বসন্তের আনন্দে শান্তিনিকেতন

আয়ুষ রায়, কলকাতা:

বসন্ত এসে গেছে, আগামী দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে শান্তিনিকেতন সেজে উঠছে । প্রতিবারের মতোই উৎসাহের ভিড় জমবে বলে জানা যাচ্ছে। যারা গাড়ি নিয়ে যাবেন তারা মনে রাখবেন গাড়ি কিন্তু অনেকটা দূরে রাখতে হবে। খুব ভোরে না পৌঁছাতে পারলে অনুষ্ঠান দেখা যাবে না। শান্তিনিকেতনে জানুয়ারি মাস থেকেই হোটেল বুকিং করা শুরু হয়ে গেছে। রাজ্য, দেশ ও বিদেশের নানা স্থান থেকে অনেক মানুষ অংশগ্রহণ করেন এই দোল উৎসবে। এখন রুম পাওয়া মুশকিল, আগের থেকেই সব বুকিং করা আছে, যদিওবা পাওয়া যায় বোলপুর থেকে কিছুটা দূরে।

images (2)

পলাশ-শিমুল আর আবিরের রঙে রাঙিয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার বোলপুরে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনে রঙিন আবিরে আবিরে আর ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল’ গানের সুরে সুরে শুরু হতে চলেছে বসন্ত উৎসব।

images

শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবের এই দোলের দিন এক অন্য রূপ ফুটে ওঠে। এই দিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় আবির নিয়ে খেলা। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের আগেরদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠান হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া নামে পরিচিত।

images (5)

উল্লেখ্য, ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেন ‘ঋতুরঙ্গ’ উৎসবের। শান্তিনিকেতনের ‘প্রাককুঠির’-এর সামনে শুরু হয় এই উৎসবের। এখন অবশ্য প্রাককুঠির শমীন্দ্র পাঠাগার বলেই পরিচিত। ১৯২৫ সাল নাগাদ সেই ‘ঋতুরঙ্গ’ উৎসব পরিণত হয় বসন্ত উৎসবে। তখন থেকেই শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবে দেশ-বিদেশের নানা অতিথিদের পাশাপাশি শামিল করা হতো আদিবাসীদেরও। সে প্রথা আজও চলছে।

images (6)

দোলযাত্রা উৎসব শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। অতীতে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে বসন্তের আগমন উপলক্ষে একটি ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচগান, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয় করা হত। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠানটি পরিব্যপ্ত হয়ে শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব বসন্তোৎসবের আকার নেয়। ফাল্গুনী পূর্ণিমা অর্থাৎ দোলপূর্ণিমার দিনই শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবের আয়োজন করা হয়। দোলের দিন সকালে ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ গানটির মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সন্ধ্যায় গৌরপ্রাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক অভিনীত হয়।

images (4)

বিভিন্ন ভবন থেকে ছাত্রছাত্রীরা শোভাযাত্রা বের করে আশ্রমমঠ পর্যন্ত যায়। এরপর বিশ্বভারতী চত্বরে হয় মূল অনুষ্ঠান। সেখানে নৃত্যনাট্যের পাশাপাশি চলে নানা অনুষ্ঠান। সকাল থেকে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত নানা অনুষ্ঠানে আশ্রমের ছাত্রছাত্রীরা থেকে ভিনদেশি ছাত্রছাত্রীরাও অংশ নেন। এ ছাড়া সন্ধ্যায় বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য পরিবেশন করবেন।

images (8)

শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব নিয়ে শুধু দেশ নয়, বিদেশের মানুষেরও উৎসাহের শেষ নেই। বসন্ত উৎসবে যোগ দেওয়া আর দোলে তীর্থ করা বাঙালির কাছে সমার্থক হয়ে উঠেছে। সন্ধের পর বোলপুরে মাথা গোঁজার জায়গা মেলাই ভার হয়ে ওঠে। বছর বদলায় কিন্তু মানুষের বসন্ত উৎসবে যোগ দেওয়ার উৎসাহ বদলায় না, বদলায় না বোলপুরে জনসমুদ্রের চেহারা।

images (1)

দোলের দিন সকালে প্রথা মেনেই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বসন্তের গানের সঙ্গে নৃত্যানুষ্ঠানে বদলে যায় দোলের সকাল। সব শেষে হয় সেই গান, রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও, যাও গো এবার যাওয়ার আগে….. । নাচের তালে তালে আকাশে ওঠে ফাগুয়ার রং। নানা রঙের আবীরে দোল খেলায় মেতে ওঠেন শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক।

images (9)

দর্শকরাও নিজেদের মধ্যে আবীরের রঙে শুরু করেন দোল খেলা। বদলে যায় সেখানকার পরিবেশ, বদলায় রং। রঙিন মনে তখন শুধুই খুশির ফোয়ারা। প্রসঙ্গত সকালের অনুষ্ঠানের পর দিনভর রঙ খেলা। তারপর সন্ধেয় পরিবেশিত হয় সংগীত ভবনের ছাত্রছাত্রীদের নৃত্যনাট্য। সবমিলিয়ে শান্তিনিকেতনের দোল দেখার জন্য বাঙালি আজও ছুটে আসেন বোলপুরে।