চারুশীলা

স্বাতী সরকার

আয়ুষ রায় দ্বারা সম্পাদিত

উনিশ শতকের প্রথম দিকে উড়িষ্যার কোন এক স্বনামধন্য মন্দিরের আবাস:
কোন একদিন ভোরবেলার ঘটনা:
উফফ কি রক্ত ! ! ! ! খুব ভয় করছে, ফুলমনি, -ফুলির । দু পায়ের মাঝে সারাক্ষণ রক্ত গড়িয়ে আসছে । ঘুম থেকে উঠে দেখেছে বিছানা ভর্তি রক্ত । তবে কি ওর কোন অসুখ করলো ? ওকি মরে যাবে ? বড্ডো পেটে ব্যাথা করছে । ভয়ে ফুলি কাঁদতে থাকে । নিশ্চই এবারে মন্দির থেকেও ওকে বার করে দেবে । আর ও পেট ভরে খেতে পাবেনা । সেই কোন ছোট্টো থাকতে ওকে ওর বাবা মা এই মন্দিরে দান করে গেছে । ওর ভালো করে মনেই পড়ে না, ওর গাঁ কে । বাবা, মা কে । খালি মনে পড়ে খাবার পেতো না , পেটের ভেতরে কেমন হত । রাতদিন খালি ভাতের গন্ধ ভালো লাগতো । তারপর একদিন কারা যেন এল বাড়িতে কী সব কথা বললো, তারপর বাবার হাতে অনেকগুলো টাকা গুঁজে দিয়ে গেল । তার কদিন পরেই বাবা মা দুজনে ওকে ভালো করে চান করিয়ে একটা নতুন জামা পরিয়ে এই মন্দিরে দিয়ে গেল । বলে গেল এই মন্দিরেই থাকতে হবে । বড় হলে নাকি ঠাকুরের সাথে ওর বিয়া হবে । সেই থেকে ও মন্দিরে । চারবেলা পেট পুরে খেতে পায়, জামা কাপড় পরতে পায়, আর হ্যাঁ থাকতে হয় বড়িআম্মা র কাছে । আরো বেশ কয়েকজন ওর মত মেয়ে থাকে এখানে, কিন্তু ওদেরকে বেশি গল্প করতে দেয়া হয়না । ফুলি গুটিসুটি মেরে বসে কেঁদেই চলেছে, এমন সময় বড়িআম্মা এলো । এসে ওকে বলে যে, কোন ভয় নেই, এটা কোন রোগ নয়, এর মানে নাকি ফুলি বড় হয়েই গেছে, প্রতিমাসেই এমন হবে। তখন ওকে ওই ওদিকের একটা ঘরে গিয়ে থাকতে হবে, আরো অনেক নিয়ম আছে ।
দুজন পরিচারিকা এসে ওকে নিয়ে গেল মন্দির আবাস থেকে একটু দুরে একটা একচালা মাটির ঘরে। সেখানে ওকে ভালো করে চান করিয়ে পরিচারিকারা কোমরে একটা কাপড় এর টুকরো বেঁধে দিল আর বলে দিল কিভাবে ওই কাপড়ের টুকরো কে বাঁধতে হবে । আর গায়ে ও একটুকরো কাপড় জড়ানো , মেঝেতে খড় বিছানো আছে , ওখানেই শোয়া । আর ঘরের বাইরে যাওয়া যাবেনা । ফুলি ভয় পেয়ে যায়, একা একা এখানেই থাকতে হবে নাকি ? ? ? তখন পরিচারিকারা বলে, চার পাঁচ দিনেই এই রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে, তখন চান করে শুদ্ধ হয়ে আবার ঘরে ঢোকা যাবে । প্রতিমাসেই এরকমই হবে । ফুলির প্রায় চোদ্দো বছর বয়েস হতে যায়, তবুও ওর ভয় কাটেনা । একসময় এই দুঃস্বপ্নের দিনগুলো ও কেটে গেল, ওকে নদী তে নিয়ে গিয়ে মাটি দিয়ে মাথা ঘসে চান করে আবারো আবাসে ফিরিয়ে আনা হল ।

