দিনবদলের খিদে ভরা চেতনায়

স্বাতী সরকার :-
– মুনিয়া , , , অ্যাই মুনিয়া শোন এদিকে।
– যাই বৌদি ।
– তোমার কাজ আর কতো বাকি ? এরপরে অন্য কোন বাড়ি যাওয়ার আছে ? নাকি এখান থেকে বাড়ি যাবে ?
– না বৌদি । হয়ে গেছে , এবারে এখান থেকে জোড়াব্রিজ এর ইস্কুলের থেকে ছেলে নিয়ে বাড়ি ফিরবো ।
– কটায় ছুটি ? একটু সময় হবে ?
– কী করতে হবে বলো না বৌদি । ( এই মহুয়া বৌদির কাজ একটু এক্সট্রা করে দেয়াই ভালো, কামাই করলে খিচখিচ করে ঠিক, কিন্তু দেয়থোয় ও ভালো । আর বিনি পয়সায় কাজ ও করায় না । হাতে এক্সট্রা টাকা এলে কিছু কেনা ও যায় )
– অন্য কিছু না , সিঁড়ি তে পড়ে গিয়ে পাটা বড্ডো ফুলে আছে , পরে একটু রান্নার জোগাড় করে দিয়ে যেতে পারবে ? আমি কোন রকমে রান্নাটা করে নেবো ।
– হ্যাঁ বৌদি পারবো । আমি একটু ঘুরে আসি , ছেলেকে বাড়িতে শাশুড়ির কাছে পৌঁছে দিয়েই চলে আসছি । তোমার অসুবিধে না হলে, আমার হাতে খেলে আমি রান্না টুকু করেও দিতে পারি ।
– খুবই উপকার হয়গো । ঠিক আছে, এসো তুমি ঘুরে । আর একটা কাজ করো , ফ্রিজে দ্যাখো তো, গতকাল রাতের খাবার আনিয়ে ছিলাম , কিছুটা চাউমিন আর চিলি চিকেন আছে, ওটা এখান থেকেই গরম করে নিয়ে যাও । ছেলে টাকে খেতে দিয়ে এসো ।
– (ছেলে টা বড্ডো ভালোবাসে এসব ভালো-মন্দ খেতে, বাপটা তো কবেই ফেলে দিয়ে অন্য মেয়ে ছেলে নিয়ে ঘর বেঁধেছে । এসব কিনে দেবার ক্ষমতা কই , এই মহুয়া বৌদি ই কত রকমের খাবার দেয় , ছেলেটার মুখটা আলো হয়ে ওঠে । কখনো একটু শাশুড়িকেও দেয়। বুড়িটা ঘর সংসার দেখে , ছেলেকে মুনে রাখে বলেই না লোকের বাড়ি কাজ করতে পারছে । আর সবচেয়ে বড় কথা , ভাঙা চালা হোক , বাড়ি তো শাশুড়ির , সে ইচ্ছে করলেই আমায় ছেলে শুদ্ধু বার করে দিয়ে নিজের ছেলের সাথে থাকতে পারতো । কিন্তু বুড়ি নিজের পেটের ছেলেকে তাড়িয়ে আমায় থাকতে দিয়েছে , এর দাম কি করে দেবো ) ভাবতে ভাবতে পা চালায় মুনিয়া , বাড়ি গিয়ে ছেলেকে চান করিয়ে খাবার গুলো দিয়ে শাশুড়িকে বলে আসে এই বাড়িতে রান্নার কথা । মনে ভাবে কটা দিন যদি বৌদি রান্নাটা করায় তবেই বেশ কিছু টাকা আসবে হাতে, বুড়ি শাশুড়ির কদিন থেকেই চোখে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে , বুড়ির চশমা আর ছেলের ইস্কুল এর ব্যাগ আর জুতো তবে হয়ে যাবে ।
– বৌদির কাছে এসে বৌদিকে জিজ্ঞাসা করে কি কি রান্না করতে হবে ,আর কিভাবে করতে হবে, শুনে মুনিয়া যতটা পারল করে দিল, আসলে আদতে ওরা বিহারী, ওদের রান্নার ধরন আর বৌদিদের রান্নার ধরন তো আলাদা ।
– বৌদি রান্না হয়ে গেছে । তুমি বললে আমি এই দুপুরে এসে কটা দিন তোমায় রান্না টা করে দিতে পারি । আর একটা কথা বলবো তোমায় ?
– হ্যাঁ বলো না ।
– আমি মালিশ করতে জানি, তোমার পা টা কি একটু টেনে দেবো ? আমার মা ঠাকুমা সবাই মিলে মালিশের কাজ করতো গো । আমার শাশুড়িও দাই এর কাজ করতো । আমি পারি , একবার করিয়ে দ্যাখো ।
– ঠিক আছে ঠিক আছে, দাও মালিশ করে । যদি ব্যথা একটু কমে, ভালোই তো ।

– আরে বাঃ তোমার হাতে তো জাদু আছে গো মুনিয়া । সত্যিই ব্যথা টা বেশ কম ।

– হ্যাঁ গো বৌদি, আমি পারি এসব কাজ, তবে গেরামের থেকে এখানে আসার পর তখন বর ছিল, বাচ্চা হল তখন তো আমি কাজে বার হইনি । তারপরে বরটা পালিয়ে যেতে তখন আমাদের বস্তির একজন এসব কাজ জানি শুনে, পাল্লারে কাজ পাওয়াতে নিয়ে গেছিলো । কিন্তু সে কাজ আমি করিনি বৌদি । ওখানে মালিশ এর নামে নোংরামি হয় । সব লোকেরা আসে গো । আমি মেয়েদের মালিশ করতে পারি, কিন্তু ওসব করবো না ।

