কৌশিকী অমাবস্যা ( KAUSHIKI AMAVASYA)

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

মা তারার আরেক নাম কৌশিকী। কথিত আছে, কৌশিকী রূপেই শুম্ভ নিশুম্ভকে বধ করেছিলেন মা তারা। এর আরেক নাম “তারা রাত্রি” ৷ অনেকে মনে করেন তন্ত্রের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক শক্তি দিয়ে এই একজন প্রকৃত সাধক স্বর্গ কিংবা নরকে যেতে পারেন ৷ তাঁর সাধনার উপর ৷ভক্তদের বিশ্বাস, এই তিথিতেই তারাপীঠের মহাশ্মশানের শ্বেতশিমূল গাছের তলায় বসে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা। তখনএর নাম ছিল চন্ডীপুর ৷ আজ “তারাপীঠ ” ৷১২৭৪ বঙ্গাব্দের কৌশিকী অমাবস্যার রাতে, ‘তারাপীঠ মহাশ্মশানের’ শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায়, পঞ্চমুন্ডির আসনে তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, ‘সাধক বামাক্ষ্যাপা’। এখানে সিদ্ধিলাভ করেছেন অসংখ্য বিশিষ্ঠ সাধক ৷ যেমন – বিশে ক্ষ্যাপা , ল্যাংটা বাবা , কমলাকান্ত , রাজা রামকৃষ্ণ , কৈলাশ পতি বাবা , মোক্ষদানন্দ , আনন্দনাথ প্রমুখা৷”তারাপীঠ মহাশ্মশানে ” -শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায়, ‘দেবীর শিলামূর্তি’, ‘ সর্বপ্রথম দর্শন করেন’, “বশিষ্ঠদেব।” “ব্রহ্মার মানসপুত্র, বশিষ্ঠদেব, মহাচীনে, ‘বুদ্ধরূপী জনার্দনের কাছে’,পঞ্চ’ম’কার হলো (মদ,মাংস,মৎস্য,মুদ্রা,মৈথুন) সাধন পদ্ধতি সমন্ধে, শিক্ষালাভ করে গুরুর আদেশ অনুযায়ী, ‘কামকোটির বক্রেশ্বরের ঈশান কোনে’, ‘বৈদ্যনাথ ধামের পূর্বদিকে’, ‘দ্বারকা নদীর পূর্বতীরে’, এই তারাপীঠ মহাশ্মশানে এক শ্বেত শিমূল বৃক্ষের মূলে তারা মায়ের শিলামূর্তির খোঁজ পান। ঐ দিন দ্বারকা নদীতে স্নান করে মা তারার পুজো দিলে কুম্ভস্নানের ফল মেলে ৷ অনেক পুণ্য অর্জন হয় ৷ঐ গাছের নিচে পঞ্চমুন্ডীর আসনে বসে, পঞ্চ’ম’- তন্ত্র সাধনা করে ৷তাঁর আসল ধ্যানমূর্তিটি হলো:- দ্বিভুজা, সর্পময় যজ্ঞপোবীত ভূষিতা। তাঁর বাম কোলে স্বয়ং মহাদেব পুত্ররূপে অবস্থান করে স্তন পান করছেন। দীর্ঘ সাধনার পর ত্রেতাযুগে বশিষ্ঠদেব এখানে তারামায়ের দর্শনলাভ করেন। দেবী শিশু শিবকে স্তন‍্যপানরতা তারা রূপেই বশিষ্ঠদেবকে দর্শন দেন এবং এই রূপটি প্রস্তরীভূত হয়। সেই থেকে, তারাপীঠ মন্দিরে, ‘শিশু শিবকে, স্তন্যপানরতা মূর্ত্তিতে, দেবী তারা, পূজিত হয়ে আসছেন”। আসলে সমুদ্র মন্থনের সময় বিষের জ্বালায় শিব নীলকন্ঠ হয়ে ছটফট করতে থাকলে সব দেবতার অনুরোধে জগন্মাতা তাঁকে শিশুর আকৃতি দিয়ে নিজের বুকের স্তন্য দুগ্ধ পান করিয়ে উপশম দিয়েছিলেন ৷স্তন্য দুগ্ধের অমৃত শিবকে গরল মুক্ত করে ৷ তাই তিনি