পিকনিকের মজা ছাপিয়ে শরৎ মেলা, মহেশ, পথের দাবী, ঢালু টেবিল, ব্যবহার করা দেওয়াল ঘড়িতেই মজে রইল শৈশব

কল্যাণ অধিকারী, হাওড়া

প্রাইভেট টিউশন থেকে স্যারেদের সঙ্গে পিকনিক। কথাশিল্পীর বাড়ি সামতাবেড় গিয়েছিল আমতার একদল ছাত্র-ছাত্রী। রূপনারায়ণের পাড় ঘেঁষা চড়ে দেরাদুন রাইস-চিকেন কষা সঙ্গে চাটনি, পাপড় আর রসগোল্লা। আয়োজন ছিল সবকিছুর। কিন্তু টালির ছাউনি মাটির দোতলা বাড়ি সঙ্গে ‘মহেশ’, ‘পথের দাবী’ সহ একাধিক গ্রন্থ, ঢালু টেবিল, ব্যবহার করা দেওয়াল ঘড়ি, হুকো কল্কের সেই গড়গড়ার নল দেখে পিকনিকের কথা ভুলেই গিয়েছিল সৌমিতা, সৈকতরা।

দেউলটি এলাকায় ৬নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে ডানদিকে মুখ ঘুরিয়ে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। পিচ ঢালা রাস্তা আর ঝুলে পড়া গাছের ডাল সরিয়ে বেশ কয়েকটা বাঁক ঘুরেফিরে পৌঁছে যাওয়া পানিত্রাস। স্নানের ঘাটের পাশে বাঁশ গাছের কঞ্চি ঠেকে যাওয়া কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতি বিজড়িত বাসভবন।দূরে রূপনারায়ণ ডাক দিলেও কুঠিতে বসে পড়েছিল ওরা। ‘বিরাজ-বৌ’, ‘পণ্ডিত-মশাই’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘মেজদিদি’, ‘দত্তা’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘অরক্ষণীয়া’, ‘নিষ্কৃতি’, ‘গৃহদাহ’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘নববিধান’ সহ চড়কায় সুতো কাটার যন্ত্র, চিকিৎসক জীবনের ব্যবহারিক হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশি। চোখের সামনে কথাশিল্পীর স্পর্শ পেয়ে নস্টালজিয়ায় শৈশব।

রসপুর গার্লস স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করা সৌমিতা ধাড়ার কথায়, শরৎকাহিনীর সঙ্গে এখনও সেইভাবে পরিচিত হয়নি। কথাশিল্পীর বিষয় জানার আগ্রহ অনেকদিন ধরে। তবে টিউশন থেকে স্যারেদের সঙ্গে এসে হাতে-কলমে কথাশিল্পীর সাহিত্য বিষয় অনেককিছু জানতে পারলাম। কথাশিল্পীর দুয়ারে বসে দাদা, দিদিদের কাছ থেকে একাধিক উপন্যাসের নাম শুনলাম। সমস্ত তথ্য মনে ও খাতায় ভরে নিয়েছি। পাশাপাশি ওঁনার ব্যবহৃত অনেককিছু দেখলাম। লেখার ঢালু টেবিল, ব্যবহার করা দেওয়াল ঘড়ি,  হুকো কল্কের সেই গড়গড়ার নল, তাঁর চিকিৎসক জীবনের ব্যবহারিক হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশি। ওখান থেকে বেরিয়ে পৌঁছে গেছি শরৎ মেলায়। মেলায় কথাশিল্পীকে নিয়ে বানানো একাধিক প্রদর্শনী। দিনটা কত দ্রুত ও আকুলতায় শেষ হয়ে গেল। স্কুলের ম্যামদের কাহিনী লিখে দেখাব।

বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসেছিলেন শরৎচন্দ্রের বাড়ি সংলগ্ন রূপনারায়ণের পাড়ে। পিকনিকের মেজাজে কেটেছে দিনটা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে শরৎ মেলায় প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ দেখে। ইংরাজির শিক্ষক ক্রান্তি বরণ সাউ জানান, ‘কথাশিল্পী আমাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গে রয়েছেন। বছরের দু-তিনবার আসা হয়। এ বছরও অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহু বছর পুরনো শরৎ মেলা। কিন্তু মেলার সময় যতবার আসি নতুনত্বর ছোঁয়া পাই। মেলা কর্তৃপক্ষ এ বছর প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে পরিবেশ রক্ষার পাঠ দিয়েছে। কিন্তু রূপনারায়ণ জমির মাটি ধসিয়ে বয়ে চলেছে। সরকারের লক্ষ্য দেওয়া প্রয়োজন। ইতিহাসের শিক্ষক অনুপম দাস জানান, কথাশিল্পীর প্রতি যেভাবে মানুষের উন্মাদনা বাড়ছে যদি কম খরচে হোম স্টে চালু করা হয় তাহলে বেশি সময় কাটিয়ে ফেরা যাবে।