বিরহী ঢাকের বোল

শেখ সামসুদ্দিন

‘জানেন বাবু, আমার ছোট’টার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু এই ঝুমুর গানে আমি ওকে আসতে দিবো না।’ প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে লাবণ্যময়ী হাসিতে জবাব দিল ‘সুন্দরবন চেতনা’ নামক ‘ঝুমুর গান’ পরিবেশনকারী সংস্থার দলনেত্রী এবং কণ্ঠশিল্পী বছর ছত্রিশের আদিবাসী মহিলা বীণা ভাঙ্গি । একহারা চেহারার সুঠাম গঠনের বীণাদেবী অপেক্ষাকৃত ফর্সা এবং সুশ্রীও বটে । আসলে অনেককাল পূর্বে পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের বিশেষ কিছু এলাকা থেকে আদিবাসীরা সস্তার শ্রমিক হয়ে দক্ষিণবঙ্গের সাগরমোহনায় এসে ছিল সুন্দরবন হাসিল করতে । অবারিত প্রান্তর আর আবাদি জমি সঙ্গে নদীখালের মাছ-চিংড়ি, বনের গাছগাছালি আর বন্য পশু, চাক ভরা মধু— ফিরি ফিরি করে পরিযায়ী জীবনগুলো পেয়ে যায় স্থায়ী ঠিকানা । স্থানীয় হিন্দু- মুসলিমদের স্ব-সংস্কৃতির জোয়ারে মিশে একাকার হয়ে গেল আদিবাসীদের জীবন স্রোত ।

কিন্তু, হলেও পড়শি— উদ্বাস্তু সংযোগের এই আদিবাসী মানুষগুলো আজও ব্রাত্য, কথায় কথায় ওরা পায় ‘বুনো’ তকমা । দ্যাখ দ্যাখ করতে সামসেরনগর থেকে সাগরদ্বীপ অবধি ভিটে ভদ্রাসনে তো প্রায় লাখ’খানেক আদিবাসীদের বাস । আকণ্ঠ দারিদ্র্যে নিমজ্জিত জীবনগুলো নদীর জলকাদায় মাখামাখি হয়ে মাছ কাঁকড়া ধরে বেঁচে আছে, হয়তোবা থাকবেও । সূর্যের আলো ফুরিয়ে যেতে নিরীহ আঁধারে ঢাকা পড়ে সংলগ্ন এলাকাসহ শুনশান জীবনরেখা । আঙিনায় আঙিনায় জমে ওঠে হাঁড়িয়ার আসর সঙ্গে মেতে ওঠে মুছে না যাওয়া স্ব-সংস্কৃতির নিজস্ব ঘরানার ‘ঝুমুর গান’ এ ।
সুন্দরবন সংলগ্ন পাখিরালা এবং দয়াপুর এলাকায় পর্যটকদের সান্ধ্যকালীন মনোরঞ্জনের জন্য স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম এবং আদিবাসী শিল্পীরা যৎসামান্য পারিশ্রমিকে পরিবেশন করেন ‘দুঃখের বনবাস যাত্রাপালা, টুসু এবং ঝুমুর’ এর মতো আঞ্চলিক গান ।

কাঙ্ক্ষিত উত্তর শুনে প্রফেসর ইন্দ্রনীল বাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু আপনারা তো লুপ্তপ্রায় অমূল্য লোকসংস্কৃতির ধারক এবং বাহক । আপনাদের মাধ্যমে ঝুমুরের শিখা ক্ষীণ হলেও অদ্যাবধি প্রজ্বলিত । নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ এবং প্রশিক্ষণের দায়িত্ব আপনারা না নিলে তো সংযোজিত ঐতিহ্যবাহী এই লোকসংস্কৃতি সুন্দরবনের গ্রামগঞ্জ থেকে অচিরে হারিয়ে যাবে’ ?

