বর্তমান সময় মেগা – সিরিয়ালের সফলতম পরিচালক আকাশ সেন।

      ছোটবেলায় নাচ গান শেখা। তারপর ছোট ছোট অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা। পরবর্তী সময়ে পাড়ার একজন দিদির সহযোগিতায় খোঁজ খবর নিয়ে ভর্তি হওয়া । তখন থেকেই এই প্রফেসনে আসা হয়। আর একটা কথা, বাবা মায়ের সম্পূর্ণ সহযোগিতা ছিল বলে আজ আমি এখানে আসতে পেরেছি। তারপর মেগাসিরিয়াল পরিচালনা করে একটার পর একটা সিরিয়াল দর্শকদের উপহার দেওয়া। এই সব কিছুর উত্তর খুঁজতে অশোক কানন স্টুডিও থেকে সংবাদ টুডের প্রতিনিধি আয়ুষ রায় এবং উজ্জ্বল সরকার

5fbe8e45-19da-46f7-a551-c866d49a0e95

১ . আপনার জার্নি কিভাবে শুরু ?

উ: ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে “খুঁজে বেড়ায় কাছের মানুষ” সিরিয়ালে অ্যাসিস্ট করতে আসি। এটা দিয়ে আমার জার্নি শুরু। তারপর আজ পর্যন্ত টিভিতে চলছে আমার প্রথম কাজ “খুঁজে বেড়ায় কাছের মানুষ” মনীষ ঘোষের ডিরেকশনে আমি অ্যাসিস্ট করি।

২ . আপনি জীবনে কখন ভাবলেন এই প্রফেশনে আসবেন?

উ: অ্যাকচুয়ালি আমি ছোটবেলা থেকেই , এমনকি আমার বাড়ির লোকজনও এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সেদিন থেকে বংশ পরম্পরায় যেটা হয় আর কি, নিজেদের মধ্যে একটা ব্যাপার থাকে। আমি ছোটবেলা থেকে ডান্স করতাম, নাটক করতাম, থিয়েটার করতাম। আমার একজন স্যার ছিলেন, পাড়ায় কোন অনুষ্ঠান হলে তিনি আমায় ডাকতেন সেখানে অংশগ্রহণ করার জন্য ।

৩ . ‘গোয়েন্দা গিন্নি’ ছাড়া আগে আর কোন এই ধরণের ডিটেকটিভ মেটার নিয়ে কাজ করেছেন ?

উ: ডিটেকটিভ স্টোরি নিয়ে কাজ করা আমার গোয়েন্দা গিন্নিতেই প্রথম এবং আমার খুব ভালো অভিজ্ঞতা। কারণ লেখিকা শাহনা দি, উনি দুর্দান্ত দুর্দান্ত গল্প লিখতেন। আর দ্বিতীয় আছেন মামনি দি অর্থাৎ ইন্দ্রানী হালদার। তার অনবদ্য অভিনয় এবং উনি প্রত্যেকটা মানুষের সাথে এতটাই মিশে যেতেন যে আমরা ওরকম একটা মানুষের সাথে কাজ করে আনন্দ পেয়েছি। আমি উনাকে দিদি বলি উনার সাথে আমার দিদির সম্পর্ক  । ভারত লক্ষ্মী স্টুডিওতে শুটিং হত ।খুব বেশি না হলে স্টোরি শুরু এবং শেষ করতাম । তারপর আবার অন্য লোকেশন গিয়ে কাজ করতাম। প্রয়োজনে সম্পূর্ণ একটা নতুন বাড়িতে গিয়ে লোকেশন খুঁজে নিতাম। গল্প অনুযায়ী লোকেশনটা অনেক সময় পাওয়া সম্ভব হত না। আমরা সেই লোকেশনটাকে সাজিয়ে নিতাম। যেখানে একটা পুকুর আছে, সেইরকম একটা পুকুরওয়ালা জমিদার বাড়ি কোথায় আছে এবং তার সঙ্গে একটা মন্দির হতে হবে। যেখানে জমিদার বাড়ি থাকবে , তার কাছাকাছি একটা পুকুর থাকবে একদম রিয়েল স্পটে গিয়ে শুট হত। প্রত্যেকে আলাদা ছিল শুধু মামনি দি কমন ছিলেন আর ইন্দ্র বলে একজন অভিনেতা ছিল, এই দুইজনকে নিয়ে আমরা রেগুলার নানান জায়গায় ঘুরতাম। প্রত্যক সপ্তাহ বা পনেরো দিন অন্তর যে স্টোরি চেঞ্জ হত, সব স্টোরি শাহানা দি লিখতেন, শর্বরী দি স্ক্রিপ্ট করতেন।

৪ . ডিটেকটিভের আর কিছু কাজ করেছেন?

উ: ডিটেকটিভের কাজ বলতে “জয় কালী কলকাতাওয়ালী ” এখন যেটা চলছে, সেটাতে আমি কিছুদিন কাজ করেছিলাম। তারপর ওখান থেকে আমি বেরিয়ে আসি অন্য সিরিয়ালে চলে যাই। একটা অফার পাই আর কি, জয় কালীর হিস্টরি চেঞ্জ হয়।

৫ . দিনের শুটিং কি সেইদিনই দেখানো হয়?

