খিদে

স্বাতী সরকার

তাপস প্রতিদিন সকালে সাইকেল টা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে । সামনের হ্যান্ডেলে দুটো ব্যাগ ভরা দুধের প্যাকেট, আর পিছনের ক্যারিয়ারে খবরের কাগজ, এই নিয়ে ভোর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত লোকের বাড়ি বাড়ি বিলি করে বেড়ায় । আগে হাওড়ার দিকে থাকতো, মা এর সাথে , কাজ করতো ডানলপ এর কারখানায়। তো সেই সে কারখানা তো কবেই বন্ধ হয়ে কাজ ও কবেই চলে গেছে । তারপর মা ও মরে যেতে তিনকূলে আর কেউনেই তাই যেমন ইচ্ছে চলছিলো । কখনো রাজমিস্ত্রির জোগাড় এর কাজ , কখনো রং মিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ , কখনো বা লোকের বাড়ির পরিস্কারের কাজ, এভাবেই চলছিলো , এই করতে গিয়েই মুকুন্দপুর এ এক বাড়িতে রং মিস্ত্রির জোগাড়ের কাজে গিয়ে আলাপ হয় শেফালি র সাথে , সে ওই বাড়িতে থাকা খাওয়ার রাত দিনের কাজের মেয়ে । কাজ করতে করতে কখন যে শেফালি কে ভালো লেগে গেল, তা তাপস নিজেও বলতে পারেনা । কিন্তু একটা সময় দুজনে দুজনের সাথে ঘর বাঁধতে চেয়ে বিয়ে করবে বলে ঠিক করলো । তাও তাপস এর মনে কিন্তু ভাব ছিল, যতোই হোক সে হল গিয়ে মন্ডল আর শেফালিরা চক্রবর্তী, বামুনের মেয়ে । শেফালিই বলে “বাপ মা মরা মেয়ে আমি, কাকা কাজের বাড়ি ঢুকিয়ে দিয়ে খালাস, আমার আবার জাত পাত কি ! ! ! আমাদের একটাই জাত, -আমরা গরীব মানুষ । চলো ঘর বাঁধি, দুজনে রোজগার করবো, দুজনের চলে যাবে” । তাপস আর শেফালি জোড়াব্রিজ এর খাল ধারের বস্তির মধ্যে ঘর ভাড়া নিয়ে দুজনে সংসার পেতে বসলো। তা চলে যাচ্ছিলো ও , তাপস দুধ আর কাগজের কাজ করে তারপর যেদিন যা পায়, সেই কাজ করতো । আর শেফালি দু বাড়িতে রান্নার কাজ ধরে নিলো।

