনিষ্ট হয় ৷ কিন্তু , বুমেরাং হয়ে গেল নিজেরই ৷ শিব- পার্বতীর খুব সুন্দর সন্তান হলে সব দেব দেবী তা দেখতে এলেন ৷ শনি মহারাজ ছাড়া ৷ কিছু না ভেবে পার্বতী শনিকে ছেলে দেখতে আসার অনুরোধ করলেন ৷ মায়ের খেয়াল ছিল না শনিকে দেওয়া বরের কথা ৷ শনি এসে পার্বতীর সন্তানের দিকে তাকালে সেই ছেলের মুখ পুড়ে যায় ৷ এতে শিব ও পার্বতী রেগে শনিকে মারতে গেলে দেবতারা করজোড়ে জানান ” আপনি সৃজিয়া শনি
মার কি কারণ ” আর শনি বলে উঠলেন ” কোপ দৃষ্টে সুদৃষ্টে যাহা পানে চাই / দেব দৈত্য নাগ নর
হৈয়া যায় ছাই ” (কৃত্তিবাসী রামায়ণ)৷ শনি যাকে দেখবে তার মাথা থাকবে না ৷ পার্বতীর কৌতুকে দেওয়া বর যে নিজের ছেলেকে পোড়াবে , হায় ! তখন ব্রহ্মার কথা মত পবনদেব গেলেন উত্তর দিকে মাথা করে যে শুয়ে আছে তার মাথা কাটতে ৷ পেলেন ইন্দ্রের ঐরাবতকে ৷ ব্রহ্মা ঐ হাতির মাথা শিবের ছেলের মাথায় জুড়ে দিলেন ৷ তাই ছেলেটির নাম হলো ” গজানন” ৷ পার্বতী কুরূপ ছেলে দেখে খুব কষ্ট পেলেন ৷ তখন ব্রহ্মাবললেন সবার আগে পুজো পাবে “গণেশ” ৷”গণ” যুক্ত “ঈশ” হল গণেশ ৷ অর্থাৎ গোষ্ঠী বা সমষ্টির ঈশ্বর বা প্রভু ৷ গণেশের পুজো ছাড়া অন্য কারো পুজো সফল হবেনা ৷ কাশীর বিশ্বনাথকে পুজোর আগে ঢুন্ডিরাজ গণেশের পুজো দিতে হয় ৷ মহাদেব বললেন গণেশ সর্ব বুদ্ধির আশ্রয় ৷ সকল পুরুষার্থেই অন্বেষণীয় ৷ কাশীখন্ড বইতে ঐ শহরে
ছাপ্পান্নটি গণেশের মন্দিরের উল্লেখ আছে ৷ বুধবারকে গণেশের বার বলা হয় ৷ যিনি সব দুঃখ ও সমস্যা দূর করেন তাই বিঘ্নহরতা ৷ চান্দ্র মাস অনুসারে দুটি চতুর্থী ৷ একটি কৃষ্ণ পক্ষের অন্যটি শুক্ল পক্ষের ৷ বারো মাসে একটা করে কৃষ্ণ পক্ষে সঙ্কষ্টী চতুর্থী হয় গণপতির একেকটি নামে ৷ যেমন জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্থী হল একদন্ত সঙ্কষ্টী চতুর্থী ৷ কারণ চাঁদের জন্য বিনায়ক হয়েছিলেন একদন্ত ৷ শুক্ল পক্ষের চতুর্থীতে তাই চাঁদ দেখা বারণ ৷ বিশ্বনাথ মন্দিরের পথে আছেন ” সাক্ষীবিনায়ক” ৷
মহারাষ্ট্রে অষ্ট বিনায়ক মন্দির প্রদক্ষিণ করা হয় ৷
আমরা যেকোন ভালো কাজ , নতুন বাড়ী , ব্যবসা
সবেতেই তাই বিনায়ক বা গণেশের পুজো করি ৷ হিন্দু বিশ্বাস গণেশের শ্রেষ্ঠ মন্ত্র দ্বাদশনামাক্ষরের চর্চা করলে জীবনের সব বাধা দূর হয় ৷” সুমুখশ্চৈকন্দতশ্চ কপিলো গজকর্ণকঃ ৷ লম্বোদরশ্চ বিকটো বিঘ্ননাশো বিনায়কঃ ৷ ধুমকেতুর্গণাধ্যক্ষো ভালচন্দ্রো গজাননঃ ৷ দ্বাদশৈতানি নামানি যঃ পঠেচ্ছৃণুযাদপি ৷ বিধ্যাংরভে বিবাহে চ প্রবেশ নির্গম তথা ৷ সংগ্রামে সংকটে চৈব বিঘ্নস্তস্য ন জায়তে ৷” এতে গজাননের বারোটি নাম বলা হয় ৷ গণেশের প্রিয় সংখ্যা পাঁচ ৷ তাই , আমরা পাঁচটি লালরঙের ফুল , লাল রঙের পাঁচরকম মিষ্টি এবং পাঁচটি প্রদীপ দিয়ে আমরা তাঁর পুজো করি ৷
