আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার আলোয় তুলে ধরতে পাশে দাঁড়িয়েছে ৯ জন যুবক – যুবতী

কল্যাণ অধিকারী, হাওড়া : শিশুরাই ভবিষ্যতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তাকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষিত গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু মা-বাবা সকাল হলেই বেরিয়ে যায় কাজে। খালি গায়ে ঘুরে বেড়ানো আর পান্তা ভাত খেয়ে গোটা দিন শিশুরা কাটায়। নেই কঠোর শাসন, শিশুর শিক্ষাও থেকে যায় অধরা। ওদের পাশে বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ, স্লেট, পেনসিল, খাতা, পেন-সহ অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসলো ৯জন যুবক-যুবতী।

ওরা শোরেন-হাসদা-মান্ডি-মুর্মু-বাগচি-মুন্ডা, সিং মিলিয়ে তিরিশ-বত্রিশটা পরিবার গা ঘেঁষা ঘরে বসবাস করে। মোট ২২-২৩ টা ঘর। ঘর বলতে মাটির দেওয়াল দেওয়া ত্রিপলের ছাউনি। ন্যাতা টানা মাটির মেঝে। উচ্চতায় মেরেকেটে তিন ফুট। আমতার খড়িয়প গ্রামের আদিবাসী পরিবারের পঁয়ত্রিশ জন শিশুদের শিক্ষার খোলনলচে বদলাতে বুধবার হাজির হয় স্বপ্না, জয়িতা, প্রিয়াঙ্কা, সোমা, শতাব্দী, সৈকত, রাকেশ সহ ৯জন যুবক-যুবতী। দাদা-দিদিদের কাছে পেয়ে প্রত্যেকের মুখে হাসির ঝিলিক। জামা-কাপড়-চাদর এবং শিক্ষা সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।

শ্যামল, তাপসী, বাবলু, কবিতা, সবিতা সোরেনদের কথায়, সময়টা ৭৭ সাল। আদিবাসী হওয়ায় হুগলি জেলার খানাকুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। হাঁটতে হাঁটতে এ দিকে চলে আসা। পশু শিকার করে জীবন তখন চলতে থাকে। এখানে চলে আসা হয় বড় বন্যার আগে। তারপর থেকে এ গ্রাম ও গ্রাম ঘুরে এতগুলো বছর খড়িয়প গ্রামে আছি। বছর সাতেক আগেও সন্তান জন্ম নিত স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে কুঠুরি ঘরে। ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে মিলত না জন্ম সার্টিফিকেট। ফলে ৬বছর বয়সেও স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। এখন আর ঘরে জন্ম নেয়না ছেলেপুলেরা। গর্ভবতী হওয়া বধূকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মিলছে জন্ম সার্টিফিকেট। কিন্তু পেটের ভাত জোগাড় করতে পুরুষদের সঙ্গে মেয়েদেরও কাজে যেতে হয়। ছেলেপুলেরা
শিক্ষার পথে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে। এনারা এসেছেন বই, খাতা, স্লেট, পেনসিন সহ বহুকিছু দিয়েছেন। শিশুদের স্কুলে পাঠাতে বলেছেন।

স্বপ্না, জয়িতা, প্রিয়াঙ্কা, শতাব্দীদের কথায়, আমরা ক’জন মিলে বই-খাতা, স্লেট দিয়ে ওদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছি। স্কুলে যাতে ভর্তি করা যায় সেই ব্যবস্থাও করছি। প্রাথমিক স্কুল পরিদর্শকের দফতরের এক কর্তা জানিয়েছেন, একটি টিম পাঠানো হবে। প্রয়োজনে ওখানে সেমিনার করে শিশুদের স্কুলে ভর্তি করবার চেষ্টা করা হবে।

একসময় ভাম, কটাস, বাঘরোল, গোসাপ, ইঁদুর নিয়মিত মেরেছে! এখন ছেলে মেয়েরা বাইরে মিশতে শিখেছে। ওরা এখন কাজে চলে যায়। তাছাড়া ওইভাবে থাকলে হবে। পশু মারলে ছেলেমেয়েরা কি ভাববে। এখন অনেক কমে গেছে পশু। আমাদেরও আর পশুকে মেরে রক্ত দেখতে ইচ্ছে করে না। খানাকুলে থাকার সময় আর এখন অনেক বদল এসে গেছে। যে মাটিতে জন্ম সেই মাটি ছেড়ে চলে আসলেও দেশের মধ্যে আর এক পরগনা হয়ে রয়ে গেছি। সমাজের থেকে আলাদা হয়ে গ্রামের একপ্রান্তে থাকতে হয়। একটি ছোট পুকুর ব্যবহার করে তবে সেই পুকুরে গ্রামের অন্যরা নামে না। একি শ্মশানে দাহ কাজ করা যায় না। সামাজিক অনুষ্ঠানে ডাকা মেলে না। লক্ষ্মী সোরেন, কার্ত্তিক সোরেন-এর মেয়ে মণিকা ও বর্ষার মতো আরও অনেককে শিক্ষার আলো দিতে সূর্যর প্রথম আলো পড়বার অপেক্ষায় এক আস্ত আদিবাসী পরিবারের চল্লিশ জন শিশু।