এর মাঝে সুখে দুঃখে বেশ বছর পাঁচেক কেটে গেছে । দুজনের সংসারে অভাব থাকলেও অভিযোগ নেই । অসুবিধে শুরু হল যখন একসাথে জমজ ছেলে হল হল শেফালির । একে তো একসাথে দুটো বাচ্চা । এর মধ্যে বাচ্চা হবার সময়ে রান্নার বাড়ির কাজ গুলোও চলে গেছে । আর তাপস এর ও কাজ কম এখন । দুধ আর লোকজন প্যাকেট বেশি নেয় না, সব কাগজের বাক্স নাকি কেনে, সে নাকি এমনিই খাওয়া যায় , আর কাগজ ও এখন নাকি মোবাইলে পড়ে। একে তো বাড়ি ভাড়া এখন কতো বেড়েছে, তারপর আবার দু দুটো বাচ্চা। তাও তাপস ভালোই চালিয়ে নিচ্ছিল । দেখতে দেখতে ওদের ও বছর দুয়েক বয়েস হয়ে গেল। নিজেদের দুটো পেট, মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে যায় তাপস, নিজের কাছে দুটো ব্যাগ ভরা দুধের প্যাকেট থাকে তবুও একফোঁটা দুধ তুলে দিতে পারেনা বাচ্চা দুটোর মুখে । সেই কোন ছোটো বেলার থেকে চাল বেটে জ্বাল দিয়ে, সাবু জ্বাল দিয়ে নয়তো ভাতের মাড় কে চিনি দিয়ে ফুটিয়ে খাইয়ে আসছে শেফালি বাচ্চা দুটোকে। বোঝে শেফালি কি কষ্ট করে রোজগার করে তাপস। কিচ্ছুটি বলে না মুখ ফুটে । এর মধ্যে একটা সুরাহা হল সামনের শিব কালী মন্দিরে একটা কাজ পেলো শেফালি, মন্দির চত্ত্বরটা ঝাঁট দেয়া, মন্দিরের ভেতরটা পরিস্কার করে মুছে দেয়া আর মন্দিরের বাসন মাজার কাজ । বাচ্চা দুটোকে মন্দিরের চাতালে বসিয়ে রেখে কাজ সেরে ফেলতে পারে আর খুব বেশি সময় ও লাগে না । মন্দিরের প্রসাদ ও দেয় বাচ্চা দুটো কে । কখনো একটু ফল , কখনো মিষ্টি । শুধু কোন পুজো পার্বনের দিন শেফালিকে বেশিক্ষণ থাকতে হয় । সে দিন গুলোতে তাপস সামলে নেয় । মন্দিরের কাজ বলে খুব নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করে শেফালি। মন টা কদিন ধরেই খুব খারাপ হয়ে আছে, তাপসের রোজ রাতে জ্বর আসছে, সেই নিয়েই দুধ আর কাগজ নিয়ে বেরোচ্ছে, কিন্তু আর কোন কাজ ধরতে পারছে না , শরীরে দিচ্ছেনা । গতকালই মন্দিরের থেকে বলে দিয়েছিলো আজকে নীল ষষ্ঠী । আজকে অনেক লাইন পড়বে মন্দিরে শিব এর মাথায় জল ঢালতে। এদিকে ঘরে খাবার নেই এক কণা ও। এদিকে তাপস আজকে দুধ বিক্রি বেশি হবে সেই আশায় ছিল, তাহলে বাড়তি পয়সা তে কিছু কিনে আনবে । কিন্তু এদিকে সকালে ই শেফালি কে মন্দিরে চলে যেতে হবে বলে, সেটাও হল না। যেটুকু চাল ছিলো ফুটিয়ে ফ্যান শুদ্ধু ছেলে দুটো কে খাইয়ে আর বাকি টুকু তাপস কে দিয়ে চান করে মন্দিরে দৌড়ায় শেফালি। উপোস করেই আছে সকাল থেকে , মনে ভেবে রেখেছে সবার হয়ে গেলে ও নিজেও একটু ঠাকুরের কাছে বলবে, ও তো বেশি কিছু চায়না । শুধু ছেলে দুটো একটু পেট পুরে খেতে পাক , তাপস একটু কাজ করতে পারুক তাহলেই হবে । ঠাকুর কে এতদিন সেবা করছে, এটুকু প্রার্থনা কি ঠাকুর শুনবে না! ! কত বেলা হয়ে গেছে , এসে থেকে আর একটুও বসার সময় পায়নি, মন্দিরের ভেতরটা মুছে চাতাল মুছে পুরো মন্দিরের চারপাশটা ঝাঁট দিয়ে পরিস্কার করে এসে বাসন সব ধুয়ে গুছিয়ে দিলো । আজকে আবার বড়ো বড়ো বালতি গামলা বেরিয়েছে । সবাই পুজো দিয়ে যাচ্ছে শিবের মাথায় দুধ আর জল ঢেলে । শিব লিঙ্গ র সামনে একটা বালতি বসানো , সব দুধ জল ওতে পড়ছে , আর মন্দিরের পুরোহিত মশাই তাড়াতাড়ি করে ফুল বেলপাতা মালা একটা গামলায় , ফল গুলো একটা গামলায় আর মিষ্টি গুলো অন্য গামলায় তুলে আলাদা করে দিচ্ছেন । এর মধ্যেই বেশ কয়েক বার ফুল মালার গামলা নিয়ে ওকে পুকুর ধারে একটা বড়ো ড্রাম এ ফেলে আসতে হয়েছে । ফল গুলো আবার পুজো দিতে আসা মানুষদের হাতে প্রসাদ হিসেবে তুলে দিচ্ছে মন্দিরের লোকজনরা । শেফালি দেখছে আর ভাবছে , এখানে কত খাবার, কিন্তু সেগুলো তো এখন ওর বাচ্চা দুটো পাবেনা কিন্তু এতক্ষন এ ওদের নিশ্চই খুব খিদে পেয়েছে । নিশ্চই খুব কাঁদছে । এসব ভাবতে ভাবতে পুরোহিত মশাই ডেকে দুধের বালতিটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন পুকুরে ঢেলে আসতে । বালতি হাতে পুকুরে যেতে যেতেও শেফালি উল্টো দিক দিয়ে দৌড়ায় বাড়ির দিকে , বাড়িতে গিয়ে হাঁড়ির মধ্যে দুধ মেশানো জলটা ঢেলে দিয়ে তাপসকে ডেকে বলে, ভালো করে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে বাচ্চা দুটোকে দিয়ে দিতে আর নিজেকেও খেতে । বলেই আবার দৌড় দেয় মন্দিরের দিকে । পুকুর থেকে বালতি ধুয়ে পৌঁছে দেয় মন্দিরে । আর হাত জড়ো করে মনে মনে বলতে থাকে ঠাকুরকে, “তুমি তো সবই জানো ঠাকুর , যা পাপ করার আমি করেছি , কিন্তু পুকুরে ঢেলে দিলেও তো ওই দুধ জল কারো কাজেই লাগতো না । কিন্তু ওটা দিয়ে আমার বাচ্চা আর স্বামীর পেট ভরবে , তাও যদি এটা পাপ তবে আমায় শাস্তি দিও ঠাকুর ওদের কিছু হতে দিও না” ।

সব কাজ শেষে কিছু প্রসাদের ফল মিষ্টি যা মন্দির থেকে দিয়েছে তা নিয়ে ঘরে ফিরে শেফালি দ্যাখে বাচ্চা দুটো পেট ভরে দুধজল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । ওদের ঘুমন্ত মুখ দেখে শেফালির মন থেকে অপরাধ বোধ চলে গিয়ে হাসি ফুটে উঠলো, যা একমাত্র মায়ের মুখেই আসে ॥