গণপতি / গণেশ /গজানন/পিল্লাইয়ার / যানই
মুগতবন / বিনায়ক বা বিঘ্নেশ্বর হলেন হিন্দুদের
” Lord of success”. অন্যতম প্রধান হিন্দু দেবতা ৷তবে , জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের গণেশ পুজোর প্রচলন
রয়েছে ৷ ঋগ্ বেদের ২য় মন্ডলে ( সুক্ত ২০, শ্লোক-১) এ আমরা প্রথম গণপতির উল্লেখ পাই ৷ আবার অথর্ববেদের সঙ্গে যুক্ত গণপতি উপনিষদ বা গণপত্বার্থবশীর্ষে ( Ganapatyathavasirx) তে তাঁকে সর্ব্বোচ্চ ঈশ্বর বা ব্রহ্ম বলা হয়েছে ৷ আসলে হিন্দু পঞ্চধারায় কোন ধর্মগ্রন্থে বিষ্ণু , কোথাও শিব,
কোন জায়গায় মহাশক্তিকে পরম ব্রহ্ম বা তত্ত্বমসি
( তুমিই সেই ) বলা হয়েছে ৷।এখানে গণেশ সচ্চিদানন্দ , সর্ব প্রাণীর মধ্যে থাকা আত্মা ও ওঙ্কার ৷ ঈশ্বরকে যে সাধক যে ভাবে দেখেছেন আর কি ৷ একমাত্র গণেশের জন্মতিথি বা গণপতি জয়ন্তি পালিত হয় দুবার ৷ আমরা বাঙালি সহ অনেক জায়গার মানুষ হরগৌরীর সন্তানের পালন করি ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে মাঘ মাসের শুক্ল পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে ৷ আর স্কন্দপুরাণ মতে বিনায়কের জন্ম ভাদ্রমাসের শুক্ল পক্ষের চতুর্থী তিথিতে যা দাক্ষিণাত্য ও মহারাষ্ট্রে প্রচলিত ৷ এবারে ২০২১ সালে হচ্ছে ১০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ৷ওখানে দশ দিন ধরে তাঁর পুজো হয় ৷ এরপর অনন্ত চতুর্দশীতে গণপতি বিসর্জন হয় ৷ ভারত , শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তে ” গণেশ উৎসব ” হয় ৷ বাল গঙ্গাধর তিলক একে করে তোলেন মহারাষ্ট্রের ” জাতীয় উৎসব ” ৷ গণপতি হলেন জনমানুষের দেবতা ৷ মুম্বাইয়ে গণেশ পুজো সংখ্যা ও ধূমধামে কলকাতার দুর্গা পুজোকে ছাড়িয়ে যায় ৷ এই দশ দিনের জন্য গণপতি বাপ্পা মর্ত্যে আসেন ৷ দশ দিন পরে অনন্ত চতুর্দশীর দিন হয় বিসর্জন ৷ সেখানে গণেশের হরেক নাম , নানা রূপ – স্বয়ম্ভু গণপতি , লাল বাগকে রাজা , মুম্বাইচা রাজা ,
লক্ষ্মী গণপতি !নর্তন গণপতি ইত্যাদি ৷ মুখরিত হয়ে উঠেছে মুম্বাই ” জয় গণেশ , জয় গণেশ , জয় গণেশ দেব / মাতা জাকি পার্বতী / পিতা মহাদেব “৷
