‘জীবন বড় কঠিন’ ফুটপাথ-স্টেশনে ক্যানভাস বানিয়ে স্বপ্ন দেখানো ভবঘুরের লেখাও মুছে দিল ওঁরা!


 
কল্যাণ অধিকারী, হাওড়া

ফুটপাথ, প্ল্যাটফর্ম ওঁর কাছে ক্যানভাস। রঙ তুলির বদলে পোড়া কয়লা, চক এবং সবুজ লতা পাতা। ওই দিয়েই অভিনব ছবি সৃষ্টি করে তোলেন। টানা এক-দুই ঘণ্টা বসে জীবনের বেশকিছু কথা তুলে ধরেন ক্যানভাসে। পথচলতি মানুষ ওঁর লেখা কথাগুলো নিজেদের জীবনের ভেবে নেয়। তুলে নেয় মোবাইলের ক্যামেরায়। কিন্তু ভবঘুরের চিত্র ও লেখাগুলো কে বা কাদের চোখে লেগেছে। আঁকা চিত্র মুছে দিয়ে ঢেলে দেওয়া হয়েছে জল। এমন ঘটনায় হতবাক সুশীল সমাজ।

অনিল অধিকারী, বাড়ি দঃ২৪ পরগণা জেলার বজ বজ এলাকায়। সপ্তাহের প্রথমদিন ট্রেনে চেপে পৌঁছে গিয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব রেলের হাওড়া-আমতা শাখায় আমতা স্টেশনে। তারপর শুরু দক্ষ হাতে প্লাটফর্মের দৈর্ঘ্য চক দিয়ে বর্ডার টেনে ছবি ও জীবনের কথা লেখা। ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরিলেও হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন’। আবার কোথাও ‘শত ব্যথার মাঝে ও যে হাসে, সে হাসি অনেক দামী’। আরও এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘কথা বলার মত মন, মানসিকতা সময় থাকেনা। পথ চলতে খাবার দাবার সমস্যা, যদিও কারও মন চায় কিছু। দুর্দিনের প্রবাসে আমি বৃথাই, প্রবাসে সাথী যারা তারা সকলি স্বার্থপর’। শিশুসাহিত্য প্রীয় অনিল ভবঘুরে জীবনে বহু স্থানে অনেক কিছু এঁকেছেন। বিশেষ করে লতা পাতার মাঝে পাখির ছবি, দেবতার ছবি এঁকে নিজের জন্য সাহায্য চেয়ে বেড়ায়। এমন চিত্রকেও কিছু দুষ্টু মানুষ অন্ধকার নামতেই মুছে দিয়েছে।

জীববিদ্যার ছাত্র শুভম নন্দী জানান, “বছর চল্লিশের যুবকটি আমতা প্ল্যাটফর্মে চিত্র আঁকছিলেন। ওঁর লেখাগুলো বড্ড আন্তরিক লাগছিল। ছবির সঙ্গে কথাগুলো সাজানোর সময় ওঁর পাশে বসে ছবি আঁকার হাত দেখেছি। কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও খুব বেশি কথা বলেনি। এটুকু বুঝেছি মানুষটার মধ্যে সত্য কথা লেখার সাহসটুকু রয়েছে। প্রত্যক্ষ প্রেরণাদাতা হয়তো এনারাই।” শিক্ষক অভিনন্দন গুছাইত জানান, “বিকালের ট্রেনে বাড়ি যাবার সময় দেখেছি আঁকছিলেন। কিন্তু আজ সকালে ফিরবার সময় দেখলাম অত সুন্দর মেসেজ গুলো মুছে দিয়েছে কে বা কারা। হয়তো আঁতে লেগেছে তাঁদের। শিল্পীর স্বত্বা যদি আটকে দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে যেটা হওয়ার থাকে ওটাই হচ্ছে।

মাথায় ঝাঁকা দেওয়া চুল। পরনে কালো গেঞ্জির উপর খদ্দরের চাদর। সবুজ পাতা ঘষে পাখির গায়ের রঙ এঁকেছে। পাশের ব্যাগে থাকা কাঠ কয়লা ঘষে ফুল ফুটিয়েছে। চারিপাশে টেনে দিয়েছে বিত্ত। তারপরও কেউ মুছে দিয়েছে ওঁর ক্যানভাস। রং-তুলি হাতে না পেলেও। শুধু পেয়েছিলেন জীবনের স্বত্বা। ভবঘুরে জীবনে ওটাকেই আঁকড়ে ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে জীবন। এমনটাই মত সুশীল সমাজের।