– ঠিক আছে । আমার চেনা জানা কেউ বললে আমি তোমার কথা বলবো । এটাকে ম্যাসেজ করা বলে । সব ম্যাসেজ এর আলাদা আলাদা রেট, মানে টাকা হয় । কেউ খালি মাথা ম্যাসেজ করায় , কেউ হাত পা । কেউ ঘাড় পিঠ । কেউ পুরো বডি । তুমি কত নেবে সেটা তুমিই রেটিং ঠিক করে বলে দেবে ।

– ঠিক আছে বৌদি, তুমি বলছো যখন , তোমার চেনা লোক হলে আমি যাবো । কিন্তু তুমি কি আমায় কাজ ছাড়িয়ে দেবে ?

– আরে না না । আমি তো তোমার ভালোর জন্যই বলছি । তোমার হাতের গুন আছে। সেটা কে কাজে লাগাও । আমি কাজ ছাড়াবো কেন ।

দিন ঘোরে , মাস ঘোরে , ধীরে ধীরে মুনিয়ার নাম ছড়ায় একটু একটু করে । মুনিয়ার হাত সত্যিই কথা বলে । গোটা কমপ্লেক্স এর বৌদি রা আজকে ওর কাস্টমার । মধ্যবয়সী বৌদিরা তাদের ব্যথাবেদনা কমাতে , বা চাকচিক্য ফেরাতে ডাকে । অনেক কমবয়সী বৌদি বা দিদিরাও আছে , যারা শরীরের জেল্লা ধরে রাখতে ডাকে ওকে । শাশুড়ি মা বেশ কিছু ধরনের মালিশ, মানে ম্যাসেজ শিখিয়ে দিয়েছে, বহু বৌদির উপোসি শরীরের আড় ভাঙে সেসব মালিশে । তারা খুশি হয়ে যায় । আজকাল মুনিয়ার খুব চাহিদা । একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন ও নিয়েছে । কিন্তু মহুয়া বৌদির কাজটা ছাড়েনি মুনিয়া । বৌদিই তো ওকে রাস্তাটা দেখিয়েছে, আজকে ওর বাচ্চা ভালো আছে, শাশুড়িকে একটু ভালো রাখতে পারছে । ভাঙা চাল সারাতে পেরেছে । দুটো পয়সা জমাতে পারছে, ভবিষ্যতের জন্য, সবই তো বৌদির জন্যই । বৌদি ওর লক্ষ্মী ।

একদিন বাড়িতে এসে মুনিয়া দ্যাখে ওর বর এসেছে বাড়িতে । ওর শাশুড়ি, ওর বর কে সামনে বসিয়ে মাছ ভাত খাওয়াচ্ছে । মুনিয়া তাড়াতাড়ি আড়াল থেকে ওদের কথা শুনতে দাঁড়িয়ে যায় ।

ওর বর আবার এই বাড়িতে ফিরে আসতে চাইছে । ‘ সে ওর মায়ের বাড়ি আসতেই পারে , থাকতেই পারে । কিন্তু তবে আমি আর এবাড়িতে থাকবো না’ মুনিয়া মনে মনে ভাবে, ‘ আমি তবে ছেলে নিয়ে বেরিয়ে যাবো । অন্য মেয়ে নিয়ে ঘর করে এসে আবার আমার স্বামী হতেই দেবোনা, থাক ও মায়ের ছেলে হয়ে’ । হটাৎ ই শুনতে পায় ওর শাশুড়ি বলছে , ‘দ্যাখ বাবু তুই এসেছিস, দুটো মাছ ভাত বেড়ে খাইয়েছি , এটা আলাদা কথা , কিন্তু এটা আমার বাড়ি, আমি তোকে এখানে থাকতে দেবো না । তুইতো নিজের সুখের জন্য আমাদের ফেলে চলেই গেছিলিস, আজকে ওই মেয়েটা মুখের রক্ত তুলে খেটে আমার আর তোর ছেলের পেটের ভাত জোগাড় করে । মাথার ওপরে চাল ঠিক করেছে । তুইতো আজকে চকচকে বাড়ি দেখে লোভে লোভে এসেছিস, কিন্তু এ ঘর বাড়ি আমার বৌমা আর নাতির । এ আমি তোকে দেবোনা। এরপরেও তোর যদি আমায় দেখার ইচ্ছে জাগে দেখে যাবি । তবে আমি জানি তুই আর আসবি না’ । আড়াল থেকে সরে যায় মুনিয়া ।

সেদিন প্রথমবার শাশুড়িকে বরের মা নয়, নিজের মা মনে হল। রাতে খাবার পর দাওয়ায় বসে হটাৎ ই মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরলো মুনিয়া । শাশুড়ি বলে ওঠে ‘ কি হল রে পাগলি মেয়ে, খুব শরীর খারাপ লাগছে বুঝি ? সে লাগতেই পারে , সারাটা দিন যা পরিশ্রম করিস । আয় আমি তোর মাথায় একটু তেল মালিশ করে দিই ॥