উচ্চারনে ৷ লক্ষ কন্ঠে হচ্ছে ” গণপতি বাপ্পা মোরিয়ার জয়গান ৷ সারা বছর মারাঠিরা অষ্ট বিনায়ক বা গণেশের আটটি প্রধান তীর্থে ঘুরে বেড়ান ৷ মুখে বলেন “সিদ্ধি বিনায়ক নমো নমঃ /
অষ্ট বিনায়ক নমো নমঃ/ গণপতি বাপ্পা মোরিয়া “৷ অসংখ্য শক্তিপীঠের মধ্যে যেমন ৫১ টি “সতী পীঠ” প্রধান ৷ অসংখ্য শিবলিঙ্গের মধ্যে প্রধান ১২ টি জ্যোতির্লিঙ্গ ৷ তেমনি গণেশের মন্দিরের মধ্যে মূল পীঠ আটটি ৷ যা অষ্টবিনায়ক নামে প্রসিদ্ধ ৷ গণেশ ও মুদগল পুরাণ অনুসারে সহ্যাদি পর্বতের মালভূমে পুণে শহরের দুশো কিমির মধ্যে আটটি প্রধান গণেশ মন্দির ৷ বহুদিনের ইচ্ছা তাঁদের দর্শন লাভ ৷পাঁচটি পুণে জেলায় , ২টি রায়গড় জেলায় এবং একটি আহমেদনগর জেলায় ৷ ১৷ শ্রীময়ূরেশ্বর ৷ পুণে জেলার করহা নদীর ধারে মোরগাঁওতে ৷ এখানে গণেশের বাহন ময়ূর ৷ মনে করা হয় এখানে ব্রহ্মার দুই মানস কন্যা ঋদ্ধি ও সিদ্ধির সঙ্গে গণেশের বিয়ে হয় ৷ এখানে গণেশকে কমলাসুরকে বধ করেন ৷ বিশ্বাস স্বয়ং বিশ্বকর্মা ময়ূরেশ্বর গণপতির এই মন্দিরটি প্রথম নির্মাণ করেন ৷ এখানে গণেশকে নারকেল নিবেদন করে সেই উৎসর্গীকৃত নারকেলটি নিয়ে বাকী সাতটি মন্দিরে পুজো দিয়ে পরিক্রমা করতে হয় ৷ এখানে শ্রীমদ যোগীন্দ্রাচার্য মুদগল পুরাণ লাভ করেন ৷ এখানে গাণপত্য সম্প্রদায়ের প্রবর্তক মোরিয়া গোসাবির জন্মস্থান ৷ ২৷ সিদ্ধিবিনায়ক ৷ ভীমা নদীর তীরে এখানে গণেশের আর্বিভাব ৷ বিষ্ণু স্বয়ং এখানে ষষ্ঠাক্ষর গণেশ মন্ত্র পেয়ে মধু কৈটভদের বধ করে গণেশ মন্দির নির্মান করেন ৷ অষ্টবিনায়কের মধ্যে শুধু সিদ্ধিবিনায়কের শুঁড় ডানদিকে ৷৩৷ শ্রীচিন্তামণি গণেশ ৷পন্টারপুরের কাছে এখানে ঋষি কপিল বিনায়ককে চিন্তামণি নাম দেন ৷ এখানে চিন্তামণি সরোবরে ঋষি গৌতমের স্ত্রী ও ব্রহ্মার মানস কন্যা অহল্যাকে দেবরাজ ইন্দ্র সম্ভোগ করেছিলেন ৷ তাতে ইন্দ্র রূপ যৌবন হারালে অনুতপ্ত ইন্দ্র গৌতমের করুণায় ও গণেশের কৃপায় শাপমুক্ত হন ৷৪৷ মহাগণপতি ৷ রঞ্জনগাঁও এর এই স্থানে কার্তিক তারকাসুরকে বধ করেছিলেন ৷ তার তিন পুত্র তারকাক্ষ , বিদ্যুন্মালী ও কমলাক্ষ পরে ব্রহ্মার বরে তিনটি প্রাসাদ বা পুরীর মালিক হয়ে নাম ত্রিপুরাসুর ( তিন অসুর) ৷ এখানে কার্তিকী পূর্ণিমায় মহাদেব তাদের বধ করায় ঐ পূর্ণিমার নাম হয় ত্রিপুরী পূর্ণিমা ৷ শিবের আরেক নাম হয় ”ত্রিপুরারি” ৷ এখানেও গণপতি মূর্তি স্বয়ম্ভু ৷পাঁচটি মাথা ও দশটি হাত তাঁর ৷আবার গুপ্ত কুঠুরিতে আছে ১০ শুঁড় ২০ হাতের গণেশ ৷৫৷ বিঘ্নেশ্বর ৷ লেনাদ্রি পাহাড়ে এখানে গণেশকে বলা হয় বিঘ্নরাজ আর ভক্তদের কাছে সেই