পৌষী পঞ্চমীর অনুজ্জল বাঁকা চাঁদ নিবিড় ঝাউ আর ইউক্যালিপ্টাসের আড়ালে । ধূপছায়ার মতো আলোকআভা ফাঁকফোঁকর গলে ন্যাড়া এঁটেল মাটিতে ছড়িয়ে জানান দিচ্ছে নিজের অস্ত্বিত্ব । রাতভর আলো দেওয়া টিউবলাইট ভোরের আলো ফোটার পূর্বে যেমন অবসাদে ম্রিয়মাণ হয় ঠিক তেমনি দায়গ্রস্ত খান দুই টিউব’এর কম জ্যোতির আলোছায়াতে একটা বেঞ্চির উপর বসে থাকা মমতাময়ী বীণাদেবীর উচ্ছল মুখমণ্ডল একলহমাতে ভরে গেল বিবর্ণতায় । শ্রাবণী মেঘের ঘনঘটা প্রভাব বিস্তার করেছে বীণা মায়ের দেহমনে । একরাশ জলীয়বাষ্প সম্পৃক্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে নাগাঢ়ে বলে চলল— ‘বাবু, বিরামহীন ঘন্টাখানেক গান সঙ্গে সদস্যদের নাচন-কোদনের দৈহিক কসরতে মিনিট পাঁচেক হেঁটে মোটরভ্যান, তারপর সরীসৃপের কঙ্কালের উপর দিয়ে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে আধ ঘন্টা যাত্রার পর আবার পায়ে হেঁটে অবসন্ন শরীরটা বাসায় পৌঁছায় রাত দশটা বা এগারোটায় । এত পরিশ্রমের পর আঁচলের গিঁট খুলে হাতে পাই বেশি হলে শত’খানেক টাকা- তাও তো সব রাতে হয় না । সর্বোপরি, শীতের এই তিন চার মাস শহুরে বাবুরা নদীখাল পেরিয়ে আসেন সোন্দরবোন দেখতে । তা বলুন বাবু, সংসারটা চলে কি করে ! দু’বেলা না হোক রাক্ষুসী পেট’টার তো একবেলা কিছু দিতে হবে । ছেলে মেয়েরা যদি ঝুমুর গানে মাতে তো ওরা না খেতে পেয়ে মরবে । জানেন বাবু, বেশিরভাগ বাবু তো আমাদের গান শোনেনা— তালে তালে নাচতে থাকা মাইয়া মানুষের শরীরটাকে দ্যাখে অপলকে, অনেকে তো গিলেও খায় মনে মনে’।

কথাটা যে ধ্রুবসত্য তা জানেন স্যার ইন্দ্রনীল বাবু, স্যার জয়দীপ বাবু এবং স্নেহের শুভেন্দু স্যার সঙ্গী অধ্যাপিকা জলি দিদি ও রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটির অধ্যাপিকা স্নিগ্ধা । সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ তো বটেই সঙ্গে স্ব-ঘরনার লোকসংস্কৃতি সমূহকে বাঁচিয়ে অর্থাৎ পূনরোজ্জীবিত করতে রাজ্য সরকারের তৎপরতাও প্রশংসার দাবী রাখে । বিভাগীয় দপ্তরের তৎপরতায় সুন্দরবন এলাকায় বিভিন্ন স্থানে ধুমধামসহ মহাআড়ম্বরে নেতা মন্ত্রীরা আসেন, হয় জমাট মেলাও । ঝুমুর এবং বনবিবি(বনদেবী) পালাগানের অভিনেতা- নেত্রীগণের কেউ কেউ পরিচিতির জন্য কার্ডও পান । নিকষ অন্ধকার বৃত্তের মধ্যে আলোক বিন্দুর উপস্থিতিতে বনচারী জঙ্গুলেরা কিঞ্চিত হলেও দিশা পায়— স্বপ্ন দ্যাখে জীবনে বাঁচার । অপরিকল্পিত জোড়াতালি দেওয়া জীবনরেখার এপারে প্রায় লাখ কুড়ি মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে সম্পূর্ণরূপে নদীখাল এবং নিবিড় জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল । যাদের সূর্যোদয় থেকে অস্ত অবধি একটা দিন বাঁচার পর— পরের দিন আকাশের খুব কাছে চেনা নদীর পাড়ে সেই বন’টার সঙ্গে ওঁদের আবার দেখা হতে- শুরু করে বাঁচার জন্য লড়াই । ক্রমাগত বজ্রপাতের শেষে প্রথম পশলা এলে যেমন হয় ঠিক তেমনি সূর্য গোধূলির কোলে আশ্রয় নেওয়ার ক্ষণপরে সংলগ্ন গাছগাছালিতে অজস্র পাখির ডাক বন্ধ হতে— লোক’টাকে চাক্ষুষ করতে বাড়ির লক্ষ্মীদের মনে জোয়ার আসে, ধীর দৃপ্ত পদসঞ্চারে ফুটে ওঠে আত্মবিশ্বাস । জোয়ার-ভাটার স্রোতে ভেসে চলে এঁদের বিবর্ণ জীবন । তাছাড়া জীবনরেখার বাঁকে বাঁকে পা রাখলে যাঁদের তীক্ষ্ণ স্মৃতিতে বার বার ফিরে আসে বাঘে ধরা জঙ্গুলেদের অতীত ইতিহাস— যে ক্ষত শুকোনোর নয় । চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় সেই দগদগে স্মৃতি— হয়তো কাউকে আবার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সেই স্মৃতি চিহ্ন । দারিদ্রতা এখানে নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙে গড়ে নতুন রেকর্ড…। ২০১৪ সালে সুন্দরবন সংলগ্ন ৭ ব্লকের উপর করা ‘ইয়েস ব্যাঙ্ক’এর সমীক্ষায় উঠে এসেছে— জীবনরেখার এপারে প্রত্যেক গ্রামে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করে দারিদ্রসীমার নীচে এবং যাঁদের মাথাপিছু দৈনিক গড় আয় ৪ টাকার সামান্য বেশি ।
অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, জীবনের মান তলানীর কোন স্তরে অবস্থান করছে এখানে ।

