প্রতিশোধ

স্বাতী সরকার :-

সঞ্জয় বসাক এই মুহূর্তে কলকাতার ব্যবসার জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র । কিন্তু তাঁর এই পজিশনে আসতে তিনি কিন্তু খুব বেশি দিন নেননি । মাত্র পাঁচ কি খুব জোর ছয় বছরের মধ্যেই তিনি নিজের ক্ষমতা বলে আজকের বিজনেস টাইকুন হয়ে দাঁড়িয়েছেন । যথারীতি ওঁর এই উল্কার মতো উত্থান এর রহস্য জানার জন্য অনেক সাংবাদিক ই ওঁর ইতিহাস ভূগোল জানার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন, কিন্তু ওঁর আদি বাড়ি উত্তরপাড়ায়, পড়াশোনা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার,- থাকতেন বেঙ্গালুরু তে, চাকরি করতেন এক গাড়ির ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি তে, বিবাহিত, বৌ রুমি রেডিওলজিস্ট, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার, কিন্তু হটাৎ বৌ মারা যেতে ওখানকার পাট চুকিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। বাবা মা অনেকদিন হল নেই, আপাতত একা, একটি কাজের লোক নিত্যসঙ্গী । আর নতুন করে চাকরি তে জয়েন করেননি। নিজের ব্যবসা শুরু করেন,-গাড়ির ই । নিজস্ব শোরুম ও আছে, গাড়ির ডিলারশিপ নেয়া, তবে ওঁর প্রধান ব্যবসা হল কাস্টমাইজড গাড়ির। এর বেশি আর কিছুই কেউই জানতে পারেনি । হয়তো বা এর বেশি আর জানার কিছু নেই ও ।
এই ব্যবসা র থেকেই ওঁর যাবতীয় উন্নতি । কি যে মন্ত্রগুপ্তি জানেন উনি, ওঁর কারখানায় গাড়ি যেন কথা বলে, কাস্টমার স্যাটিসফ্যাকশন এর চূড়ান্ত । কিন্তু বহু চেষ্টা তেও আবিস্কার করা যায়নি উনি কিভাবে কি করেন । এখন হয়তো নিজের হাতে আর কাজ করেন না কিন্তু বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট আলাদা, একটার সাথে একটার কোন যোগাযোগ নেই, আর সেখানেও সবাই সব কিছু জানেনা । ওঁর নিজস্ব টীম ই শুধু জানে কি করা হয়, কিভাবে করা হয়, আর তাদের মধ্যেও কোন যোগাযোগ রাখা বা একসাথে বেড়ানো, পার্টি করায় নিষেধ আছে । এভাবেই উনি নিজের সাম্রাজ্য মানে ব্যবসা ক্রমশঃ বাড়িয়ে চলেছেন।
এই মুহূর্তে মিস্টার সঞ্জয় বসাক আছেন কোনা এক্সপ্রেস ওয়ে তে একটু কম দামী ও কম নামী বার এ । আসলে আজকাল আর খুব পপুলার জায়গায় যেতে ইচ্ছে হয়না । লোকজন সব সময় ঘিরে ধরে, হয় স্তাবকতা নয়তো কিছু চাহিদা আর নইলে জীবন কে নিয়ে প্রশ্ন, , কাঁহাতক আর একই প্রশ্নের উত্তর দিতে ভালো লাগে । কখনো একটু নিজের সাথে একা হতেও তো ইচ্ছে হয় । সেইজন্য আজ তিনি এখানে । ড্রিংকস যে খুব বেশি করেন তা নয় সব সময় মাপা সাড়ে তিন পেগ। তবে আনুসঙ্গিক উপকরণ পরিমানে অল্প হলেও ঠিকঠাক পছন্দসই হতে হবে । এই বার টা সেটা অসাধারন সার্ভ করে । আজও চুপচাপ বসে ছিলেন একটা ড্রিংকস এর গ্লাস নিয়ে সঙ্গে অল্প ফিশ কাবাব আর স্যালাড নিয়ে । আজ সোমবার হলেও মোটামুটি ভর্তি ই বারের টেবিল গুলো । হালকা আলো আঁধারির এক মায়াময় পরিবেশ, বসে বসে ভাবছিলেন মিস্টার বসাক, -কিছু, বেশ অন্যমনস্ক ই ছিলেন, হটাৎ ই এক মহিলার গলা শুনে সামনে তাকিয়ে দেখেন এক মহিলা কিছু বলছেন ওঁকে । তাড়াতাড়ি উত্তর দেন, “সরি, একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, আমায় কিছু বলছেন?” মহিলা উত্তরে বলেন “ তেমন কিছুই না, আসলে টেবিল গুলো সব জোড়া, তাই আপনার এখানে আমি কি একটু বসতে পারি? এটাই বলছিলাম” । “ আরে হ্যাঁ হ্যাঁ , বসুন না, স্বচ্ছন্দে” । বললেন বটে মুখে কিন্তু মনে মনে এও ভাবলেন, আজকাল কি মেয়েরা একা একা বার এ আসে ? কে জানে , ওঁর নিজের তো নারী বর্জিত জীবন, কাজের সূত্রে যত জন মহিলা কে চেনেন, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের খবর তো আর রাখেন না । মহিলা বসার পর নিজের জন্য একটা ড্রিংকস এর অর্ডার দিলে মিস্টার বসাক একটু খুঁটিয়ে দেখলেন মহিলা কে , মোটামুটি ওই বিয়াল্লিশ থেকে চুয়াল্লিশ এর মধ্যেই । বয়েজকাট চুল, দেখতে দারুন না হলেও একটা আলগা শ্রী আছে আর দারুন পারসোনালিটি । দুজনে কথা বলতে বলতে জানতে পারলেন, মহিলার নাম রোমিতা । পেশায় আইনজীবী, এদিকে কোন দরকারে এসেছিলেন, আজকের মতো কাজ শেষ, প্রচন্ড জটিল কোন কাজ ছিলো তাই একটু রিলাক্স করার দরকার, মাথার জট টা ছাড়ানোর ও । তারপর রোমিতা ওঁর পেশা জানতে চাইলেন ।
সঞ্জয় বসাক দেখলেন এই প্রথম কেউ ওঁকে চিনলো না বা ওঁর সম্বন্ধে কিছুই জানে ও না । উনিও বেশ রিলাক্স মুডে গল্প করতে লাগলেন । বেশ কিছু সময় কেটে যাবার পর দুজনেই উঠলেন, তবে ততক্ষণে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে দুজনের । কথায় কথায় আবার বুধ ও শুক্র দুদিন ই রোমিতাকে এদিকে আসতে হবে শুনে ওখানেই দুজনে মিট করার কথা বললেন ।
তারপর আরো বুধ ও শুক্র দুদিন ই দেখা হল, বেশ গল্প ও হল, শুক্রবার মিস্টার বসাক রোমিতা কে নিজের বাড়িতে রবিবার আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন । রোমিতা ইনভিটেশন গ্রহণ করতে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে যেতে হবে ।
রবিবার সকাল সাড়ে নটা নাগাদ রোমিতা নির্দিষ্ট ঠিকানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো , দেখলো বেশ অনেকটা এরিয়া জুড়ে বাড়ির বাউন্ডারি দেয়াল, বেশ দেড় মানুষ সমান উঁচু । তার ওপর দিয়ে বেশ অনেক গাছপালা দেখা যাচ্ছে । মাঝখানে একটা বেশ বড়ো সবুজ রং এর দরজা, বেশ বড়ো বড়ো দুটো কড়া লাগানো । কিন্তু আশে পাশে কোন কলিং বেল দেখতে পেলোনা । বেশ কিছুটা ভেতরে হলদে রং এর একটা পুরোনো দিনের বাড়ি বাইরে থেকে দোতলা টা আর সবুজ খড়খড়ি ওয়ালা জানলা গুলো দেখা যাচ্ছে । কিছুই বুঝতে না পেরে রোমিতা কড়া নাড়লো দরজা র । তখনই দোতলার একটা জানলা খুলে গেলে রোমিতা দেখলো সঞ্জয় বাবু দাঁড়িয়ে আছেন । উনি ওখান থেকেই বললেন, “ডানদিকের কড়া টা ক্লক ওয়াইজ ঘুরিয়ে দিন, দরজা খুলে যাবে, আপনি কাইন্ডলি একটু নিজেই খুলে আসুন প্লিজ, আসলে কাজের লোক টি একটু বাজারে গেছে” । কথামতো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে রোমিতা দেখল যে গাছপালার মাথা দেখা যাচ্ছিলো বাইরে থেকে, সেটা আসলে একটা বাগান । দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁ দিকে একটা বেশ বড়ো বাগান, ডানদিকে দুটো ছোটো ছোটো বাগান কোমর সমান পাঁচিলে ঘেরা, যার মাঝখান দিয়ে একটা সরু মতো পায়ে চলা পথ আউট হাউসে গিয়ে থামছে, সম্ভবত দরোয়ান বা কাজের লোকেদের থাকার জায়গা । এই মেইন দরজার মুখোমুখি আরেকটা দরজা সেটা দিয়ে ঢুকলে সামনে একটা বিশাল বাঁধানো উঠোন । যার বাঁদিক ও সামনে টা জুড়ে এল শেপ এর দোতলা পুরোনো আমল এর থাম ওলা বাড়ি আর ডানদিকে একটা বিশাল নিম গাছ বাড়ির শেষ প্রান্তে আরেকটা দরজা, যার ফাঁক দিয়ে বাড়ির পিছনের পুকুর এর কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে ।
বাঁ দিকে বাড়িতে ঢোকার দরজা, ঢুকতেই ডান হাতে সিঁড়ি । সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসতে রোমিতা দেখে সামনেই সঞ্জয় বাবু দাঁড়ানো । যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে , সেটা এক বেশ সাজানো গোছানো বসার ঘর। দুজনে গিয়ে মুখোমুখি সোফায় বসতে সঞ্জয় বাবু বললেন, “ আসলে শুক্রবার রাত থেকে আমার শরীর টা বেশ খারাপ জ্বর জ্বর মতো হয়েছে, গায়ে হাত পায়ে ও বেশ ব্যাথা কি জানি ওখানে খাবারে কিছু পড়েছিলো কিনা , দেখুন না বেশ অ্যালার্জি ও বেরিয়েছে” । রোমিতা তখন বলে ওঠে “ এ বাবা তবে তো আমায় ফোন করে দিতে পারতেন, আমি তবে আসতাম না”। “আরে আপনি এসেছেন, আমার তো ভালোই হল, সারাদিন বাড়ি বন্দী, একদিনেই হাঁপিয়ে গেছি, তবুও তো দুটো কথা বলতে পারবো । দাঁড়ান কফি করে আনি” । সঞ্জয় বাবু বলতে রোমিতা বলে ওঠে “আরে আপনি অসুস্থ, আমায় বলুন কোথায় জিনিষপত্র আছে, আমিই করে আনছি কফি” ।
একটু পরে দু কাপ কফি নিয়ে টেবিলে রাখে রোমিতা । দুজনে গল্প করতে করতে কফি খেতে থাকে । কিছুক্ষণ এর মধ্যেই সঞ্জয় বাবুর শরীর খারাপ লাগতে থাকে । প্রচন্ড ঘাম হতে থাকে, যন্ত্রনা হতে থাকে, তাড়াতাড়ি রোমিতা কে বলেন টেলিফোন এর পাশে ডায়রি তে ডক্টর এর নাম আছে , একটা খবর দিয়ে দিতে । তখন রোমিতা বলে ওঠে, “ কে রোমিতা ? আমি তো সোমা, আপনার মৃতা স্ত্রী রুমি র ছোটবেলার বন্ধু । আমি দিল্লির বাসিন্দা বলে আমায় চেনেন