তিনিই বিঘ্ননাশক ৷৬৷ শ্রীগিরিজাত্মজ ৷এখানে সাত নম্বর গুহাতে গণেশের জন্মস্থান বলা হয় ৷ গুহা অবধি রয়েছে ৩০৭ টি সিঁড়ি ৷ এখানে ষষ্ঠ বিনায়কের অর্ধরূপ ৷ আর ওয়াডগাঁও কাশিমবাগে পাহাড়ের গায়ে বাকীটা ৷ ৭৷ শ্রীবল্লালেশ্বর ৷ ভক্ত বালক বল্লালের নাম থেকে এই নাম ৷এখানে রয়েছে ধুন্ডি বিনায়ক ও বল্লালেশ্বর গণেশের স্বয়ম্ভু মূর্তি ৷৮৷ শ্রীবরদাবিনায়ক ৷রায়গড় জেলার মাহাদে গ্রামে ৷একমাত্র এখানে ভক্তরা গণেশকে ছুঁয়ে নিজ হাতে পুজো দিতে পারন ৷ বিনিয়কের দর্শনের পর বাহন ইঁদুরের সামনের মূর্তিটিতে একটি কান ঢেকে অন্য কানে মনস্কামনা জানানোর রীতি প্রচলিত ৷ মোরেশ্বর থেকে শুরু করে মোরেশ্বরেই শেষ করতে হয় ৷অষ্টবিনায়ক পরিক্রমা করলে সব পাপ দূর হয়ে অভিষ্ট লাভ হয় ৷গণেশের সঙ্গী – বুদ্ধি ( প্রাজ্ঞতা ) , ঋদ্ধি
( সমৃদ্ধি / সৌভাগ্য ) এবং সিদ্ধি ( সাফল্য অর্জন ৷
আমরা কেন গণপতি বা বিনায়কের পুজো করি অর্থাৎ আধ্যাত্মিকতায় গণেশ ৷
“গণপতি উৎসব “হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব ৷ বিশেষতঃ মহারাষ্ট্র , কর্ণাটক সহ কয়েকটি রাজ্যে প্রধান পার্বন ৷ ২০১৪ সালে শুধু মুম্বাই মহানগরীতে দশ
সর্বজনীন এবং ১ লক্ষ ৮০ হাজার ৬৫০ টি বাড়ীর
পুজো হয়েছিল ৷ গতবার থেকে করোনার জন্য বারোয়ারী পুজো কম হলেও ঘরে ঘরে উন্মাদনার কমতি নেই ৷ সনাতন ধর্মাবল্বম্বী বিভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে নানা নামে একই পরমব্রহ্মের উপাসনা করে থাকেন ৷ বিভিন্ন সাধু ও মহাত্মা নিজ নিজ উপাস্য বিগ্রহে ঐকান্তিক ভক্তি প্রকাশ করে অপরাপর দেব দেবীর সঙ্গে ঈশ্বরের অভিন্নতা প্রকাশ করেছেন ৷
ব্রহ্ম কখনো নিরাকার , নির্গুণ ও অব্যয় ৷ আবার
তিনিই সব গুণের আধার , মঙ্গলময় ও আনন্দময় ৷
ভক্তি ভরে ভালবাসলে তাঁকে নিজের মত করে পাওয়া যায় ৷ হিন্দু দর্শন শুধু মৃত্যুর পর স্বর্গে বিশ্বাসী নন ৷ কল্যাণমূলক কাজ করে পৃথিবীতেই স্বর্গ সুখ লাভ করা যায় ৷ এজন্য ফলের প্রত্যাশা না করে কর্ম করে যেতে হয় ৷গণপতির হাতির মত বিরাট মাথা জ্ঞান ও মননের প্রতীক ৷ গণেশের দ্বাদশ নামাক্ষর জপ করলে সব বাধা দূর হয় ৷ গণেশের একদন্ত হলো ব্রহ্মের একরূপতার প্রতীক ৷ কপিল নামটি কপিলা গাভীর রঙ ৷ ঐ নাম করলে ৩৩ কোটি দেবদেবীর স্তুতি করা হয় ৷ গজকর্ণ মানে যিনি ধীর , গম্ভীর , সূক্ষ্মবুদ্ধি সম্পন্ন ৷ যিনি বড় কানে সব কথা শোনেন ৷অর্থাৎ বোঝান বেশী শুনতে হবে ৷” শুঁড় দক্ষতাকে বোঝায় ৷ আর শুঁড়ের নিচের ছোট মুখ আমাদের বলে দেয় কম বলবে ৷ লম্বোদর “- ভালো বা মন্দ সবকিছুকে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা দেয় ৷যেকোন খারাপ কথা ,কটূক্তি নিজের পেটেই চেপে রাখতে জানেন ৷ কারন , তা বের হলে মানুষ নিজে উপহাসের পাত্র হতে পারে ৷ সব শুনেও তাই চিত্তকে শান্ত রাখতে হয় ৷” বিকট”- ভয়ঙ্কর ৷ যিনি ভক্তদের বর দেন আর দুষ্টকে কঠোরভাবে দমন করেন ৷ “বিঘ্ননাশক” -ভক্তের সব বাধা দূর করেন ৷ “বিনায়ক” – সব নায়কদের অধিপতি ৷ “ধুম্রকেতু” – যা কাউকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যায় ৷ তিনি অবন্তাসুর ! মায়াসুর , লোভাসুর , কামাসুর ও ক্রোধাসুরকে নিধন করেছেন ৷ যার তাৎপর্য্য তিনি অহং , মায়া , লোভ , কাম ও ক্রোধকে জয় করতে শেখান ৷গণেশ হলেন God of Wisdom জ্ঞানের দেবতা ৷ যিনি শিক্ষা দেন কেউ ছোট বড় নয় ৷ সবার আত্মাই পরমাত্মার প্রকাশ ৷ আমরা দেখি গণেশের ছয় হাতে রয়েছে ৷ “কুড়াল /কুঠার” – যা দিতে সমস্ত Negetive জিনিস বা খারাপ সংস্কারকে কাটেন ৷
“রশি/দড়ি”- আমাদের খাওয়া , শোওয়া , বলা সহ
প্রতিটা কাজ হওয়া উচিত নিয়ম বেঁধে ৷ আত্মাকে
জ্ঞানের দিকে মর্যাদার দিকে চালাতেই তাঁর হাতে রশি থাকে ৷ “ত্রিশূল” – অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত ৷ অতীতের কর্মফলে আমরা ভুগি ৷ আবার বর্তমান
নিয়মের নিগড়ে না চললে ভবিষ্যত হয় অন্ধকার ৷
তাই , কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে অগ্র,পশ্চাৎ ও বর্তমান ভাবতে হয় ৷ আজকের কাজের ফল আমরা পরে বা ভবিষ্যতে পাই ৷ “মোদক” – গণেশজীর হাতে থাকে মোদক মুখে নয় ৷ সমানে মনোযোগ দিয়ে কোন কাজ করলে তবে ভালো ফল হয় ৷ যা মোদকের মত মিষ্টি ৷চালের গুঁড়োতে নারকেলের পুর দিয়ে মোদক তৈরী করতে একাগ্রতা ও পরিশ্রম লাগে ৷ “পদ্ম” – কাদায় জন্মেও পদ্ম সবচেয়ে সমাদৃত ফুল ৷ পদ্মপাতায় জল পড়লেও তা গড়িয়ে যায় ৷ “বরদান” – সবার ভালো চাইতে হয় ৷ গণেশের এক পা উপরে অন্য পা
নিচে অর্থ দুনিয়াতে উপরে থাকতে হলে পা নিচে রাখতে হয় ৷ অহং করতে নেই ৷ তাঁর বাহন “ইঁদুর “
-Greed , negetivity ও destruction এর প্রতীক ৷ আমাদের গর্ব আমাদের ঋণাত্মক দিকে
নিয়ে যায় ৷ তাই গণেশের পায়ের নিচে ইঁদুর থাকে ৷
মানুষকে কর্মেন্দ্রিয়ের বশীভূত হতে নেই ৷ বাসনাকে সবসময় সংযত রাখতে বলে ৷ যা বিকারের প্রতীক ৷ আত্মাকে তাই তার উপরে বসাতে হয় ৷ তাঁর দুই স্ত্রী ঋদ্ধি ও সিদ্ধি আসলে prisperity ও success র প্রতীক ৷ তাই , মূর্তি গড়ে পুজো আসল পুজো নয় ৷ হিন্দু দর্শনের মূল কথা জীবনে বা নিজের আত্মায় ভগবানের মূর্তিকে