পথে বসা বা অতলান্তে নিমজ্জিত হওয়া লোকসংস্কৃতির মহিমা পুনরুজ্জীবিত করার দায় অপেক্ষা বাঘ-কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে চামড়ায় ঢাকা কঙ্কালসার শরীরে প্রাণ’টাকে বাঁচিয়ে রাখা নিজেদের কর্তব্য বলে মনে করেন ওঁরা । নমন অবনমন কিংবা অনন্ত অবনমনের চড়াই সিঁড়িতে বাপ-দাদাদের দেখানো পথই দু’বেলা না হলেও একবেলা অন্নের উৎস ।

ঢাকে হাত পড়তেই পেরিয়ে আসা অতীতের কশাঘাত শ্রবণেন্দ্রিয়ে আঘাত করল সপাটে । সদ্য উনিশ কুড়ি পেরোনো বা ছুঁই ছুঁই মহিলা শিল্পীরা আন্দোলিত নাগিনী’র ছন্দে ছন্দে প্রবেশ করল খটখটে শুখনো এঁটেল মাটির সমতল মঞ্চে ।
গায়িকা মমতা মণ্ডলের ‘বাবু, আমরা আদিবাসী গো’— সুরেলা কণ্ঠস্বর সংলগ্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে তৈরি হল এক মায়াবী পরিবেশ । ঢাক ছাড়া থাকার মধ্যে ক’জোড়া ঘুঙুর— তাতে কিইবা এসে যায় ! অদম্য ইচ্ছাশক্তি— দায় যে ওঁদের লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার । মায়েদের পদধ্বনি, ঘুঙুরের ঝংকার আর মাতাল ঢাকের বিরহী বোল— এমন অনাকাঙ্খিত পরিবেশে প্রফেসরগণসহ আমরা ক’জন মন্ত্র আবিষ্ট শ্রোতা এবং স্থানুবত দর্শক । গানের তালে তালে বিরামহীন নাচ— শেষ পৌষের কামড় বসানো শীতেও মায়েরা ঘেমে নেয়ে সপসপে । তার মধ্যেও— ‘লাল পাহাড়ির দ্যাশে যা, রাঙামাটির দ্যাশে যা, হেতায় তুকে মানাইছে না রে…”

মিনিট চল্লিশ কেটে গেল— সময়ের তাড়া মন না চাইলেও মাঝপথে আমাদের উঠতে হলো পাশের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বনবিবি’র পালাগান ।

