মেবারের রানি কুরামদেবীর পরাক্রমের ইতিহাস

আয়ুষ রায়

মেবারের গুহিল বংশের বীর রাজপুত নারী তথা রানি কুরামদেবি। দিল্লির সর্ব শেষ হিন্দু সম্রাট পৃথ্বীরাজ চৌহানের সবচেয়ে প্রিয় মিত্র এবং ভগ্নিপতি ছিলেন মেবারের মহারাজ রাওয়াল সমর সিংহ। এই সমর সিংহের সাথেই পৃথ্বীরাজের ভগিনী রাজকুমারী পৃথার বিবাহ হয়েছিল। ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দে তরাইনের অভিশপ্ত প্রান্তরে পৃথ্বীরাজ চৌহানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাতৃভূমিকে নৃশংস তুর্কিদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে হাসিমুখে প্রাণ বলিদান দিয়েছিলেন মহারাজ সমর সিংহ এবং তাঁর বালক পুত্র কুমার কল্যাণ সিংহ। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বেই কবি চাঁদ বারদাইয়ের নিকট দিল্লি নগরীর অনতিদূরে তুর্কি সুলতান মহম্মদ ঘোরীর আগমনী বার্তা পেয়ে মহারাজ সমর সিংহ চিতোরের রাজ‍্য‍ভার তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী রানি কুরামদেবির হাতে সমর্পণ করেন। তাঁর দ্বিতীয় শিশুপুত্র কর্ণ সিংহকে চিতোরগড়ের অভ্যন্তরে রেখে তাঁর প্রথম পুত্র কুমার কল্যাণ সিংহ আর বিশ হাজার মেবারি সেনা সঙ্গে নিয়ে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর দিল্লি পৌঁছে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে সমস্ত ঘটনা বিস্তারিত ভাবে জানান, মাতৃভূমির সম্মান রক্ষারতে তুর্কি আগ্রাসনকারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অনুপ্রেরণা দেন। এরপর পৃথ্বীরাজ তাঁর ৫৩ হাজার সেনা নিয়ে ও সমর সিংহের সেনাদের সাথে মিলিত হয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে তরাইনের যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হন। ভারতবর্ষের ইতিহাস বদলে দেওয়া সেই ভয়ানক ও মর্মান্তিক যুদ্ধে প্রথমে কিশোর রাজপুত্র কল্যাণ সিংহ এবং পরে দিল্লি নরেশ পৃথ্বীরাজ চৌহানকে কুতুবউদ্দিন আইবকের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হন সমর সিংহ। ছলনার সাহায্যে হিন্দু বাহিনীকে পরাজিত করে তুর্কি সেনা দিল্লি নগরে প্রবেশ করে অবাধ লুণ্ঠন, গণহত্যা, বলপূর্বক ধর্মান্তকরণ, দাস ব্যবসা আর দেবালয় ও মূর্তি ধ্বংস শুরু করে। ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাতায় অবসান হয় একটি যুগের।

947694912

এদিকে যথা সময়ে চৌহান বাহিনীর পরাজয় ও রাজা সমর সিংহ, রাজপুত্র কল্যাণ সিংহের মৃত্যু সংবাদ এসে পৌঁছয় চিতোরে। শোকে দুঃখে স্তব্ধ হয়ে যায় সমগ্র মেবার। পৃথ্বীরাজ ভগিনী তথা সমর সিংহের প্রথমা স্ত্রী পৃথা সেই মুহূর্তেই অগ্নিশয্যা তৈরি করে এক পতিব্রতা হিন্দু নারীর পথ অনুসরণ করে জহরব্রত পালন করলেন। সমর সিংহের দ্বিতীয়া স্ত্রী রানি কুরামদেবিও এই একই পন্থা অবলম্বন করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সে রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখলেন স্বয়ং মেবারের কুলদেবতা একলিঙ্গনাথ তাঁর সম্মুখে এসে তাঁকে বললেন যে তিনি জহর পালন করলে তাঁর শিশুপুত্র ও মেবারের ভবিষ্যতের উত্তরপুরুষ রাজকুমার কর্ণ সিংহের কি হবে ? কে প্রতিপালন করবে তাঁকে আর কেই বা তাঁকে রক্ষা করবে ভবিষ্যতে আগ্রাসনের সম্ভাবনা থেকে। এই স্বপ্ন দেখেই রানি কুরামদেবি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি এখনই জহর পালন করবেন না। কুমার কর্ণ আরও কিছুটা শাবালক হলে তবেই তিনি জহর পালন করবেন। নাবালক কর্ণ সিংহকে রাজসিংহাসনে বসিয়ে,  কুরামদেবি মেবার পরিচালনা করতে লাগলেন।

