মাহাত্ম্য’র খোঁজে একদিনের তীর্থ গঙ্গাসাগর

কল্যাণ অধিকারী

লট-৮ জুড়ে বোঁচকা বুঁচকি মাথায় নিয়ে তীর্থযাত্রীদের লম্বা লাইন নেই। কাদা মাড়িয়ে টাকা চাইছে না ছেলে-পুলের দল। কিন্তু! দূরে চেনা নদীটাকে দেখেই চিনে ফেললাম নিজেকে। ওই তো মুড়িগঙ্গা। বুক উঁচু করে শত সহস্রাব্দের পৌরাণিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

ফি বছর গঙ্গাসাগর মেলার খবর করতে এসে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। অজস্র অভিযোগের যন্ত্রণা মাথা পেতে নিয়েছে মুড়িগঙ্গা। চোখের সামনে দগদগে শরীর বিছিয়ে। ক্ষত-বিক্ষত করে চলছে ড্রেজিং। যেন বলতে চাইছে, হে মনুষ্য জাতি নাও শরীর থেকে মাংসের তাল ছিড়েখুঁড়ে নাও।

আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে লঞ্চ। ভেসে বেড়াচ্ছে পরিযায়ী পাখির দল। লঞ্চের ডেকে বসে তাকিয়ে আছি ওই সমুখ পানে। মাঝেমধ্যে ক্যামেরার শাটার পড়ছে। অ্যাপারচার, আইএসও ঠিক করে নিয়ে আবার ক্যামেরার শাটারের আওয়াজ। ওপারে পৌঁছেও মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখছি মুড়িগঙ্গার পানে। বৃষ্টি ভেজা মুড়িগঙ্গা আজ বড্ড মোহময়ী। আগের মতো জল বইতে না পারলেও হৃদয় কিন্তু সহজ সরল ও তুলতুলে।

প্রেস স্টিকার লাগানো বাস ৩৪ কিমি পথ টেনে নিয়ে পৌঁছে দিল গঙ্গাসাগর। একদিনের বৃষ্টিতে প্যাচপ্যাচানি সাগর তট। তীর্থযাত্রীদের ঠাসা ভিড় নেই। ন্যাংটা সাধু-সন্তরাও এসে পৌঁছায়নি। যে সকল তীর্থযাত্রী এসেছেন সাগরে ডুবকি দিয়ে ছাউনির দোকান থেকে নকুল দানা সঙ্গে কুড়ি টাকা দরের নারকেল ও একছড়া কলা নিয়ে কপিলমুনি মন্দিরে পুজো দিচ্ছেন।

ডিএম, এসপি সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ। নিউজের কপি পাঠিয়ে ফিরে আসবার গাড়ি আমাদের নিয়ে রওনা দিল। একটা মস্ত দিনের শেষ প্রান্তে ফিরলাম মুড়িগঙ্গার পাড়ে। একদম অচেনা লাগছে। ঝাপসা কাগজে জল রঙ দিয়ে কেউ যেন তুলি টেনেছে। মুড়িগঙ্গা জুড়ে ইলিশ গুঁড়ো বৃষ্টি সঙ্গে কুয়াশা মাখা। স্নিগ্ধ রূপে অসাধারণ লাগছে। কবিবর থাকলে আজ হয়তো লিখে ফেলতেন একাধিক কবিতা।

ভেসে চলা লঞ্চ যখন মাঝ নদীতে দুপাড়ের সীমানাজুড়ে দৃশ্য মান্যতা কমে এসেছে। দূরে দপদপ করছে মন্দায় জর্জরিত হলদিয়া বন্দরের আলো। ডেকে দাঁড়িয়ে সমস্তটা দেখছি। মনে আসছে কতো ইচ্ছে ও আশা। কতটা মাহাত্ম্য নিয়ে ফিরলাম জানিনা। আক্ষেপ একটাই খুঁজে পেলাম না দেহাতি মানুষদের পা ফেলা ধুলোর আস্তরণ। একটু মাথায় বুলিয়ে চিৎকার করে বলতে গঙ্গা মাইয়া কি জয়!