স্থাপন ৷ মূর্তি বা প্রতিমা তার প্রতীক ৷জ্ঞান হলো সব কাজের মূল ৷ তাই , সিদ্ধি দেয় ৷ তাই গণেশের আসল আরতি ৷
এখানেই হিন্দুর বিভিন্নতার মাঝে মহামিলন ও একতা ৷ গণেশ মানে বিঘ্নকারক সমূহের ঈশ্বর ৷
যিনি মঙ্গলদান করেন ও সিদ্ধি প্রদান করেন ৷
তাঁর মোটা পেট অর্থাৎ লম্বোদর ৷ ঐ পেটে জগৎ সংসারের অবস্থান ৷তাঁর পায়ের নিচে লাড্ডু রাখার অর্থ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মান্ড তাঁর পায়ের তলায় ৷আমার কাছে গণেশ অন্য দেবদেবীদের বেশ আলাদা ৷ অথচ স্বীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল মনে হয় ৷ বিশালতায় নির্লিপ্ত উদাসীন ৷যিনি আমাদের জীবনে ভারসাম্যের সঠিক বন্টনের প্রয়োজনীয়তা ৷তাইতো আদি শঙ্করাচার্য লিখেছেন ,” অজং নির্বিকল্পং নিরাকারমেকং/ নিরানন্দমানন্দদ্বৈতপূর্ণং / পরং নির্গুণং , নির্বিশেষ নিরীহং / পরব্রহ্মমরূপ গণেশং ভজেম”৷ গণেশ নিত্য , অক্ষরব্রহ্ম এবং শাশ্বত সত্য ৷তিনি বেদের আদিতে প্রতিষ্ঠিত ও বেদের সারতত্ত্ব ৷মহাশক্তি পার্বতীর ছেলে বলে তাঁর অমিত বিক্রম ৷ আবার স্বয়ং বিষ্ণুর অংশজাত তাই পরম তত্ত্বের আধার ও সর্বজ্ঞানী ৷ সব দেবতাকে বলা হয়েছিল মহাবিশ্ব ঘুরে আসতে ৷ যে যার বাহণে তাই করলেও গণেশ বাবা -মা শিব -পার্বতীকে সাত বার প্রদক্ষিণ করে তাঁদের সামনে করজোড়ে দাঁড়ান ৷ মহাদেব গণেশকেই বিজয়ী ঘোষণা করেন ৷ এর মাধ্যমে ভগবান শিব বোঝান বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সবকিছুর চেয়ে সর্ব্বোচ্চ স্থান পিতা মাতার ৷সনাতন হিন্দু ধর্মে বাবা -মায়ের স্থান কোথায় গণপতি তা বুঝিয়ে দেন ৷ শিব সব দেবদেবীর আগে গণেশ পূজার বিধান দেন ৷ আর দেন যোগপট্ট ৷তাঁকে গণেশ অর্থবশীর্ষোপনিষদে ওঁ কারের সঙ্গে এক করা হয়েছে ৷ আবার মূলাধার চক্র তথা তন্ত্র মতের “গং” হলো গণেশের বীজমন্ত্র ৷ঋকবেদে বলা হয়েছে “গণানাম গণপতিম হবামহে “৷ গণেশকে ব্রহ্মা দেন কমন্ডলু ৷বিষ্ণু দেন ব্রহ্মজ্ঞান ৷আর ধরিত্রী মাতা ( পৃথিবী) খেলার জন্য দেন ইঁদুর ৷ যাকে গণেশ নিজের বাহণ করে নেন ৷ সংস্কৃত মুষিক ( ইঁদুর) শব্দটি “মুশ” ধাতু থেকে উৎপন্ন ৷ যার অর্থ চুরি করা ৷ আসলে তা বিঘ্নবিজয়ের প্রতীক ৷
৷ ওঁ গাং গণেশায় নমঃ ৷
আসুন আজ থেকে দশদিন সবাই গণেশ গায়ত্রী গাই ,” এক দন্তায় বিদ্মহে বক্রতুন্ডায় ধীমহি তন্নে দন্ডিঃ প্রচোদয়াৎ”৷
” ওঁ গং গণেশায় নমঃ “🙏🙏🙏