‘জল আর জঙ্গল যাঁদের অন্ন জোগায়’— স্বাভাবিক কারণে দারিদ্রে নিমজ্জিত এই মানুষগুলো জলে কুমির, জঙ্গলে বাঘ, ঝোপেঝাড়ে বাস করা বিষাক্ত সাপের ছোবল থেকে রেহাই পেতে আর গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি এবং নিজেদের রোগ বালাই থেকে নিরাময় পেতে কিছু অতিমানবীয় সত্ত্বার অধিকারী মানুষের তুকতাকের উপর আস্থা রেখেছিলেন । ফলে, দক্ষিণ বাংলার লোকায়ত সমাজকে সুদূর অতীত থেকে প্রভাবিত করেছে কিছু মানবীয় সত্ত্বা । পৌরাণিক দেবদেবীর উপাসনায় অভ্যস্ত হলেও পরিস্থিতির সাপেক্ষে অবিরাম অত্যচার-নিষ্পেষণ-অবিচার, রোগ-মহামারি, ভূতপ্রেত এবং বাঘ-কুমিরের থেকে মুক্তি কামনা করেছিল । এই কামনায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে সমস্ত মানবীয় সত্ত্বা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন তাঁরাই হয়ে গেলেন লোকায়ত দেবদেবী এবং ম্রিয়মাণ হলেও অদ্যাবধি পূজিত হয়ে আসছেন বাংলার গাঁ- গঞ্জে । এবং নির্ভর করবে মানচিত্রে টিকে থাকা সুন্দরবনের অস্তিত্বের উপর ।

১১৭৯-১২০৫ খৃষ্টাব্দে নদীয়া পরাজয়ের পর দক্ষিণ বাংলা শাসন করছিলেন মহারাজ লক্ষণ সেন । এই সময় ‘আঠারো ভাটি’র (সুন্দরবন এবং সংলগ্ন এলাকা) হৃদয় জয় ক’রে অতিমানবীয় সত্ত্বায় পৌঁছেছিলেন মা নারায়ণীর (রায়মনি) জ্যেষ্ঠ পুত্র দক্ষিণরায় । দক্ষিণরায় এবং মা নারায়ণী উভয়েই বাঘ এবং কনিষ্ঠ পুত্র কালুরায় কুমিরের দেবতা রূপে পূজিত হয়ে আসছিলেন ।

১৮৭৭-’৭৮ এ মুনশি বয়নুদ্দিন রচিত ‘বোনবিবি জহুরনামা’ এবং মহম্মদ মুনশি রচিত ‘বোনবিবি জহুরনামা কন্যার পুঁথি’ থেকে জানা যায় ভাঙ্গড় শাহ এবং বড়খাঁ গাজিসহ কিছু পীরগণের চিন্তা ভাবনায় ধর্মপ্রচার এবং নিষ্পেষিত জনগণের মুক্তি সঙ্গে রোগশোকের থেকে রেহাই দিতে সূদুর আরব থেকে আনিয়ে ছিলেন মন্ত্রজ্ঞানী, কবিরাজি চিকিৎসা এবং তুকতাকে অভিজ্ঞ বিশেষ কিছু মানুষ । অতিমানবীয় সত্ত্বার অধিকারী এই মানুষগুলো স্বকৃতিত্বের মাধ্যমে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন লৌকিক দেবদেবীর আসনে । এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বনবিবি, সহোদর শাহজঙ্গলি এবং বড়খাঁ গাজি ।

পরিবর্তনশীল জগৎ থেমে থাকেনি— থমকে থাকেনি আঠারো ভাটির দেশও । নিজ এলাকায় বনবিবির অতিমানবীয় সত্ত্বা লোকায়ত জীবনকে প্রভাবিত করল । ভাটির দেশ অর্থাৎ এখানকার মানুষের জীবন জীবিকা জড়িয়েছিল খাল-খাঁড়ি আর জঙ্গলে । অলৌকিকতায় ভর করে অতি সহজে সাধারণ ও অজ্ঞ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিলেন বনবিবি । লোভ আর অহংবোধের আগ্রসনে আচ্ছন্ন বনবিবির দৃষ্টি তখন ঘুরপাক খাচ্ছে দক্ষিণরায় অধিকৃত সুন্দরবনে ।