দিন কাটছে। এবারে একদিন বড়িআম্মা এসে বললেন এবারে নাকি ওর অভিষেকের দিন এসে গেছে । আগামী পূর্ণিমার রাতে ওর অভিষেকের দিন স্থির হয়েছে । ফুলি তো ভেবেই পায় না অভিষেক কি ? অবশেষে এলো সেই রাত, ওকে নতুন শাড়ি গয়নায় সাজিয়ে নিয়ে যাওয়া হল মন্দিরের ভেতরে এক বিশাল গুপ্তকক্ষে । সেখানে গিয়ে ফুলি দেখে আরো কয়েকজন মেয়ে ওখানে দাঁড়ানো । ঘরের মাঝখানে এক বিশাল তামার পাত্র, দুধে ভরা , তাতে ফুল ছড়ানো । তিনধাপ ওপরে বেশ কিছু আসন, তাতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত আর ওঁর কিছু সহযোগী, তা ছাড়া আরো কয়েকজন বসা । বড়িআম্মা বললেন ওঁরা হলেন সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি । এখন থেকে ওঁরাই ফুলি দের এক একজনের দায়িত্ব নেবেন । ফুলি বুঝতেই পারছেনা, ওকে করতে কি হবে । এমন সময় প্রধান পুরোহিত ঘোষণা করলেন, সময় আগত । বড়িআম্মার ইশারায় পরিচারিকারা এসে গায়ের থেকে গয়না ও ক্রমে শাড়ি খুলে নিতে লাগলো । ফুলি চিৎকার করে ওঠে, কিন্তু না, ওযে অসহায় , ধীরে ধীরে ওর গা থেকে সব কিছুই খুলে নেয়া হল, একটুকরো সুতো ও আর নেই। লজ্জায় ভয়ে তখন ফুলি দিশাহারা । বড়িআম্মা বললেন যে ওর গায়ে কোন খুঁত আছে কিনা সেটা যে ওর দায়িত্ব নিতে চায় , সে দেখে নেবে তো, নাকি! আজ থেকে ফুলি দেবতার জন্য নির্দিষ্ট হল । এবারে ওদের কে ওভাবে দাঁড় করিয়ে রেখে চলল দরাদরি, প্রধান পুরোহিতের সাথে সমাজের ওই মান্যগণ্য লোকেদের । অবশেষে কেউ একজন ওর দায়িত্ব নিলেন । উনি আসন থেকে নেমে এসে ফুলির মাথায় ওই তামার পাত্র থেকে তিনঘড়া দুধ ঢেলে দিলেন । প্রধান পুরোহিত মন্ত্র উচ্চারণ করলেন আর ফুলির নতুন নামকরণ হল ‘ চারুশীলা’ ।

কখন যে চারুশীলা কে ঘরে আনা হল , কে যে আবার কাপড় পরিয়ে দিল , ওর আর কিছুই মনে নেই । এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা দিন, এবারে ওকে নিয়ে যাওয়া হল মন্দিরের থেকে দুরে অন্য আবাসে । সেখানে শুরু হল চারুর প্রশিক্ষণ, ওকে যে নাচ, গান, সহবত ও কামশাস্ত্রর চৌষট্টি কলায় নিপুণ হয়ে উঠতে হবে । শিখতে হবে নিজের প্রসাধন, অঙ্গমার্জনা র খুঁটিনাটি। এভাবে দীর্ঘ ছয় থেকে সাত বছর ধরে সমস্ত শিক্ষা লাভ করে এখন চারুশীলা প্রস্তুত । প্রধান পুরোহিত সন্তুষ্ট হয়েছেন । এখন ওকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে মন্দির আবাসে ।

প্রধান পুরোহিত জানিয়েছেন, এবারে শুভদিন দেখে মন্দিরে দেবতার সাথে চারুর বিবাহ দেওয়া হবে। আগামী শুক্লাপঞ্চমী তে বিবাহের দিন ধার্য্য করা হয়েছে । বড়িআম্মা এসে বলে গেলেন । শুক্লাপঞ্চমীর দিন বড়িআম্মা নিজের হাতে নিয়ে এলেন নতুন পট্টবস্ত্র, ফুলের সাজ । সাজিয়ে দিলেন চারুশীলা কে । বিবাহলগ্নে নিয়ে যাওয়া হল মন্দিরের ভিতরে। শাস্ত্রমতে বিবাহ সম্পন্ন হল, বিগ্রহের সাথে । তারপরই নেমে এলো কালরাত্রি চারুর জীবনে । সেদিনই সারারাত প্রধান পুরোহিত মশাই ছিন্নভিন্ন করলেন চারুশীলা কে । দেহের, মনের যন্ত্রনা কমার আগেই জীবনে এলো আরেকটা ঝড় দশদিনের মধ্যেই । সেই পূর্ণিমার রাতে আবারো চারুশীলা কে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া হল , এবারে তার ওপর চড়াও হল সমাজের সেই গণ্যমান্য ব্যক্তি, যিনি এতদিন ওর পিছনে খরচ করেছেন । আবারো সকাল হতে ছিন্নভিন্ন চারুকে ফিরিয়ে আনলেন বড়িআম্মা আবাসে । এতদিনে চারু জানলো, এটাই ওর কাজ । দিনের বেলায় মন্দিরে বিগ্রহের সামনে নৃত্য গীত পরিবেশন করা । আর রাতের বেলায় কখনো প্রধান পুরোহিত , কখনো যিনি ওর দায়িত্ব নিয়েছেন -তাঁর , কিংবা সমাজের অন্যান্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি দের মূল্যের বিনিময়ে মনোরঞ্জন করা ।

