করোনা পরিস্থিতির জের, বন্ধ হয়ে গেল ঝিকিরা ও আমতার প্রাচীন দুই রথযাত্রা

কল্যাণ অধিকারী, হাওড়া :

সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতির জের, এবার বন্ধ থাকবে ১২৫ বছরে পদার্পণ লরা প্রাচীন ঝিকিরা গ্রামের মল্লিক বাড়ির রথযাত্রা। রথ টানা বন্ধের পাশাপাশি এ বছর বসবে না রথের মেলাও। তবে গৃহদেবতা দামোদর মন্দিরে থাকবেন। ভক্তরা রথের দিন প্রভুকে দর্শন করতে পারবেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘ ১২৪ বছরের ইতিহাস। পরতে-পরতে রয়েছে ইতিহাসের ছোঁয়া। পুতুল নাচের ইতিকথা থেকে কৃষ্ণ নগরের মাটির পুতুল ছোঁয়া এ সবকিছুই রথযাত্রার বৈশিষ্ট্য। ১২৪ বছরের রথযাত্রার ইতিহাস সম্পর্কে পরিচালন কমিটির সেক্রেটারি হরিপদ রায় জানান, এবছর ১২৫ তম বর্ষে পদার্পণ করল এই মল্লিক বাড়ির রথযাত্রা। ১৮৯৬ খ্রীষ্টাব্দে রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন মল্লিক বাড়ির প্রাণপুরুষ হরিনারায়ন মল্লিক মহাশয়। পরবর্তী সময়ে রাধাগোবিন্দ মল্লিক, ভাগ্যধর মল্লিক, ভূদেব চন্দ্র মল্লিক, ভারতী মল্লিকের হাত দিয়ে রশি টেনে মল্লিক বাড়ির রথযাত্রা’র সূচনা হয়েছে। এখন মল্লিক বাড়ির রথযাত্রা সম্পাদনা করেছেন পরিবারের সদস্য অতনু মল্লিক। দীর্ঘ রথযাত্রায় কোনও বছর বন্ধ থাকেনি। প্রথম বছর বন্ধ থাকবে রথযাত্রা।

হাওড়া-হুগলি জেলার সীমানা ঘেরা ঝিকিরা গ্রাম। গ্রামের নামকরণ ও ঐতিহ্যের মধ্যেও রয়ে গেছে মল্লিক বাড়ির নাম। ঘেঁষাঘেঁষি হাওড়া ও হুগলি জেলার মাঝে মল্লিক বাড়ি একসময় ছোটখাটো জমিদারী বংশ হিসাবে পরিচিত ছিল। জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে দামোদর মন্দিরে পূজো উপলক্ষে পূর্বপুরুষ আমলেই রথ তৈরি করা হয়। প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার কাঠের তৈরি রথ। রথের প্রধান বৈশিষ্ট্য জগন্নাথ বলরাম শুভদ্রাকে বসানো হয় না, এখানে তিথি অনুযায়ী পূর্বেকার জমিদার বাড়ির ইষ্ট দেবতা দামোদরকে বসিয়ে রশি টেনে রথের চাকায় টান দেওয়া হয়। তবে এখন ইলেকট্রিকের লাইন রাস্তাজুড়ে থাকায় খুব বেশি দূর রথ টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবুও কয়েকশো মিটার পথ অতিক্রম করে মাসির বাড়িতে যায় মল্লিক বাড়ির রথ। 

হরিপদ বাবু আরও জানান, রথযাত্রা উপলক্ষে মল্লিক বাড়ির হরিবাসরে দিন-রাত্রি হরিনাম সংকীর্তনের আসর বসতো। কীর্তনের রসস্বাদন করত আশপাশের গ্রামের শ’য়ে শ’য়ে গ্রামবাসী। এখন হরিনাম সংকীর্তন আর হয় না তবে রীতি মেনে নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় পাঁচ-ছ’শো মানুষ রশি টেনে রথের চালনা ও পুজা সম্পূর্ণ করেন। দশদিন ধরে হাজার হাজার মানুষ মেলার আনন্দ গ্রহণ করে। মেলাতেও রয়েছে বৈশিষ্ট্যর ছোঁয়া। মেলার মূল আকর্ষণ বিলুপ্ত হতে চলা কাঠের পুতুল নাচ। একসময় এই পুতুল নাচ রাজ্যের প্রধান বিনোদন ছিল, এখন সেই বিনোদন ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। তবুও ফি-বছর এই পুতুল নাচ দেখতে হাজির হয় বিভিন্ন এলাকার মানুষ। জেলা পরিষদ থেকে পারমিশন নিয়ে দশদিনের রথযাত্রা মেলা অনুষ্ঠিত হয়। 

রথ টানা বন্ধের পাশাপাশি এ বছর বসবে না রথের মেলাও। তবে গৃহদেবতা দামোদর মন্দিরে থাকবেন। ভক্তরা রথের দিন প্রভুকে দর্শন করতে পারবেন। এদিন দেখা গেল রথের সামনে ত্রিপল দিয়ে ঘেরা। রং চড়ানো হয় নি। অন্যদিকে আমতার সাহা বড়ির প্রাচীন রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে না। পরিচালন কমিটির সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে এ বছর করোনা পরিস্থিতির জের বন্ধ থাকবে রথযাত্রা। আমতা রথযাত্রা শুরু হয় ১৮৫৮ খ্রীস্টাব্দে নটবর সাহার হাত ধরে।