রাক্ষস-বাঘ-মানুষখোর অর্থাৎ মানুষ ধরে খায় প্রভৃতি আখ্যা আরোপিত হল দক্ষিণরায়ের উপর । আর এখানেই অবতীর্ণ হলো ধনা মউলে এবং দুখে’র হৃদয়বিদারক কাহিনী । কাহিনীতে, দক্ষিণরায়— বাঘের রূপ ধ’রে বালক দুখেকে খেতে চেয়েছিল । কিন্তু বনবিবি— বালক দুখেকে কোলে নিয়ে রক্ষা করেন এবং দক্ষিণরায়কে চরম শিক্ষা দিতে শাহ জঙ্গলিকে নির্দেশ দেন ।

সমগ্র ঘটনা পর্যালোচনা করলে ব্যাখ্যা এমনই দাঁড়ায়, মানুষই হলো ইতিহাসের মুখ্য উপাদান । ইতিহাস এসেছে কিন্তু মহাকালকে সামনে রেখে । আর এই ইতিহাসের পদে পদে থাকে আপামর অজ্ঞ, মূর্খ, সাধারণ জনজীবন— গ্রামের লোকায়ত সমাজ । সুন্দরবন এলাকার লোকায়ত সমাজকে প্রভাবিত করেছে বেশ কিছু মানবীয় সত্ত্বা । যেমন— ১) বনবিবি, নারায়ণী, দক্ষিণরায়, বিশালক্ষ্মী- এঁরা হলেন অঞ্চলভিত্তিক বাঘের দেবী ও দেবতা, ২) কুমিরের দেবতা হলেন কালুরায় ( মতান্তরে- গাজি), ৩) সাপের দেবী— মা মনসা, ৪) গুটি বসন্তের দেবী— মা শীতলা, ৫) কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক— বাবা পঞ্চানন্দ, ৬) জেলেদের দেবতা— মাখাল, ৭) গবাদি পশুর দেবতা— বাবা আটেশ্বর এবং মানিকপীর । এছাড়া পূজিত হয়ে আসছেন পাঁচ পীর— মানিকপীর, গাজি সাহেব, বামনপীর, রক্তানু খাঁ, এবং সাত বিবি মায়ের মধ্যে— বিবি মা, ওলা বিবি, মাই বিবি প্রমুখ পীর-গাজি-ফকির ও দরবেশগণ ।

মঞ্চে পৌঁছে স্যার ইন্দ্রনীল বাবু ও জলি ম্যাডাম কলাকুশলীদের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার নিলেন । অত:পর শুরু হল বনবিবি পালাগান । অনাড়াম্বর ছোট্ট মঞ্চ ঘিরে কয়েকটা বাদ্যযন্ত্র এবং অল্প হলেও আলোর কেরামতি ছিল । মুগ্ধ হলাম ‘মাঝি বাইয়া যাও রে… অপূর্ব সুর লহরী সঙ্গে নিখুঁত অভিনয় । অপলক দৃষ্টিতে অধ্যাপকগণ । নামকরা পেশাদার নাট্যব্যাক্তিত্বের অভিনয় দক্ষতায় অবশ্যই মুগ্ধ হয়েছেন ইতিপূর্বে, কিন্তু— সোঁদা গন্ধের সুন্দরবন, অবারিত জল আর শেষ হতে না চাওয়া চিরসবুজের মহামেলা ঘিরে জীবনরেখার এপারে দারিদ্রতা আর অশিক্ষা যাঁদের নিত্য সঙ্গী তাঁরাও লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কি নিখুঁত অভিনয় করছেন ।
আমরা ক’জন বাকরুদ্ধ, অবিচল। সুন্দরবনের একমাত্র বদ্বীপ কেন্দুখালি যা বাঘ’এর গুহা (Tiger Den) নামে আখ্যায়িত, সেই নির্জন দ্বীপে বালক দুখের উপর বাঘের আক্রমণ- বনবিবির আবির্ভাব এবং উদ্ধার আর শাহ জঙ্গলির দ্বারা শাসিত দক্ষিণরায় । এককথায় নিখুঁত চিত্রনাট্য এবং রেখাপাত করা বলিষ্ঠ অভিনয় । মনে হলো দেড় ঘন্টা সময় পেরিয়ে গেল কয়েক লহমায় । জলি ম্যাডাম রেকর্ড করলেন সমগ্র পালাগান ।

চাঁদ নেই আকাশে— অস্ত গেছে অনেক আগে । নক্ষত্রখচিত আকাশের নিচে শিশিরস্নাত আমরা ক’জন । অনুষ্ঠান শেষে অনুভব করলাম একটা বেদনা । সেই বেদনা যে কিসের এবং কেন ? তা আমার কলম অন্যজনকে বোঝাতে অক্ষম । এক এক করে সবাই চলে যেতে ফিরফিরে প্রবাহে নড়বড়ে কাঠামোর অভিনয় মঞ্চ’খানা দাঁড়িয়ে রইল আগামী কোলাহলের অপেক্ষায় ।

লঞ্চের দুলুনি, ঘুম ঘুম চোখ, স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া আবেশ নাড়িয়ে যাচ্ছিল অর্ধ অবচেতন ইন্দ্রিয়কে — ‘আমাকে ফেলে যেও না চাচা’ বালক দুখে’র নিশ্চিত মৃত্যু ভয়ের সেই করুণ আর্তনাদ । এক সময় নিদ্রার গ্রাসে নিজেরা হারিয়ে গেলাম ।

পর দিন ১২/০১/২০১৯ রবিবার সকালে সজনেখালির মিউজিয়াম ঘুরে ছলছল শব্দে সুধণ্যখালি ওয়াচ টাওয়ারের উদ্যেশে লঞ্চ চলছে । দ্বীপাঞ্চলগুলো কোলের মধ্যে নিয়েও তো সাগরের সাধ মেটেনি, শিরা-ধমনীর মতো যত্রতত্র প্রবাহিত হয়েছে— খাঁল-খাঁড়ি-সোঁতা-ভারানি নাম নিয়ে । এ খাল-সে খাল, দু’পারে হেঁতাল-গরাণ-বাইন-ধোদল কিংবা কেওড়ার সূচীভেদ্য নিবিড়তার মাঝে শুয়ে থাকা অজগরের মতো এক চিলতে জলের ওপর দিয়ে চলেছি আমরা । ওয়াচ টাওয়ার দেখে দুপুর একটা নাগাদ কাঙ্ক্ষিত ‘দো বাঁকি’ । হাঁটু জলে দাঁড়ানো ত্রস্ত হরিণীর মায়াবী চোখ, সঙ্গে মাস দুয়েকের চঞ্চল শিশু হৃদয় হারালো প্রফেসরগণের । দো বাঁকির ‘কেনপি পথে’ চলার সময় কয়েক’টা হরিণ দেখলেও— দৃষ্টির প্রান্ত ছুঁয়ে ঠাসবুননের গাঢ় সবুজের বিস্তৃত শ্যামশোভা, নীল-সবুজের ঢলাঢলি, অনাবিল নীরবতা, দ্বিপ্রাহরিক সৌন্দর্যের এমন ব্যাপ্তিতে প্রফেসরগণের মন কানায় কানায় ভরে হয়তোবা উপচেও পড়ল ।

ঝড়খালি ছেড়ে মাতলাতে লঞ্চ । জোয়ার— ভরাট বুক জুড়ে কানাকানি করা তরঙ্গসমূহ রেঙেছে শেষ বিকেলের ফুরিয়ে আসা রক্তিম আভায় । দিবাচরা ঘরমুখো— ক্লান্ত ডানার পতপত শব্দ আর নিশাচররা অলসতা কাটিয়ে তৎপর । বিয়োগ বেদনায় ভারাক্রান্ত অবুজ মন কটা । এর মাঝে ক্ষীণ হলেও শ্রবণেন্দ্রিয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে ক্রমঃমিশিয়ে যাওয়া — ‘মাঝি বাইয়া যাও রে, অকুল দরিয়ার বুঝি কূল নাইরে’ সঙ্গে বিরহী ঢাকের বাঁধনহারা উদ্দাম বোলের তালে তালে কণ্ঠশিল্পী মমতাময়ী বীণা মায়ের— ‘লাল পাহাড়ির দ্যাশে যা, রাঙামাটির দ্যাশে যা— প্রফেসর বাবুরা ফিরে যা…’