মাসখানেক ও কাটেনি, মন্দিরের আবাসে বেশ সোরগোল, কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা আসবেন, এখান থেকে কোন মেয়েকে তাঁদের কোন প্রয়োজনে নিয়ে যাবেন, কিছুদিনের জন্য । বড়িআম্মা নির্দেশ দিলেন সবাইই যেন সাজ শৃঙ্গার করে প্রস্তুত থাকে । নির্দিষ্ট সময়ে আবাসের ভিতরে দুটো পালকি এসে থামলো । সেখান থেকে নেমে এলেন চারজন মহিলা । বোঝা গেল, একজন পরিবারের কর্ত্রী , সঙ্গে বৌমা, তাছাড়া আরো দুজন, যাদের মতামত এঁরা গ্রহণ করেন । সবাই মিলে অনেকক্ষণ ধরে দেখার পর, অনেক লক্ষণ মিলিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পছন্দ করলেন চারুশীলা কে ।

তিন থেকে চার বছরের জন্য যেতে হবে চারুশীলা কে, এঁদের সাথে । বড়িআম্মা বুঝিয়ে বলেন, চারুর কাজ হল এঁদের বংশের সন্তান কে জন্ম দেওয়া । এঁদের গৃহবধুর কোন সমস্যার জন্য সন্তান জন্ম দিতে পারছেননা । চারুর কাজ হল সেই অনাগত সন্তান কে আনা ও তাকে খানিকটা বড় করে ওঁদের বংশের সন্তান কে ওঁদের দিয়ে ফেরৎ আসা ।

চারুশীলার আলাদা মহল এই পরিবারে । প্রথমদিন এই পরিবারের গৃহবধু নিজের হাতে ওকে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রস্তুত করে গেল, চারু বুঝতে পারছে বৌটির কত কষ্ট হচ্ছে নিজের স্বামীকে এভাবে ওর কাছে পাঠাতে । কিন্তু দুজনেই নিরুপায় । কিন্তু প্রথমবার যখন দেখা পেলো চারু , এই পরিবারের ছেলের , যার বংশধর কে ওকে জন্ম দিতে হবে , চারু মুগ্ধ হয়ে গেল । এমন নরম , এমন ভদ্র ও মানুষ হয় ! ! এতদিন যে পেয়েছে সে ওকে ছিঁড়ে খেয়েছে । কিন্তু ইনিতো প্রথমদিন শুধুই কথা বললেন , গল্প করলেন । এমন কেউ , যিনি চারুর জীবনের কথাও জানতে চাইলেন । মুগ্ধ হয়ে গেল চারু । ধীরে ধীরে প্রকৃতির নিয়মে শারীরিক সম্পর্কও হল । চারুর জীবনে সে এক অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা । এমনও হয় । এই শরীর কে এভাবেও ছোঁয়া যায় ।

ভালোবেসে ফেলেছে চারু । যদিও সবটাই জানা আছে, চলে যেতে হবেই, সেটাও । আর ভালবাসায় ওর কোন অধিকার নেই, তাও । তবুও মন তো মন ই । এর কয়েকদিনের মধ্যেই খবর হল চারুশীলা সন্তানসম্ভবা । উৎসব এর পরিবেশ পরিবারে । পরিবারের গৃহদেবতার পুজো অনুষ্টানের আয়োজন হয়েছে । মন্দিরের প্রধান পুরোহিত এসে পুজো করেছেন, শান্তিস্ব্স্ত্যয়ন এর আয়োজন হয়েছে । পুজোর শেষে চারুশীলা কে নিয়ে আসা হল পুজোর স্থানে, অনাগত বংশধরের মঙ্গল কামনায় শান্তির জল মাথায় দেবার জন্য । যজ্ঞের পবিত্র তাপ মাথায় বুকে ছোঁয়ার জন্য । পুজোর স্থানে এসে উপস্থিত হয়ে গৃহস্বামী কে দেখেই চারুশীলা হতবাক হয়ে যায়, এ কাকে দেখছে সামনে ! ! চকিতে মনে পড়ে যায় গত দুমাস ধরে তো ঋতুস্রাব হয়নি ওর । আর গত এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই ক্রমে তিন তিনজন পুরুষের সাথে ওর দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে। গর্ভে তবে কার সন্তান? পুরোহিতের নাকি বাবার, নাকি ছেলের ? জ্ঞান হারায় চারুশীলা। ধরাধরি করে তাকে ফিরিয়ে আনা হয় তার মহলে । গভীর রাতে নিজেরই হাতে অস্ত্র চালিয়ে জীবন দেয় চারু । পরদিন সকালে শুধুই তার প্রাণহীন দেহ পাওয়া যায়॥
(সমাপ্ত)