উ: এটা ডিপেন্ড করে কতটা ব্যাংকিং আছে। এখন যেহেতু সপ্তাহে সাত দিন টেলিকাস্ট হয় ওই জন্য ব্যাংকিং খুব শোচনীয় অবস্থা। যার জন্য গ্রাফিক্স সিরিয়াল মানে আমাদের সিরিয়াল যেমন প্লাস টু রাখতেই হবে, মানে আমার শুট করে দেওয়ার পর পুনরায় আবার গ্রাফিক্সে এডিট হবে তারপরে এপিসোড চালানো হবে এবং সেইজন্য প্লাস – টু রাখতে হয়। এমন সিরিয়াল আছে যেখানে হয়তো আজকে শুট হয় কালকে দেখানো হয় ।

৬ . ‛মা’ সিরিয়াল নিয়ে যদি কিছু বলেন …।

উ: ” মা ” সিরিয়ালে আমি কাজ করেছি অনেকটা শেষের দিকে, মানে শেষের প্রায় ছয় মাসের মতন কাজ করেছি। যখন বড় পড়ির বেনারসের সিনটা দেখানো হচ্ছিল। তখন বেনারস থেকে ফিরে আসার পরে আমি “ মা ” সিরিয়ালে যুক্ত হয়েছি। দর্শকদের কাছে প্রচুর জনপ্রিয় ছিল ‛জননী ‘ এবং ‘ জন্মভূমি’। তারপর যদি উদাহরণ দেওয়া যায় তাহলে সেটা, ‛মা’ ছাড়া আর কিছুই না এবং খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনুমতি নিয়ে হিন্দিতে রিমেক করা হয়েছে এবং মালয়ালামেও হয়েছে এটা।

৭ . সিরিয়ালের স্ক্রিপ্ট আর সিনেমার স্ক্রিপ্টের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?

উ: সিরিয়াল একটা অন্য ফরমেট অনুযায়ী হয়। ফাস্ট আমি একটা ছয় মাসের গল্প লিখি, গল্পটা নিয়ে যখন এগোলাম তখন ছয় মাসের কতটা সেটা নিয়ে আমি ভেবে নিলাম। ভেবে নেওয়ার পর আমার যখন ছয় মাসটা কভার হয়ে আসছে, তখন পরবর্তী ঘটনা লেখা হয়। তার কারণ হচ্ছে আমাদের টিআরপি তো আছে, টিআরপি দেখে মানুষ কোন দুটোতে বেশি মনোযোগী হচ্ছে, সেই অনুযায়ী সেই ট্র্যাক গুলোকে চেঞ্জ করা হয়। যার জন্য দুই সপ্তাহে একটা স্টোরি মিটিং করা হয়। ওই মিটিংয়ে আগামী দুই সপ্তাহের গল্পটি হয়। 

৮. ভবিষ্যতে আর কোন অভিনেতার সাথে কাজ করার ইচ্ছা আছে ?

উ: ভবিষ্যতে ইচ্ছে বলতে গেলে সৌমিত্র জ্যেঠুর সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে। দেখুন আমি সাবিত্রী দি এবং হারাধন জেঠুর সাথে কাজ করে ফেলেছি অলরেডি। ‘ভাষা’ সিরিয়ালে আমি যে ফার্স্ট শর্ট নিয়ে এসেছি সেটি হল হারাধন জেঠু এবং সাবিত্রী চ্যাটার্জি। সেটা আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। তারপর অপর্ণা সেনের সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে। একজনের সাথে কাজ করার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সেটি আর হল না, ঋতুদার সাথে। “বোঝেনা সে বোঝেনা” সিরিয়ালের একটা ছোট অংশে কাজ করেছি। 

৯. ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর অথবা রিসার্চ মূলক কাজ করতে কি ভালো লাগে?

উ: ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর রিসার্চ মূলক কাজ নিশ্চয়ই করবো। কিছু কাজ, যেমন গ্রাফিক্সটা আমার কাছে ভালো লাগতো না। কারণটা হচ্ছে আমি বিষয়টা অত ভালো করে জানতাম না, কিন্তু পরে আমি মজা পেয়েছি। আমি যখন সিরিয়াল শুরু করি সাধারনত ঘর – সংসারের যে সিরিয়াল গুলো হয়, সেই সিরিয়াল গুলো দিয়েই। সেখান থেকে একটা আলাদা স্বাদ পেয়েছিলাম। ‘গোয়েন্দা গিন্নি’ করতে এসে লাভ স্টোরি থেকে ডিটেকটিভ স্টোরি। সেটাতে একটা আলাদা স্বাদ পেয়েছি। যেখানে আমার ডিটেকটিভ স্টোরি করতে ভালো লেগেছে, তারপর ওখান থেকে আমি গিয়েছি ” অগ্নিজল “, সেখানে রাজ রাজাদের নিয়ে সিরিয়াল করতে খারাপ লাগেনি, বরং ভালো লেগেছে। যেগুলো আমাদের রিয়েল লাইফে হয় না, শুধুই কাল্পনিক, সেই গুলো করতে মজা লেগেছে। প্রত্যেকটা কাজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে নিতে হয়। সবচেয়ে বেশি মজা লেগেছে, যখন “আদরিনী” করি। দুটো ছাগল, একটা মেকাউ পাখি একটা গাধা এবং একটা গরু এই নিয়েও কাজ করেছি দিনের পর দিন।

১০. পরিচালক হিসেবে আপনার প্রিয় পরিচালক কে ?

