নিষিদ্ধপল্লীর জীবনযাত্রায় , দেবদুতের ভূমিকায় দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি

সঞ্জীব পাল ও রনক রায় ; কলকাতা :
সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে মোট যৌনকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৬৫০০০ , তার মধ্যে এশিয়ার সর্ববৃহৎ নিষিদ্ধপল্লী, উত্তর কলকাতার সোনাগাছিতেই আছেন প্রায় ১১০০০ যৌনকর্মী। কোরোনা মহামারীর কারণে টানা ৫ মাস লকডাউনে স্তব্ধ ছিল সমগ্র দেশ। দিন আনা দিন খাওয়া আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই অর্থাভাবে জীবনজীবিকার চরম সঙ্কটে সম্মুখীন হয়েছিলেন নিষিদ্ধপল্লীর কর্মীরাও। তাদের একটানা ব্যবসা বন্ধের কারনে বাকি পড়েছিল তাঁদের ঘর ভাড়া, অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচপাতি। যৌনকর্মী হওয়ার কারণে তাঁদের বেশির ভাগই ছিলনা তেমন কোন পরিচিতি । তাই তারা বঞ্চিত ছিল সরকারি সাহায্য থেকে , এমনকি তাদের দুঃখ কষ্ট ঘোচাতে, তারা পাশে পায়নি কোন রাজনৈতিক নেতা বা দলকে । উত্তর কলকাতার নিষিদ্ধপল্লী সোনাগাছি অঞ্চলের চিরবঞ্চিত ও সমাজচ্যুত । এই ১১০০০ যৌনকর্মীদের সম্পুর্ন ঘরবন্দী হয়ে প্রায় না খেতে পেয়ে মরার মতো অবস্থা হত । কিন্তু তা ঘটেনি , কারণ সেই করোনা সঙ্কটকালে, সেখানে দেবদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন যৌনকর্মীদেরই নিজস্ব সংগঠন “দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি”। কিছুকাল ধরেই যৌনকর্মীদের এই সংগঠন, দুর্বার কমিটি নিরলস কাজ করে চলেছে যৌনকর্মীদের স্বার্থে, যে কোন ধরনের হেনস্থা, আইনি পরিষেবা কিংবা নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় তাঁদের পাশে থেকে দিবারাত্র খেটে চলছে দুর্বার, কিন্তু এর আগে এক সাথে সমস্ত যৌনকর্মীদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে তেমন কোন উল্লেখনীয় ভূমিকায় দেখা যায়নি এই দুর্বার কমিটিকে। কিন্তু শতাব্দীর সেরা মহামারী করোনা সঙ্কটে রাজ্যের সকল যৌনকর্মীদের জীবন জীবিকার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি “দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি”। এটা তাদের কাছে ছিল শতাব্দীর সেরা চ্যালেঞ্জ। নিষিদ্ধপল্লীর প্রতিটি ঘরে ঘরে, কমিটির তরফে নিয়মিতরূপে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও ওষুধপত্র । সেই কাজ বজায় রাখতে গিয়ে, ইতিমধ্যেই তাঁদের ব্যায়ের পরিমান ছাড়িয়েছে প্রায় ২.৫ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থ এসেছে কিছু সরকারি ,বিভিন্ন স্বেছাসেবী সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থার তহবিল থেকে। একটানা সাহায্য ও সহযোগিতার হাত নিয়ে এই ভরম সঙ্কটের দিনে, সকল কর্মীদের পাশে থেকে সদা ভরসা ও সাহস জুগিয়ে চলছে এই কমিটি। দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সেক্রেটারি কাজল বোস জানালেন, যে শুধুমাত্র লকডাউনকালেই নয়, বর্তমান “আনলক” ও “নিউ নর্মাল” কালে যখন ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ পা রাখছেন তাঁদের জীবন জীবিকাতে, সেই সময়ও এই দুর্বার কমিটি অভিভাবকের মতোই সমস্ত যৌনকর্মীদের পাশে থেকে, তাঁদের সংক্রমণহীন জীবিকা চালু করার জন্যে, রীতিমতো তাঁদের প্রশিক্ষন দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ এড়ানোর জন্যে ,সরকারী নির্দেশিকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে, কিন্তু তাঁদের এই দেহব্যাবসায়ে সেই সামাজিক দূরত্ব বজায়ের তত্ত্ব মানার কোন উপায়ই নেই, তাই চরম সংক্রমনের ঝুঁকি নিয়েই তারা বাধ্য হচ্ছেন তাঁদের পেশায় নিয়োজিত হতে । যদিও এখানকার প্রতিটি যৌনকর্মীরা ব্যাক্তিগত রুপে, বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি পর্যায়ে মেনে চলছেন স্যানিটাইজেশনের কড়া সুরক্ষাবিধি । তিনি আরও বলেন, যে তাঁদের নজরদারিতেই প্রতিটি কর্মীই কঠোরভাবে মেনে চলছেন করোনাসংক্রান্ত বিধিনির্দেশগুলি। যৌনকর্মীদের মধ্যে সংক্রমন এড়াতে, এখানে আসা খদ্দের বা মানুষের শারীরিক তাপমাত্রা পরীক্ষারও সুব্যাবস্থা করেছেন তারা। তারই ফলস্বরুপ,ওই অঞ্চলে আজ পর্যন্ত একজন যৌনকর্মীও গত মার্চ মাস থেকে করোনা সংক্রমিত হয়নি। ঘোর করোনা সংক্রমনকালে, যখন কলকাতা, হাওড়া ও চব্বিশ পরগনা সংক্রমনের ক্ষেত্রে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় ব্যাস্ত,ঠিক তখনই শতাব্দী প্রাচীন সোনাগাছি ছিল সম্পুর্ন করোনা সংক্রমন শূন্য। বর্তমান সঙ্কটজনক অর্থব্যাবস্থায় সেখানকার যৌনকর্মীদের ব্যবসাও মার খেয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ, ফলে সেই কারনে এখনো সাহায্য ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে তাদের কমিটির তরফে। শুধুমাত্র তাই নয়, গত সাত বছর ধরে, এই সমাজচ্যুত মানুষগুলোর সামান্য স্বপ্নপূরনের জন্যে,শত প্রতিকুলতার মধ্যেও নিয়মিত দুর্গাপুজোর আয়োজনও করে চলেছে এই কমিটি।
এক কথায় বলা যেতেই পারে, এই করোনাকালে, এশিয়ার সর্ববৃহৎ নিষিদ্ধপল্লী, সমগ্র সোনাগাছি অঞ্চলের সমস্ত যৌনকর্মীদের অভিভাবকের মতো তাদের জীবন জীবিকা ও সুরক্ষার দ্বায়িত্ব নিয়ে, দেবদুতের ভূমিকায় দায়িত্ত্ব পালন করে চলেছে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি।

( তথ্যসূত্র:- কাজল বোস,সেক্রেটারি, দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি )