স্বপ্ন – পূরণ

সুদেষ্ণা চক্রবর্তী

এই পৃথিবীতে তিন শ্রেনির মানুষ বসবাস করেন যেমন উচ্চবিত্ত , মধ্যবিত্ত , নিম্নবিত্ত।

আমার গল্পের নায়িকা দেবযানী ওই নিম্নবিত্তর মধ্যে পড়ে।

দেবযানীর বাবা ছোটো একটা চায়ের দোকান চালান।

চায়ের সঙ্গে আরও কিছু টুকিটাকি যেমন বিস্কুট, ডিম টোস্ট ও ঘুগনি।

দেবযানীর মা সকালে তিন বাড়ি রান্না করেন ওই তিন বাড়ি থেকে যা খাবার পান তা এনে মেয়েকে খাওয়ান , নিজে খান ও বরের জন্য রাখেন।

দুপুর থেকে সন্ধ‍্যে পর্যন্ত নিজের হাতে বানানো আচার , ডালের বড়ি বিক্রি করেন।

বাবা এবং মায়ের সীমিত উপার্জনে কোনোভাবে দিন কেটে যায় । কলকাতার শহরতলির দেবযানীর পরিবার অনেক কষ্টেই তাদের জীবন অতিবাহিত করে ।

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান দেবযানী ।

লেখাপড়ায় মেধাবি ।

এই মধাবি ছাত্রীর জন্য উপযুক্ত শিক্ষা সামগ্ৰী এনে দেওয়ার সামর্থ ছিল না দেবযানীর বাবা – মায়ের ।

অনেক কষ্টে পড়াশুনা করত দেবযানী । কখনো স্কুলের শিক্ষক , কখনো সহপাঠি বা কখনো স্কুলের সিনিয়ার দাদা ও দিদি ওকে শিক্ষা সামগ্ৰী সাহায্য করত । ক্লাস ওয়ান থেকে ভালো রেজাল্ট করত দেবযানী । স্কুলের নিম্মবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়ে এত ভালো রেজাল্ট! তাও কিনা এক চাওয়ালার মেয়ে ?

       উচ্চবিত্ত কাকু কাকিমা মেনে নিতে পারেন না ভগবানের এই অবিচার । তাঁরা ভগবানের এই বিচারে অসন্তুষ্ট হয়ে বলতে থাকেন ———–

—–“কেন এই দরিদ্র মেয়েটার মাথায় এত বুদ্ধি দিয়েছেন ভগবান”?

——-“আমরা কি ভগবানকে কম পুজো করি ?”

——–“এই তো সেদিন তারা মায়ের জন্য একটা সোনার চেন গড়িয়ে দিলাম , যাতে মা সন্তুষ্টি হয়ে আমার মেয়ের রেজাল্টটা ভালো করে দেন।”

—-” এতকিছু পেয়েও কি কিছু করলে ঠাকুর ?

আর এই হতদরিদ্র পরিবার যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তাদের মেয়ের রেজাল্ট দেখো ।

কি হবে ওদের এত ভালো রেজাল্ট নিয়ে

সেই তো পরের বাড়ি গিয়ে রান্না করবে বাসন মাজবে ।”

তারককে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এই মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

যেমনি ভাবনা তেমনি কাজ ।

চশমা চোখে দিয়ে তারকের (দেবযানীর বাবার )চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন কাকু।

—-“এই যে তারক এক কাপ চা দে তো

——“যেই তারক ( দেবযানির বাবা ) চা দিতে এলো অমনি ওর দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো গোল করে বললেন মেয়েতো উচ্চমাধ্যমিক পাশ করলো , তা রেজাল্টও তো ভালো ।

—–হ্যাঁ দাদা মেয়ে এবছর খুব ভালো রেজাল্ট করেছে।

—-“সেই জন্য তো বলছি , এই সুযোগে ভালো পাত্র দেখে বিয়ের ব্যবস্থা কর । বিয়ের বয়স তো

পেরিয়ে যাবে এবার “

” মেয়ের বেশি বয়স হলে বিয়ে দিবি কি করে শুনি ?

এই সুযোগে ভালো পাত্র পেলে বিয়েটা দিয়ে দে ,

যদি বলিশ আমি ভালো পাত্র জুটিয়ে দেবো ।

সারা জীবন খেয়ে পরে ভালো থাকবে ।

কোনো উত্তর দেয়নি দেবযানীর বাবা । মাথা নিচু করে সরে যান ওখান থেকে ।

যাবার সময় ভদ্রলোক বলে যান ভেবে দেখিস ব্যাপারটা ।

দেবযানীর বাবা মনে মনে ভাবতে থাকেন

“নিজের বাড়ির মেয়ে রয়েছে যার বয়স ৩৫ ছাড়িয়ে গেল এখন ও বিয়ে দিয়ে উঠতে পারলেন না , তিনি আমার ১৭ বছরের মেয়ে বিয়ের চিন্তা করছেন।

“এই বড় লোকেরা ভেবেছে কি আমাদের  যা খুশি তাই বলবে ? “

এদিকে যার বাড়িতে দেবযানীর মা রান্নার কাজ করেন সেই কাকিমা তো বলেই ফেললেন

“দেখো দেবযানীর মা তুমি তো ভালোই রান্না – বান্না জানো । এবার মেয়েকেও শিখিয়ে পড়িয়ে নাও । যাতে দশ বাড়ি কাজ করে তোমাদের হাতে দুটো পয়সা দিতে পারে । সেই ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত তোমরা কী কম করলে ওর জন্য। রান্না সংসারের অন্যান্য কাজ শিখে নিক , তারপর একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দাও।”

“এখন যা দিন কাল পড়েছে , মেয়েকে বাইরে পড়তে পাঠালে না জানি কি অঘটন ঘটে যায়।”

এদিকে এই উপদেশ দাতা কাকিমার মেয়ে শহরে যায় এক্টিং, মডেলিং ,ডান্স আর ও কত কিছু শিখতে ।

অর্থ পতিপত্তি থাকায় তার মেয়ের সঙ্গে কোনো অঘটন ঘটার ভয় নেই তাঁর।

প্রতিবেশি কাকু কাকিমার এই কথার উপোযুক্ত উত্তর দেবযানীর বাবা – মায়ের জানা থাকলে ও কোনো কঠিন জবাব তাঁরা দেননি।

তাঁরা এটুকই বলেছিলেন — “মেয়ের লেখাপড়া  আমরা কোনো  বাধা দিতে চাই না , সে আমাদের যতই কষ্ট হোক ।”

স্বল্প বাক্যের এই উত্তরে সন্তুষ্ট হননি বিত্ত শালি কাকু –  কাকিমা।

দেবযানীর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার কাজে অনেক বাধা সৃষ্টি করেন তারা । সেই সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে দেবযানী ।

ছোটোবেলা থেকেই সাংবাদিকতার প্রতি বিরাট ঝোঁক ছিল দেবযানীর।

তাই উচ্চমাধ্যমিকের পর সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে দেবযানী ।

ভালো রেজাল্ট করে এরপর মাস্টার ডিগ্ৰি করে । স্কলারশিপ পেয়ে ডক্টরেট করে দেবযানী ।

এরপর পৃথিবীর সবচেয়ে নামী সংবাদমাধ্যমের উচ্চপদস্থ কর্মী সে ।

দেবযানী এখন একজন সুবক্তা ও বটে । এখন কোথাও দেবযানী মোটা টাকার বিনিময়ে কোথাও বিনা পয়সায় মোটিভেষনাল স্পিচ দেয় ।

এই অনুষ্ঠানে শ্রোতার আসনে বসে থাকে সেই বিত্ত শালি কাকু – কাকিমার ছেলে মেয়ে ।

                          সমাপ্ত