কবি রজনীকান্ত সেনের প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

লিখেছেন : ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়

( জন্ম : ২৬ জুলাই ১৮৬৫
মৃত্যু : ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯১০ )
ছেলেবেলায় দ্বিতীয় শ্রেণির বইয়ে পড়া “স্বাধীনতার সুখ ” কবিতাটিতে “বাবুই পাখিরে ডাকি , বলিছে চড়াই ৷ “আজও মুখস্থ বলতে পারি ৷
স্বাধীনতা কি জিনিস খায় না মাথায় দেয় বোঝার বয়স তখন হয়নি ৷ এটা বুঝেছিলাম নিজের জিনিস নিম্নমানের হলেও অন্যের চোখ ধাঁধানো দামী জিনিসের চেয়ে তার মর্যাদা বেশি ৷
সেটাই তিনি আরো তুলে ধরেছেন তাঁর বিখ্যাত গানে “মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই , দিন দুখিনী মা যে তোদের এর বেশি আর সাধ্য নাই “৷ স্বদেশী আন্দোলনের বিলাতি মিলের মিহি কাপড়ের বিরুদ্ধে যা ভারতবাসীর মনে আলোড়ন তুলেছিল ৷ বিলাতি দ্রব্য হেলায় ছেড়েছিল সৌখিন বঙ্গ ললনারা !
আবার তাঁর শান্ত , স্নিগ্ধ ,করুণ রসের গান ” মাগো কোলের ছেলে ধুলো ঝেড়ে তুলেনে কোলে ” ৷ কিংবা ” ওরা চাহিতে জানে না দয়াময় !”, আমাদের হৃদয়ে ভগবৎভক্তি জাগায়ে তোলে ! বাংলার পঞ্চকবির ( রবীন্দ্র , নজরুল , দ্বিজেন্দ্র , অতুল ও রজনীকান্ত) অন্যতম কান্ত কবির ভক্তিসঙ্গীতগুলি আমাদের কাছে “কান্ত পদাবলী” রূপে স্বীকৃত ৷ স্বদেশী ও হাসির গানেও তাঁর দক্ষতা সর্বজন বিদিত ৷
আজ সেই কান্ত কবির ১১১-তম প্রয়াণ দিবস ৷আজকের মত এক ১৩ সেপ্টেম্ব ১৯১০( বাংলার ২৮ ভাদ্র ১৩১৭ ) মঙ্গলবার দীর্ঘ রোগ যন্ত্রণার পর কলকাতায় পরলোকগমণ করেন ৷.
বাংলার পঞ্চকবির অন্যতম কান্ত কবি “রজনী
কান্ত”র ১৫৬ – তম জন্মদিনে (২৬ জুলাই) আমার শ্রর্দ্ধাঘ্য ও প্রণাম ৷
রজনীকান্তের জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ আছে
অনেকের মতে তাঁর জন্ম পৈতৃক ভিটে বর্তমান
বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে ৷
কিন্তু , যতদূর জানা যায় ঐ সময় তাঁর বাবা গুরু
প্রসাদ সেন ছিলেন পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমা
আদালতের সাব জজ ৷ তিনি ও তাঁর সহধর্মিনণী হিরন্ময়ী দেবী শ্রীচৈতন্যদেবের সন্ন্যাস গ্রহনের স্থান কাটোয়া গৌরাঙ্গ বাড়ীর কাছে গৌরাঙ্গ পাড়ায় একভাড়া বাড়ীতে থাকতেন ৷ সেখানে আজকের মত এক ২৬ জুলাই ১৮৬৫ সালে রজনীকান্তের জন্ম ৷ কাটোয়ায় ঐ জায়গায় মাঝে মাঝে গেলেও সেখানে কান্ত কবিকে নিয়ে বড় কিছু দেখি না বলে খারাপ লাগে ৷ বাংলাদেশের বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার ভাঙাবাড়ীতেও গিয়েছি আমার বন্ধু বাংলাদেশের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা , রাজনীতিক ও সাংবাদিক আবু মহম্মদ খান বাবলুর গ্রামের পাশে রজনীকান্তের পৈতৃক ভাটা এবং ঐ গ্রামেরই আরেক সুসন্তান মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ীতে ৷ ঢাকা থেকে উত্তর বাংলাদেশ গামী রাস্তা ধরে কাড্ডা মোড় হয়ে ৷আর তাঁর শিক্ষাজীবন কাটে খুড়তুতো ভাই উকীল কালীকুমার সেনের রাজশাহী শহরের বাড়ীতে থেকে ৷বরেন্দ্র মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে ঐ বাড়ী গিয়েও তাঁকে প্রণাম জানিয়েছি ৷ কোচবিহারের বিখ্যাত জেনকিন্স স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করেন ৷ ৷ রাজশাহী আদালতে রজনীকান্ত কিছুদিন ওকালতিও করেছিলেন ৷ নাটোর ও নওগাঁতে করেছেন মুন্সেফগিরি ৷বিয়ে করেন ঢাকা মানিকগঞ্জের বেউথা গ্রামের মেয়ে হিরন্ময়ী দেবীকে ৷বাংলাদেশে আমি যখন লিখতাম তখন বিশিষ্ট কবি , সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আসাদ চৌধুরীর কাছে তাঁর অনেক কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছে ৷ আসাদ ভাই ১৯৮৯ সালে রজনীকান্তের জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন ৷তাঁর প্রথম কবিতা “আশা” ছাপা হয়েছিল সিরাজগঞ্জের কুঞ্জবিহারী দে সম্পাদিত “আশালতা” মাসিক পত্রিকায় ৷ দেশাত্মবোধক ও হাসির তাঁর সব গানে রয়েছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে কীর্তন , বাউল ও টপ্পার অপূর্ব মিশ্রণ ৷ মাত্র ৪৫ বছরে মারা যাওয়ায় তাঁর গানের সংখ্যা বেশী নয় ৷ “বাণী” ও “কল্যাণী” গ্রন্থ সহ ২৯০টি গান তিনি লিখেছেন ৷ জীবদ্দশায় মাত্র তিনটি বই – “বাণী” (১৯০২), “কল্যাণী”(১৯০৫) এবং “অমৃত” (১৯১০) প্রকাশ পেয়েছিল ৷ মৃত্যুর পর ছাপা হয় “অভয়া “(১৯১০), “আনন্দময়ী” (১৯১০) , “বিশ্রাম” (১৯১০), ” সদ্ভাবকুসুম” (১৯১৩) এবং”শেষদান” (১৯১৬) আরও পাঁচটি বই ৷
দেশপ্রেমের গভীরতায় রাজশাহী শহরে ওকালতি করতে করতে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন ৷
তাঁর ” মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই ” গানটি স্বদেশী আন্দোলনের বিদেশী দ্রব্য বর্জন আন্দোলনে প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ৷
আমাদের ছোটবেলায় প্রিয় কবিতা ছিল ,” বাবুই পাখীরে ডাকি বলিছে চড়াই , কুঁড়ে ঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই ” ৷আজও সর্ম্পূণ মুখস্থ আছে ৷
১৯৮০ সালে হিরন্ময়ী দেবীর সাথে বিবাহ হয় ৷ তিনি ছিলেন ৪ পুত্র ও ২ কন্যার জনক ৷বন্ধুর মৃত্যুতে লিখেছিলেন ” তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুখ/ তোমারি দেওয়া বুকে তোমারি অনুভব “! ছোট থেকে আমার মায়ের
গলায় শুনে এসেছি ” তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে
মলিন মর্ম মুছায়ে ৷ ” এবং ” আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি ” !কন্ঠ নালির প্রদাহে ভোগার সময় ভগবৎ প্রেমী কবি লিখেছেন ,” আমায় সকল রকমে কাঙ্গাল করেছে গর্ব করিতে চুর ” ৷কি অসাধারন আত্ম উপলব্ধি ! সন্তান বিয়োগের পর লিখেছেন ,”তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুখ “! ঈশ্বরপ্রেমী কবি লিখেছেন ,” তুমি আপনা হইতে হও আপনার , যার কেহ নাই তুমি আছ তার ” ! কিংবা ” কেন বঞ্চিত হবো চরণে “! শেষ শয্যায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন বিশ্বকবি ৷ কান্ত কবির অনতিক্রম্য ঐশীবোধ তাঁকে মুগ্ধ করে ৷
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রার্থনায় আমরা গাইতাম বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সময় লেখা “মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়” এবং “আমরা নেহাৎ গরিব আমরা নেহাৎ ছোট ” গানগুলি ৷ তাঁর ছিল ক্ষুরধার স্মৃতিশক্তি আর পিতৃপ্রদত্ত গলা ৷ স্বল্প সময়ে গান লিখতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ৷ জলধর সেন লিখেছেন , রাজশাহী গ্রন্থাগারের এক সভার জন্য কয়েক মিনিটে লিখে ফেলেন বিখ্যাত “তব চরণ নিম্নে উৎসবময়ী শ্যাম ধরণী সরসা ” ৷ পঞ্চকবির অন্যতম কান্তকবির প্রথমদিকের রচনা গুলি ছিল গুরুগম্ভীর ও সংস্কৃত ঘেঁষা হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় ঘরানার ৷ এরপর আধ্যাত্মিক ও দেশাত্মবোধক গানে কীর্তনাঙ্গ , বাউল ও টপ্পার মিশ্রণ দেখা যায় ৷
১৩ সেপ্টেম্বর ১৯১০ সালে রাত সাড়ে আটটায় কলকাতায় ক্যান্সারে আক্রান্ত পরমপ্রিয় এই কবি
ও গীতিকার কলকাতায় চিরশান্তির দেশে চলে যান ।