উ: আমার গুরু হচ্ছেন অভিজিৎ দাশগুপ্ত এবং আমার আজ যা শেখা তার সবকিছু ওনার থেকে। ওই সিরিজের অভিজিৎ দাশগুপ্ত , অনিন্দ্য দা এরা আমার কাছে গুরু। 

১১ . অভিনেতা হিসেবে আপনার কাকে পছন্দ ?

উ: একটা কথা বলতে আমি যাদের সাথে কাজ করেছি। ইন্দ্রানী হালদার , অপরাজিতা আঢ্য , সাহেব চ্যাটার্জী এরা আমার খুব কাছের এবং ভালো লাগার মানুষ, অনন্যা দিও তাই।

১২. কোন ধরনের ফিল্মের প্রতি আপনার বেশি আকর্ষণ?

উ: আমার আর্ট ফিল্মের প্রতি ঝোঁক বেশি। আমি একচুয়ালি খুব ন্যাচারাল জিনিস পছন্দ করি। যেমন অনেক সময় দেখা যাচ্ছে সাজগোজ করে, জুতো পড়ে খাটে ঘুমোতে যাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠলে চুলগুলো টিপ টপ থাকছে। এগুলো স্বাভাবিক দেখায় না। 

১৩. অভিনেতা হিসেবে চন্দন সেন কে আপনার কেমন লাগে?

উ: চন্দন দা খুবই ভালো অভিনেতা। যদিও ওনার সাথে আমার কাজ করার সুযোগ হয়নি। ওনার কাজ তো অনেক দেখেছি। 

১৪. প্রদীপ খাঁড়াকে কেমন লাগে অভিনেতা হিসেবে ?

উ: প্রদীপ দার সাথে প্রচুর কাজ করেছি। প্রদীপ দা আমার অনেক সিনিয়ার। “বোঝেনা সে বোঝেনা ” থেকে শুরু করে অনেক জায়গাতে কাজ করেছি ওনার সাথে। ইয়ার্কি হয়, আরকি উনি ও হাওড়ার লোক আমিও হাওড়ার। 

১৫ . পরবর্তীকালে কি হিন্দি ছবিতে কাজ করতে চান ?

উ: হিন্দিতে আমি একটা কাজ করেছি অলরেডি। সেটা হচ্ছে “জয় কানাইয়া লাল কি ” বলে একটি সিরিয়াল, স্টার ভারতে স্নেহাশিস চক্রবর্তীর আন্ডারে, সেটা আমাদের অশোককাননে হত। সামনে একটা ফ্লোর আছে, সেই ফ্লোরে।

১৬. আপনার পরবর্তী প্রজেক্টে কি নতুনদের নিয়ে কাজ করতে চান ?

উ: এটা সম্পূর্ণটা আমাদের হাতে থাকে না। কাস্টিং ডিরেক্টররা থাকেন। কি করবেন, নতুন হলে তাদেরকে তৈরি করে নিতে হয়, পুরনো হলে খুব দরকার পড়ে না। 

১৭. ভবিষ্যতে শর্ট ফিল্ম নিয়ে কাজ করতে চান ?

উ: শর্ট ফিল্মটা একচুয়ালি করতে চাই না বললে ভুল হবে। সব কিছুরই এক্সপেরিয়েন্স মানুষের থাকা দরকার হয়। এই মুহূর্তে শর্ট ফিল্মের ইচ্ছে এখনো হয়ে ওঠেনি। আমার একটা সিরিয়াল থেকে আরও একটা সিরিয়ালে যেতে খুব একটা বেশি সময় লাগেনি। শর্ট ফিল্ম নিয়ে ভাববো যে একটা টাইম, এটাও তো একটা মিডিয়া, প্রত্যেকটা আলাদা আলাদা ভাগ রয়েছে। সেটা নিয়ে যে ভাববো, পড়াশোনা করব, সেটার এখনো টাইম হয়ে ওঠেনি। 

১৮. পরবর্তী সময়ে আপনি যে কাজ করতে চলেছেন, সেটি কি মেগা, না ওয়েব সিরিজ, না কি সিনেমা?

উ: আপাততো এখন যেটা আসবে সেটার উপরে ডিপেন্ড করছে। দেখা গেল মেগা পড়ে আছে আমার হাতে দুটো, ওয়েব সিরিজ আছে, আগে আমি সেই দুটোই করবো। একটা অন্য এক্সপেরিয়েন্স হবে, প্রত্যেক দিন বাইরের খাবার খাওয়ার থেকে নিজের রান্না করে খাওয়ার টেস্ট আলাদা। এটা যদি করার সুযোগ হয়, হ্যাঁ নিশ্চয়ই করব।