images.jpeg-2

এরই মধ্যে অতিবাহিত হল আরও কয়েকটা বছর। গজনীতে বন্দি পৃথ্বীরাজ চৌহানের নিক্ষিপ্ত শব্দভেদী বাণে নিহত হলেন গজনীর সুলতান গিয়াসউদ্দিন ঘোরী আর এরপর ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে দুর্ধর্ষ গোখার উপজাতির হাতে নিহত হলেন গজনীর পরবর্তী সুলতান মহম্মদ ঘোরী। উত্তরাধিকারীহীন সুলতান ঘোরীর তুর্কি সাম্রাজ্য তাঁর তিন কৃতদাসের মধ্যে বিভক্ত হল। দিল্লির সহ হিন্দুস্থান শাসনের দায়িত্ব পেল কুতুবউদ্দিন আইবক। দিল্লির নয়া সুলতান হয়েও তিনি উত্তর ও মধ্য ভারতের অনান্য হিন্দু রাজ্যগুলো গ্রাস করে সেখানে ইসলামের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবার অভিপ্রায়ে শুরু করলেন ভয়ানক যুদ্ধযাত্রা। একে একে তুর্কি বাহিনীর সম্মুখে পদানত হল গুজরাতের প্রতিহার রাজপুত সোলাঙ্কি বংশ, আজমির শাসক তথা পৃথ্বীরাজের ভ্রাতা হরিরাজ চৌহান, বুন্দেলখণ্ডের চান্দেল আর পারমার রাজ্য। এরপর বিজয়উল্লাস, অবাধ লুণ্ঠন আর ধ্বংসলীলায় উন্মত্ত কুতুবউদ্দিন তাঁর তুর্কি সেনা সমেত একে একে হাজির হলেন ইতিহাস খ্যাত চিতোরের সম্মুখে। চিতোর তথা মেবার নরেশ কর্ণ সিংহ তখন ১৩ বছর বয়স্ক এক কিশোর বালক। সেইকালে ১৩ বছর কিন্তু খুব একটা শিশু বয়স ছিল না। ১৩-১৪ বছরেই তৎকালীন যে কোন নারী-পুরুষ যথেষ্ট পরিণত মনস্ক হয়ে যেত। কুতুবউদ্দিনের বিশাল তুর্কি সেনা সমুদ্রের আগমনী বার্তা শুনে কিছুটা কম্পিত হলেন মেবার নরেশ কর্ণ সিংহ। কিন্তু এহেন বিপরীত পরিস্থিতিতেও অটল ও অবিচল রইলেন মেবারের রাজমাতা কুরামদেবি। কুতুবউদ্দিনের আগমনী বার্তা শুনে মনে মনে কিছুটা পুলকিতই হলেন তিনি। রাজমাতা মনে মনে ভাবলেন, “হ্যাঁ আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। তাঁর স্বামী রাজা সমর সিংহের হন্তাকারী সেই ঘাতক ভিনদেশি তুর্কি বাহিনী আজ এসে উপস্থিত হয়েছে তাঁরই রাজ্যের সীমান্তে। এইবারে তিনি সমরভূমিতে শয়তান কুতুবউদ্দিনকে পরাজিত ও নিহত করে নিজের পতিহত্যার প্রতিশোধ নেবেন। রাজমাতাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। তখন রাজপুতানা জুড়ে দশেরার উৎসব চলছিল। রাজপুতানার প্রাচীন পরম্পরা অনুযায়ী দশেরা হল যুদ্ধারম্ভের সূচনার ঋতু। অতএব পবিত্র দশেরা উৎসবে বিধর্মী তুর্কি শত্রুদের উচিত শিক্ষা প্রদান করার বাসনায় এই যুদ্ধে রাজমাতা কুরামদেবিকে সমর্থন করে তাঁর সহায়তার জন্য এগিয়ে এলেন রাজপুতানার আরও নয়জন রাজা আর মেবারের এগারো জন সর্দার, ঠিক যেমন হলদিঘাটির যুদ্ধে মেবার নরেশ মহারানা প্রতাপ সিংহকে সহয়তা করবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন ঝালার সর্দার। এরপর রাজমাতা চিতোরগড়ের নিরাপদ আশ্রয় ত্যাগ করে তাঁর সেনা সমেত অগ্রসর হলেন দিল্লির অভিমুখে। কিছুটা অগ্রসর হতেই আরাবল্লি পাহাড়ের উপর জঙ্গলাকীর্ণ এক গিরী সঙ্কটের সন্ধান পেলেন তিনি। সেই সময় চিতোর আসতে হলে এই গিরী সঙ্কট অতিক্রম করেই আসতে হত আর গিরী সঙ্কটটি এততাই সঙ্কীর্ণ ছিল যে একসাথে পাশাপাশি দুজনের বেশি চলতে পারতো না। রণদক্ষ রাজমাতা উপলব্ধি করতে পারলেন যে কুতুবউদ্দিনের বিশাল তুর্কি সেনাকে পরাজিত করবার জন্য এই গিরী সঙ্কটই হচ্ছে সর্বোত্তম স্থান। তিনি সেখানেই দুপাশে পাহাড়ের উপরে অরণ্যের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে তীরন্দাজ সেনা সমেত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন তুর্কি সেনাদের সাদর অভ্যর্থনার জন্য।

images.jpeg

পরদিন সায়াহ্নে সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে হেলে পড়ছে এবং শেষ বিকেলের মিঠে রৌদ্রছটা যখন চতুর্দিক প্রস্ফুটিত ঠিক সেই সময়ই কুতুবউদ্দিন তাঁর সেনা সমেত গিরী সঙ্কটের অভিমুখে এসে হাজির হলেন। তিনি বাহিনীর পশ্চাৎ প্রান্তে ছিলেন এবং অপর একজন তুর্কি সেনাপতি বাহিনীর সম্মুখপানে অশ্বপৃষ্ঠে ছিলেন। বাকি বাহিনী সর্পিল পিপীলিকার দঙ্গলের ন্যায় একটি বিশাল ত্যাড়াব্যাকা লাইন করে গিরী সঙ্কট প্রান্তরে অগ্রসর হচ্ছিল। তুর্কি সেনা সঙ্কটের মধ্যবর্তী স্থানে এসে হাজির হতেই আচমকা দুপাশের জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড় প্রান্ত থেকে উদ্গিরন হল “জয় একলিঙ্গনাথ” সিংহ গর্জন। এরপরেই তীব্র বিস্ময়ে তুর্কি সেনারা দেখতে পেল দুপাশের পর্বত প্রান্ত থেকে হাওয়ায় শীষ কেটে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে সুতীক্ষ্ণ তীরের ফলা। তুর্কিদের অবস্থা হল অনেকটা জাঁতাকলে ফেঁসে যাওয়া ইঁদুরদের মত। মেবারের তীরন্দাজদের তীরের আঘাতে বেশ কিছু তুর্কি সেনা নিহত হল। এরপর রাজপুত পদাতিক বাহিনী তরবারি হস্তে একলিঙ্গনাথের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে পাহাড়ের প্রান্ত থেকে অবতীর্ণ হয়ে তুর্কি বাহিনীর দিকে  ধাবিত হল। বিস্ময়াহত সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবক দূর থেকে প্রত্যক্ষ করলেন মারমুখী রাজপুত বাহিনীর নেতৃত্বে সরবাগ্রে রয়েছেন স্বয়ং দেবি দুর্গার মত অশ্বপৃষ্ঠে তীক্ষ্ণধার তরবারি হস্তে ও আপাদমস্তক লৌহ জালিকা ও লৌহ শিরস্ত্রাণ পরিহিতা এক দীর্ঘাঙ্গি রাজপুত নারী। হ্যাঁ তিনিই রাজমাতা কুরামদেবি। অসি হস্তে তিনি বীর দর্পে তুর্কি সেনাদের নিধন করতে করতে ঘোড়া ছুটিয়ে অবশেষে সম্মুখিন হলেন স্বয়ং সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের। এরপর কুতুবউদ্দিনের সম্মুখীন হয়ে সেই বীরাঙ্গনা রাজপুত রমণী দৃপ্ত কণ্ঠস্বরে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “ওরে তুর্কি শয়তান, তুই যদি সত্যিই যোদ্ধা হোস তাহলে নিজে এই রাজপুত নারীর বিরুদ্ধে অসির দন্ধযুদ্ধ কর, আর যদি কাপুরুষ হোস তাহলে এইভাবেই নিজের সেনাবাহিনীর অন্তরালে নিজেকে লুকিয়ে রাখ”। স্বাভাবিক রূপেই এক হিন্দুস্থানি কাফের রমণীর প্রতিস্পর্ধার আহ্বান ত্যাগ করা সম্ভব হল না তুর্কি সুলতানের। এরপর দুজনের মধ্যে শুরু হল এক ভয়ানক দন্ধযুদ্ধ। বেশ কিছুক্ষণ অসি যুদ্ধ চলবার পর অবশেষে রাজমাতা কুরামদেবির তীক্ষ্ণ অসির আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে রক্তাপ্লুত শরীরে নিজের অশ্বপৃষ্ঠ থেকে ভূমিতে ধরাশায়ী হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন কুতুবউদ্দিন। স্বয়ং সুলতানকে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে দেখে বাকি তুর্কি বাহিনী তীব্র আতঙ্কে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে কোন রকমে কুতুবউদ্দিনকে আরেকটি অশ্বপৃষ্ঠে তুলে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পলায়ন করলো। যুদ্ধে বিজয়ী হল মেবারি সেনা।

চতুর্দিকে “জয় একলিঙ্গনাথ” সিংহ গর্জনে উধভাসিত করে রাজমাতা কুরামদেবির নেতৃতে বিজয়ীর বেশে চিতোরগড়ে প্রবেশ করলো মেবারি সেনা। রাজমাতার ভ্রম হল তিনি সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবককে হত্যা করে তাঁর পতি হত্যার প্রতিশোধ নিতে সফল হয়েছেন। চিতোরগড়ে প্রবেশ করে প্রথমেই তিনি রাজ অন্তঃপুরে প্রবেশ করে তাঁর ১৩ বছর কিশোর পুত্র রাজা কর্ণ সিংহের সাথে অন্তিম বার সাক্ষাৎ করলেন। এরপর তিনি প্রাসাদ সংলগ্ন একলিঙ্গনাথের মন্দিরে প্রবেশ করে শিবের পদদেশে নিজের অস্ত্র সমর্পণ করে হাসিমুখে জহরকক্ষে প্রবেশ করে নিজেকে অগ্নিমাতার কোলে সমর্পণ করে তাঁর অসমাপ্ত জহরব্রত সম্পন্ন করলেন। কিন্তু রাজমাতা কুরামদেবির দুর্ভাগ্য যে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর তরবারির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েও প্রাণহানির সংশয় থেকে সেদিন রক্ষা পেয়েছিলেন কুতুবউদ্দিন আইবক। কিন্তু কুতুবউদ্দিন বেঁচে গেলেও সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ আর সমরভূমিতে রানি কুরামদেবির অভূতপূর্ব সাহসিকতা, বীরত্ব, শৌর্য আর আত্মত্যাগের কাহিনী আজও ভুলতে পারেনি বীরভূমি রাজপুতানা।