অনুগল্প – গুচ্ছ

রুবি শেখ :- 

                            ব্যর্থতা
ব্যর্থতা

রেললাইনের ধার ঘেঁষে পড়ে আছে মেয়েটার দু-টুকরো নিথর শরীরটা। সমগ্র শরীরে ধূসর কোষের কাজ স্তব্ধ।
হাতের মুঠো আলগা-খেলানো, উঁকি দিচ্ছে কুঁচকানো রক্তের দাগ লাগা ছোট্ট চিরকুট। “গল্পের একটা জমাটি প্লট পাওয়া গেল। এবার আর প্রকাশক তাঁকে ফেরাতে পারবেনই না।” মনে মনে কিছুটা হালকা হলেন সুবিমল বাবু।
উস্কো খুস্কো চেহারা, কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা, অযত্নে দাগী পাঞ্জাবি পরা ভীষণ রকমের অগোছালো একজন “ব্যর্থ” লেখক ভাবনার অন্তর্জালে তখন “জমাটি” প্লটের উপস্থাপনার জন্য শব্দ সাজাতে সাজাতে একটা নিথর জীবনকে কেন্দ্র করে উপচে পড়া অবাঞ্ছিত মানুষের ভীড়কে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন। হটাৎ ভারী বাতাস কানে ঝাপটে পড়লো,
“স্বপ্ন…মেয়েটা অপূর্ণ স্বপ্নের বোঝা আর টানতে পারেনি।”
থমকে দাঁড়ালেন।
গুছোতে থাকা শব্দ আর ভাবনাগুলোকে মুহূর্তেই খোলা হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন, তারপর পরম এক আত্মতৃপ্তিতে স্বউক্তি করলেন,
“অন্যের ‘স্বপ্ন’কে বেচে লেখক হওয়া! থাক। লেখক নাই বা হলাম আর!”

                                   টান
টান

খাল পাড়ে পাগলা বিশুর চিতাটা এখনো জ্বলছে। রেল স্টেশনে কুকুর বিড়ালের মত পড়ে থাকা একজন “পাগলা”র “পুড়তে থাকা লাশের” জন্য কে আর কতক্ষণ সময় দিতে পারে? সবাই ঘরমুখো।
শুধু কিছু দূরে নির্বাক দৃষ্টিতে একরাশ শূন্যতা নিয়ে বসে “নেড়ি” , হ্যাঁ বিশু এই নামেই ডাকতো তাকে।
বিশু আর নেড়ির মধ্যে সম্পর্ক ছিল- একটুকরো বিস্কুট বা পাউরুটির। জ্বলতে থাকা চিতার চোখ ঝলসানো আগুন যেন আচমকাই “নেড়ি”কে কটাক্ষ করে,
“কিসের টানে এখনো বসে ?”
নেড়ি আজ ‘ঘেউ ঘেউ’ করে উত্তর দেয়না, শুধু চিতার আরো একটু কাছে সরে বসে।আর পোড়া চামড়ার গন্ধে মৃত্যুভয়ে ভীত কুঁকড়ে যাওয়া প্রকৃতি যেন নিরুত্তর নেড়ির থেকে উত্তর পায়,
“আত্মিক টানে”

                                ক্ষত
ক্ষত

এসিড দগ্ধা মেয়েটা চোখে চোখ রেখে বললো,
“কেন আমার এই ক্ষতকে ভালোবাসতে চান ?”
“জানেন না, বিষে বিষে বিষক্ষয় হয় ?” শুকনো মুখে চওড়া হাসি টানলো বড্ড অগোছালো ছেলেটা― আপনার শরীরে ক্ষত আর আমার মনে। এই দুই ক্ষত’র মিলনই পারে আমাদের সব ক্ষত মুছতে।
একবার আমার ক্ষতের মলম হয়ে দেখুন না, আমিও আপনার গভীর ক্ষতে মলমের প্রলেপ দেব, ভীষণ যত্নে।

                          বিরিয়ানী
বিরিয়ানি 1

ট্রেনে ওঠা থেকেই মালতী উশখুশ করছে। বারবার গেটের বাইরে মুখ বের করে গন্তব্যের দূরত্ব জানতে সে যেন মরিয়া। অথচ সে জানে তার ঘরে ফেরার পথের রেখা এখন ভীষণ ভাবেই অস্পষ্ট। তবুও…

রেখা মাসি দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলো,
“মাগীর ছেনাল দেখে আর বাঁচিনা”…
অন্যদিন হলে মালতী মুখ লড়াতো, চলতো চিৎকার চেঁচামেচি, খিস্তি খেউর। কিন্তু আজ মালতী মুখ টিপে হেসে সবটা এড়িয়ে যায়। কারণ তার আজ ঘরে ফেরার বড্ড তাড়া―
বৌদির বাড়ি থেকে পাওয়া বিরিয়ানির প্যাকেট তখন তার মলিন ঝোলায়, মায়ের ফেরার পথ চেয়ে ঘরের দাবায় বসে ঘুমে ঢুলতে থাকা মেয়েটা বিরিয়ানির “গন্ধ” বড্ড ভালোবাসে।

                          এক কোঁচড় সুখ
এক কোঁচড় সুখ

নূন্যতম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে শুকিয়ে আসা জীবন নিংড়ে রোদে-তাপে পুড়ে রাস্তায় পিচ ঢালাইয়ের কাজে সবটুকু শ্রম ঢেলে চলেছে বিকাশ। জ্বলছে তার ঘেমো কর্মঠ শরীর, পুড়ছে মন। তবুও থামেনা সে, কারণ কিছু সম্পর্কের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাকে ফিরতেই হবে নদী ঘেঁষা গাঁয়ের একচালা বাড়ির শীতল উঠোনে― এক কোঁচড় সুখ কিনে।

                   ঝলসানো_রুটি
ঝলসানো_রুটি

সরু খালে আঁধারের করায়ত্তে, ছোট জেলে নৌকার খোলে বর্ণহীন নিস্তব্ধতার বাহুবেষ্টনীতে আবদ্ধ ওরা। পাশের জঙ্গল থেকে ভেসে আসে মৃত্যুর তীব্র ঘন গন্ধ।

পূর্ণিমার কোটাল। জালে জড়াবে উদ্দাম স্রোতে খেলায় মত্ত মাছের ঝাঁক।
আর ওদের জুটবে ভরপেট ভাত।

পূর্ণিমার নরম আলোয় রাতের অন্ধকার গাঢ়তা হারায়,হারু তাকিয়ে দেখে উষাকে। দরদ জাগে তার। যৌবনে ভরপুর একটা নারী শরীর লেপ্টে আছে কমদামী সুতির ছাপা ময়লা শাড়িতে।

যে বয়সে গুছানো সংসার সামলে স্বামীর সোহাগে, রাতের আদরে নিঃশ্বাস ঘন হওয়ার কথা, সেই বয়সে পেটের নগ্নতার দায়ে স্বামীর সাথে আজ অনন্ত জলরাশির বুকে খোলা আকাশের নিচে, মৃত্যুর ভীষণ কাছে…
হারু দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনে মনে বলে,
“বড়নোক বাবুদের কবি ঠিক কতায় কয়ে গেছেন,
‘পুন্নিমার চাঁদ য্যান ঝলসানো উটি’…”

-সমাপ্ত-