তারিণী ৷ তিনি শিবকে তারণ করেছেন ৷ বিশ্ব সংসারকেও তারণ করেন ৷তারিণী থেকেই তাঁর নাম হয় “তারা” ৷ যদিও বিশেষ মুহূর্ত ছাড়া মায়ের শিলারূপ ঢাকা থাকে একটি আচ্ছাদনে। তাই আচ্ছাদনকেই, ‘মাতৃরূপের প্রতীক’ ধরা হয়। সেই মূর্তিই তারামা হিসেবে, ঘরে ঘরে পূজা পান ৷ তারারাপীঠ মহাশ্মশানের”১)সাপ ,২(ব্যাঙ ,৩)খরগোশ , ৪)শেয়াল ও ৫)মানুষ এই পঞ্চমুন্ডি আসনে প্রথম সিদ্ধি লাভ করেন মহামুণি “বশিষ্ট” ৷ তখন থেকে তারাপীঠ সিদ্ধপীঠ ৷ মা তারার মাথাতেও আছে পঞ্চমুন্ডের সমাহার ৷ আবার শুদ্ধচিত্তে পঞ্চমুন্ডি আসনে তপস্যা করলে সাধক সিদ্ধিলাভ করতে পারেন ৷ কিন্তু , বিফলে পাগল হয়ে যেতে পারেন ৷অনেকের মতে এখানে সতীর উর্ধনেত্রের মনি পড়েছিল ৷ তাই সতীপীঠও ৷**এই আসনে বসেই, বহু যুগ পূর্বে দেবীকে তুষ্ট করে, তারাপীঠকে সিদ্ধপীঠে পরিণত করেছিলেন ‘বশিষ্ঠদেব’। ” ভৃগু, দত্তাত্রেয়, দুর্বাসা, পরশুরাম, সাধক বামাক্ষ্যাপা” ( ১৮৪৩ -১৯১১), শঙ্করক্ষ্যাপা ও, এই আসনে বসে, “তন্ত্রসাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন”। ‘ভাদ্র মাসের’ এই তিথিটিতে, অনেক কঠিন ও গুহ্য সাধনা করলে আশাতীত ফল মেলে, সাধক ‘কুন্ডলিনী চক্র’ কে জয় করে। উত্তরবাহিনী নদী দেবীর কুলকুন্ডলিনী শক্তির রূপ ৷ যার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বিশাল ৷ তন্ত্র মতে, এই রাত হলো “তারারাত্রি” বলা হয়। এক বিশেষ মুহুর্তে, ‘স্বর্গ ও নরক’ দুই এর দুয়ার, মুহুর্তের জন্য উন্মুক্ত হয় ও সাধক নিজের ইচ্ছা মতো, ”ধনাত্মক” অথবা “ঋণাত্মক”‘ শক্তি”, নিজের সাধনার মধ্যে, ‘আত্মস্থ করে’, ও ‘সিদ্ধি লাভ করে’। দেবী শ্মশানবাসিনী ৷ সেখানে চিতার আগুন হয়ে তিনি বিরাজমানা ৷ সাথী ডাকিনী ও যোগিনীরা ৷ অনেকে নাকি অমাবস্যার রাতে দূর থেকে জ্যোতি দেখতে পান ৷ চন্ডী পড়ে আমরা জানি “মহা সরস্বতী” দেবীর কাহিনী তে বলা আছে: পুরাকালে একবার “শুম্ভ ও নিশুম্ভ” কঠিন তপস্যা করে, ব্রহ্মাকে তুষ্ট করলে,সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তাদের ‘বর দান করেন’ যে, “কোনো পুরুষ তাদের বধ করতে পারবেনা”!!! শুধু, কোনো ‘অ-যোনি সম্ভূত ( কোন মহিলার গর্ভজাত নয় ) নারী’ ,তাদের বধ করতে পারবে ৷এমন এক নারী, যে কোনো মাতৃ গর্ভ থেকে উৎপন্ন হয়নি, তার হাতেই ,এই দুই অসুর ভাই এর মৃত্যু হবে, তারা ভাবলো পৃথিবীতে এমন নারী কোথায়!এমনকি ‘আদ্যাশক্তি মহামায়া’, ‘মেনকার গর্ভে’ জন্ম নিয়েছেন ! তাই, তিনিও ওদের নাশ করতে পারবেন না। আমরা জানি পূর্ব জন্মে, পার্বতী সতী রূপে পিতা দক্ষের যজ্ঞ স্থলে, আত্মাহুতি দেন। তার কারণে, এই জন্মে ওনার গায়ের রং ‘কালো মেঘের ন্যায় ৷তাই, শিব আদর করে, তাঁকে কালী বা কালিকা বলতেন ৷ একদিন দানবদের দ্বারা নির্যাতিত দেবতারা, যখন ক্লান্ত, কৈলাশে মহাদেবের কাছে আশ্রয় নিলেন। শিব সব দেবতাদের সামনেই পার্বতীকে বলেন কালী ওদের উদ্ধার করো। সবার সামনে কালি বলে ডাকাতে পার্বতী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ, অপমানিত ও ক্রোধিত মনে মানস সরোবর এর ধারে কঠিন তপস্যা করলেন ও তপস্যার পর শীতল মানস সরোবর এর জলে স্নান করে নিজের দেহের সব কালো (Melanin) পরিত্যাগ করলেন ও পূর্ণিমার চাঁদের মতো গাত্র বর্ণ ধারণ করলেন ও ওই কালো কোশিকা গুলি থেকে এক অপূর্ব সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ দেবীর সৃষ্টি হয় , “ইনি দেবী কৌশিকী!!!” এই সেই তিথি, যেদিন, এই দেবীর উৎপত্তি হয় এবং শুম্ভ ও নিশুম্ভ কে বধ করেন, তাই, এই অমাবস্যার নাম:” কৌশিকী অমাবস্যা !”কৌশিকী অমাবস্যায়, তন্ত্র মতে পঞ্চ’ম’ কারে, (মদ,মাংস,মৎস্য,মুদ্রা,মৈথুন) তারা মায়ের সাধনা করে অনেক সাধক সিদ্ধি লাভ করেছেন ৷মনে করা হয় এই তিথিতে, দ্বারকা নদীতে স্নান করে, তারা মায়ের পুজো করলে,” সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যায়৷ তাই আজ লক্ষ লক্ষ পূণার্থীতে ভরপুর সিদ্ধপীঠ ” তারাপীঠ” !তারামন্ত্র — “ॐ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা!!!”বামদেবের উচ্চারিত মন্ত্রটি হল: — “হূং ভগবত্যে একজটায়ৈ বিদ্মহে বিকট দংষ্ট্রে ধীমাহি তন্যস্তারে প্রচোদয়াৎ। ॐ তারা ॐ তারা ॐ তারায়ৈ বৌষট! “তারাপীঠের ইতিহাস – বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় তীর্থস্থান গুলির অন্যতম বীরভূমের ” তারাপীঠ ” ৷ খ্যাতনামা এই সিদ্ধ পীঠটি “সতীপীঠ” কিনা এ বিষয়ে মতান্তর আছে ৷ যদিও , অনেকের মতে এখানে পড়েছিল মায়ের প্রজ্ঞানয়ন বা ঊর্দ্ধনেত্র ৷ তবে, এটা সবাই বিশ্বাস করে সেই প্রাচীন কালে বিষ্ণুর আদেশে এখানে পরাশর মুণির পুত্র বশিষ্ঠ মুণি তিন লক্ষ বার “তারা নাম ” জপ করে সিদ্ধ হন ৷ মায়ের আঁচল কোটি স্বর্গের সমান ” মায়ের কোলে ঘুমায় ছেলে এ শান্তি মা কোথায় বল ?” কর্মফল শেষে আমাদের সবার আশ্রয় স্থল হবে শ্মশান ৷ যেখানে জীব তারা মায়ের কোলে সুখে নিদ্রা যায় ৷ আজও এখানকার উত্তর বাহিণী দ্বারকা নদীর ধারের শ্মশানে বহু সাধক ও তান্ত্রিক সাধনা করেন ৷শ্মশান হলো পবিত্র স্থান ৷ এখানে আমরা বুঝি সবাইকে একদিন মরে শ্মশানে যেতে হবে ৷ তাই ,নিজেকে নিয়ে যে অহংবোধ তা চলে যায় ৷দেবী তারা মহাশ্মশানেই জীবন ও মৃত্যুর পটভূমি নিত্য রচনা করেন ৷ শুধু হিন্দু ধর্মে নয় বজ্রযানী বৌদ্ধধর্মে “তারা” র রয়েছে বিরাট গূরুত্ব ৷ স্বপ্নাদিিষ্ট