দুই বাংলার হৃদয়ে ভাষা সৈনিকের রক্তে রাঙানো একুশে

কল্যাণ অধিকারী, হাওড়া , ২১ ফেব্রুয়ারী ঃ  হাতে গোলাপের তোড়া, গায়ে জড়ানো পাঞ্জাবি। কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতন ব্যাগ। ওপারে পূর্ব বাংলা থেকে আগত একুশের আহ্বায়ক। ধ্বনিত হচ্ছে কন্ঠে “আমার ভাইয়ের রক্ত হবে নাকো ব্যর্থ।” ভিজিয়ে দিচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। আপাদমস্তক প্রতিটা শিরা-উপশিরা দিয়ে বইতে থাকা রক্তকণিকায় ছিটিয়ে দিচ্ছে ভাইয়ের সেদিনের রক্ত। গলার স্বর ধরে আসছে। চিবুক টানটান হয়ে পড়ছে। চোখের সামনে ইতিহাসের পাতা একটার পর একটা উল্টে চলেছে। এ পারকেও রাঙিয়ে দিচ্ছে পড়শি দেশের ভাইয়ের ভাষার বিপ্লব।

১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এতদিনে পদ্মা দিয়ে বয়েছে লক্ষ-কোটি কিউসেক জল। স্মৃতিপট বেয়ে স্মরণে বরণে আজও আলোকিত একুশে। নিজ ভাষা প্রতিষ্ঠা করতে শহীদের রক্তকরবী টাটকা। এখনও চুইয়ে পড়ছে হৃদয় বিদারিত আবেগের অশ্রুকণা। পূর্ব হোক বা পশ্চিম, দু’ই বাংলাকে একুশের সেই অমর বলিদান আজও কাঁদিয়ে বেড়ায়। সভ্যতার বিবর্তনের পরেও স্মার্ট হতে থাকা সমাজের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে একুশের শহীদদের রক্তের বরণডালা।

শিলিগুড়ি থেকে কাকদ্বীপ, নদীয়া থেকে হাজারদুয়ারি একুশে মানেই তো ভাষার ফলকে গোলাপের তোড়া দেওয়া। মুষ্টিবদ্ধ হাতে নতুন করে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। আবেগ দিয়ে মাতৃভাষাকে আষ্টেপৃষ্ঠে হৃদয়ে গাঁথা। ছোটদের প্রতি ভাষার ব্যবহার পোক্ত করবার শপথ গ্রহণ হয়েছে এ দিন। ফলকে লেখা রফিক উদ্দীন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার সহ প্রত্যেকের নামে ধ্বনিত হচ্ছে ‘জয় শহীদের জয়’। এ দিন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার সার্থকতা আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও শিবিরে। নবীন-প্রবীণ মেলবন্ধনে স্মারক হয়ে উঠেছে ‘ভাষা’।

এপার বাংলার অ-আ, ওপার বাংলার অ-আ একত্রে নিমজ্জিত হয়ে যায় এই দিনটায়। শ’য়ে শ’য়ে ভাষাপ্রেমীর হাত আজ মুষ্টিবদ্ধ। গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রয়েছে ফলকের চারিধার। শরীরের রক্ত টগবগ করছে। তবুও উত্তেজনা প্রশমন করে আগত ভাইদের গলায় মিলিত সুর “আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন-এই বাংলায় খুঁজে পাই।” সকালে ঘুম ছেড়ে ওঠা থেকে রাতে বিছানায় ক্লান্তিকর শরীর এলিয়ে দেওয়ার মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত নিজনিজ ভাষাকে ব্যবহার করা। স্মার্ট ফোনে বাংলা সফটওয়্যার। ধীরে হলেও নিজস্ব ভাষার প্রতি উপলব্ধি হচ্ছে। মসৃণ হচ্ছে ক্রমশ ভাষার ব্যবহার।

ভেজাল সবজি দূরে সরিয়ে ভেষজ তে মন দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিদেশী পণ্য, বিদেশী ভাষা ধীরে ধীরে নিজ ভাষাকে গৃহবন্দি করতে চেষ্টা করছে। শরীরের প্রতিটা রক্তবিন্দু যতটা সময় সচল থাকবে বুক চিতিয়ে বলে যাবে আমার ভাষা মুক্ত ভাষা। আমার মাতৃভাষা বাংলা ভাষা। আমি এই ভাষাতে মা’কে ডাকি। এই ভাষা রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর মহাশয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলামের লেখনীতে আজও উজ্জ্বল। মাঝিদের ভাটিয়ালির সুরে পাওয়া যায় বাংলা ভাষার রস। লাল মাটির দেশে মেলে বাংলা ভাষার অলঙ্করণ।

রাজ্যের প্রতিটা প্রান্তে স্কুলে ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা বলে ওঠে অ-এ অজগর, আ-এ আম। একুশের মঞ্চ হোক বা কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস সর্বদা বাংলা ভাষা নিয়ে আলোচনা। উচ্চারিত হচ্ছে বাংলা ভাষায় জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা। মাতামাতি নাই বা হল। মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা, সৃজনশীলতা কুণ্ঠিত না হয়ে এগিয়ে চলেছে।

কতটা জাদু আছে বাংলা ভাষায় তা বোধগম্য হয় বাঙালিয়ানায়। সে হোক অমর একুশে বা রবিঠাকুরের পঁচিশে বৈশাখ। বাংলা ভাষা একসূত্রে আবদ্ধ করে নেয়। অর্থাৎ বাঙালির রন্ধে রন্ধে বাংলা ভাষার সুর। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় গেয়ে ওঠে রবীন্দ্র-নজরুল। ফাগুনের হাওয়ায় মাতোয়ারা রাজ্য ও দেশ। বাংলা ভাষায় মিলনের সুর। লালনের বোল। ভাটিয়ালির সুর। আবার পড়শি দেশের ভাইদের রক্তে রাঙা আন্দোলন। মিলনের মাঝে রক্তের ছিটে যেমন রয়েছে। রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। তবুও এই একটা দিন বাংলা ভাষা মিলন মহান। বিদেশী হাজারও ভাষার মাঝে আমরি বাংলা ভাষার আশা ভরসার দোলা।

হৃদয়ে শ্বাস যতক্ষণ থাকবে, প্রশ্বাস যতক্ষণ পড়বে মুখ থেকে বেড়িয়ে আসবে বাংলা ভাষা। অ থেকে চন্দ্রবিন্দু, রবীন্দ্রনাথ থেকে বিদ্যাসাগর, নজরুল, রামমোহন সর্বদা বাংলা ভাষার মেলবন্ধন। এ ভাষায় রয়েছে মানসিক বল ও শারীরিক চেতনার প্রকাশ।