না কারন বিয়েতে আমি যাইনি । আমি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট এ আছি । রুমি কিভাবে মারা গেছে আমি জানিনা ভেবেছেন? ছোটো থেকে ওর গোলাপ এর গন্ধে অ্যালার্জি ছিলো, তবে ও গাড়িতে এয়ার ফ্রেশনার কেন গোলাপ এর গন্ধ ওলা রাখবে ? মারা যাবার কিছু মাস আগেই ওই অত বড়ো অ্যামাউন্ট এর পলিসি করেছিলেন কেন? অফিস থেকে ফেরার পথে ও হটাৎ ওর নরমাল রাস্তা ছেড়ে ওই নির্জন রাস্তা ধরলো কেন? ওর ফোনে লাস্ট ইনকামিং কল আপনার ই ছিলো , তখন পুলিসকে বলেছিলেন যে আপনার আসতে দেরি হবে সেটা জানাতেই আপনি ফোন করে ছিলেন । এটা বলেননি যে ও আপনার কাছে বাড়ির চাবি নিতেই আসছিলো কারন দুদিন আগেই ওর চাবির সেট টা হারিয়ে গেছিলো । সেটা আমি আপনাদের কাজের লোকের কাছে জেনেছি পরে । আর ওর গাড়ির দরজা হটাৎ লক হয়ে গেছিলো কেন ? যেটা ও খুলতে পারেনি বলেই এলোমেলো চালিয়ে গাছের গায়ে ধাক্কা মারে আর মারা যায় । কারন তখন ওর প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেছিল। তখনকার মতো পুলিস এগুলো খুঁজে পায়নি তাই কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি । কেস ক্লোজ হয়ে গেছিলো । কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি । খুঁজে বার করেছি সব কিছু , কিন্তু কোন প্রমান জোগাড় করতে পারিনি, তাই শাস্তি টা নিজের হাতেই দিয়ে গেলাম । আমি জেনে শুনেই আপনার সাথে বন্ধুত্ব করি । ওখানকার সি সি টিভি ও খারাপ এক সপ্তাহের জন্য আমিই করি । আপনার …গ্রুপের ওষুধ এ অ্যালার্জি আছে না ? আমি শুক্রবার আপনার ড্রিংকস এ কম পরিমান এ মিশিয়ে দিয়েছিলাম তাই আপনি এত টা অসুস্থ হয়েছেন আর আজ বেশি করে মিশিয়ে দিই কফিতে । যাতে আপনিও সেই কষ্ট পেয়েই মারা যান যা রুমি পেয়েছে । কথা শেষ হতে না হতেই মৃত্যু র মুখে ঢলে পড়েন মিস্টার সঞ্জয় বসাক । সোমা নিজের কফির কাপ, ধুয়ে আবার জায়গায় রেখে নিজের ফোন টা পুকুরের জলে ফেলে ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে । এই ফোন টা আর সিম টা এই কাজের জন্যই নেয়া । আর রোমিতা কে প্রয়োজন নেই। এবার রোমিতা হারিয়ে যেতেই পারে । দশ দিনের ছুটিতে বাবা মায়ের কাছে এসেছিলো সোমা । আগামীকাল দিল্লী ফিরে যাবে সে । আবারো জয়েন করবে কাজে । তবে বহুদিনের পড়ে থাকা কাজ টা আজ শেষ হল । শুধুই মাত্র কটা টাকার জন্য ছোটবেলার বন্ধুর খুনের আজ হিসেব মিটে গেল । হয়তো এটা পাপ , ও নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে অন্যায় ই করেছে । হয়তো কোনদিন পুলিস ওকে ও খুঁজে বার করবে, পারফেক্ট ক্রাইম বলে কিছু হয় না, এটা ও নিজেও মানে । কিন্তু আপাতত বেস্ট ফ্রেন্ড এর খুনি কে শাস্তি দিতে পেরে ও নিজের কাছে নিজে খুশি ॥