হয়ে তারাপীঠের জঙ্গলে সাদা শিমূল গাছের তলায় জয় দত্ত মায়ের শিলা বিগ্রহ পান ৷ কাছেই পান চন্দ্রচূড় মহাদেবের মূর্তি ৷ আজ থেকে আটশো বছর আগে এখানে জীবিত কুন্ড বা বশিষ্ঠ কুন্ডের জলে জয় দত্ত মায়ের কৃপায় মৃত ছেলের প্রাণ ফিরে পান ৷ সেখানেই সেই কোজাগরী শুক্লা চর্তুদশীর দিন তিনিই প্রথম মন্দিরনির্মাণ করেন ৷ দ্বিতীয় বার মন্দির সংস্কার করেন১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে রামজীবন রায়চৌধুরী ও তৃতীয়বার ১৮১৮ সালে জগন্নাথ রায় ৷ যা এখনও রয়েছে ৷মা শিলারূপ আচ্ছাদনে ঢাকা ৷ তাকেই বলা হয় “তারা মায়ের ” প্রতীক ! সাগর মন্থনের সময় হলাহল বা গরল বা বিষ পান করে শিব হন নীলকন্ঠ ৷ ভগবানের বিষের জ্বালা দূর করে বা তারণ করতে মা তাঁকে নিজের স্তন্য অমৃত দেন ৷ শিবকে তারন করেন বলে মা হন তারা ৷ শেষ রাতে আমরা মন্দিরে মায়ের সেই আসল রূপ দেখেছি ৷ তারাপীঠে অসংখ্য সাধক সিদ্ধি লাভ করেছেন ৷ সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ ” বামাক্ষ্যাপা ” যিনি ১২৪৪ বঙ্গাব্দের শিবচর্তুদশীর রাতে পাশেই “আটলা” গ্রামে জন্মগ্রহন করেন ৷ তাঁকে সাক্ষাৎ শিব বলে ভক্তরা মনে করতেন ৷ অনেক অলৌকিক কাহিণী রয়েছে তাঁকে ঘিরে ৷ তিনি মায়ের পুজোর প্রসাদ খেয়ে নিতেন ৷ মায়ের গায়ে থুতু ও প্রস্রাবও করেছেন ৷ আবার তাঁর পুজো ছাড়া মাকে কেউ সন্তুষ্ট করতে পারতেন না ! সারাদেশের অসংখ্য মানুষ শুধু তাঁর দেখা পেতে ও কথাশুনতে এখানে আসতেন ৷ ব্রাহ্ম হয়েও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে খুব ভক্তি করতেন ৷ বামদেবেরকথামত তিনি শান্তিনিকেতনে ছাতিম তলায় আশ্রম তৈরী করে পেয়েছিলেন ,” প্রাণের আরাম , আত্মার শান্তি “! রবি ঠাকুরকে বামদেব বলেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত হবে ! ২০২১ সালে কৌশিকী অমাবস্যা হবে ৭ সেপ্টেম্বর ( বাংলার ২১ ভাদ্র ১৪২৮ ) মঙ্গলবার ৷ ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সময় ৭ টা ৩৮ মিনিটে( বাংলাদেশ সময় ভোর ৮টা ০৮ মিনিটে) শুরু হয়ে ভাদ্র অমাবস্যা তিথি থাকছে পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সময় সকাল ৬টা ২১ মিনিট ( বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টা ৫১ মিনিট)পর্যন্ত ৷ তবে , এবারেও করোনা পরিস্থিতি সাধারণ পুণ্যার্থীদের জন্য সাত দিন ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ সেপ্টেম্বর তারাপীঠ মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকবে ৷ শুধুমাত্র সেবাইতরা নিত্য ও অমাবস্যার পুজো দিতে পারবেন । জয় তারা , জয় বাম , দুই যেন এক নাম !