সময়ের পথ বেয়ে

স্বাতী সরকার:-

একমনে বসে ক্যানভাসে রং করছিল দেবজিৎ, তুলি চলার সাথেসাথে নিজের মনে কিছু গুনগুন ও করছিল, ছুটিতে বাড়ি এলে যেটা দেবজিতের একমাত্র নেশা । হটাৎ করেই কারো পায়ের শব্দে একাগ্রতায় ছেদ পড়ে । পায়ের শব্দটা ধীরে ধীরে এসে দেবজিৎ এর পিছনে এসে থামে, খুবই সংকোচের সাথে একটা মৃদু গলা কানে আসে , ‘ দাদা……..
– ‘ অহনা তুমি হটাৎ ! আমার ঘরে ? কিছু বলবে ? ‘ মুখ না ফিরিয়েই বলে দেবজিৎ ।
– ‘ দাদা’!
গলার স্বরটা কেমন অন্যরকম কাঁদো কাঁদো ঠেকলো না ! হাতের তুলি নামিয়ে এতক্ষণে মুখ ফেরায় দেবজিৎ । ফিরিয়েই আঁতকে ওঠে , “ একি ! ! ! কি হয়েছে তোমার”? মুখ ফিরিয়ে অহনা কে দেখে বলে ওঠে দেবজিৎ । অহনার ঠোঁটের কোন থেকে রক্ত পড়ছে , কপাল ফুলে কালশিটে পড়ে গেছে । শাড়ি ও অবিন্যস্ত, হাত ও ফুলে আছে , কোনমতে পা ঘষটে আরেকটু এগিয়ে আসে অহনা ।
– “দাদা, যেমন করে হোক আমায় বাঁচান”।
– “আরে কি হয়েছে বলবেতো? তোমার এমন অবস্থা কিভাবে হল, কে করলে? আমাকে কেউ কিছুই বলনি তো”।
– এতদিন আমি কিছুই বলিনি আপনাকে । বড় মুখ করে ভাই এর বৌ করে এনেছিলেন আমায় । আপনি বছরে একবার ছুটিতে বাড়ি আসেন, আমি সেজন্য কিছুই বলিনি আপনাকে, বলার ছিলই বা কি ! এতো আমার রোজকার ঘটনা । কিন্তু আজকে আমার সাথে সাথে আরেকটা প্রাণ ও যে বিপন্ন, তাই এসে দাঁড়িয়েছি” ।
– “কিন্তু তোমার এই দশা করলো টা কে” ?
– “ আপনার ভাই”
– “ ছি ছি , আমিতো ভাবতেই পারছিনা ! ! ! হিমু টা এত নীচে নামতে পারে ! এভাবে নিজের স্ত্রী র গায়ে কেউ হাত ওঠায় ? ? ? আর মা জানেনা ? ? কই মাও তো কিছুই বলেনি আমায়। তুমি বলছো তুমি প্রেগন্যান্ট , সেটা জানে ও ? ” ।

– “ সেটা জানতে পেরেই তো মারলো দাদা , ওর ধারণা এই সন্তান ওর নয়, আর মা কেও ও ধমকে রাখে, যাতে আপনাদের পরিবারের কেউ কিছুই জানতে না পারে । আর মা তো এমনিতেই শান্ত মানুষ, আপনাদের দুজনকে কোনোদিনই ডাক দিয়ে কথা বলেননি” ।

– “কতদিন ধরে চলছে এসব ? আমি তো কিছুই জানিনা এসবের, তুমি এ বাড়িতে এসেছো, তাও তো চোদ্দো বছর হতে চলল । আমি যখনই বাড়ি আসতাম তুমি খুব একটা আমার সাথে কথা কোনোদিন ও বলতে না । আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে, যেকোন কারনেই হোক, তুমি আমায় অপছন্দ কর তাই আমায় এড়িয়ে চল” ।

– “ না দাদা, আপনাকে এড়িয়ে চলার কারন অন্য। আমি চিরকালই আপনাকে দাদা হিসেবেই দেখে এসেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি আপনার যত্ন করতে বা কথা বলতে পারিনি, কারন আপনার ভাই আমায় সন্দেহ করতো, আপনাকে জড়িয়ে । সেই যেদিন থেকে শুনেছে আপনার মায়ের কাছে, যে আপনি আমায় বৌ করে এই বাড়িতে আনতে চেয়েছিলেন । কিন্তু এতে আমার কি দোষ বলতে পারেন ? প্রতিদিনই আমার মৃত বাবা মা তুলে গালাগাল, প্রতিদিনই মারধোর, আবার কখনো নৃশংস পশুর মতো আমার দেহ টা ছিঁড়ে ফেলে । আমি কি অপরাধ করেছিলাম বলুন দাদা , কোন পাপের এই শাস্তি পাচ্ছি আমি” ।

– “ কিন্তু তোমরা তো দুজনে দুজনকে ভালোবাসতে ? তাইনা” ! !

– “না তো দাদা , কে বললো এমন কথা আপনাকে!”

– “আমি নিজের চোখে দেখেছি তোমাদের ঘনিষ্ঠ ভাবে”।

– “সেটা আপনি একদিন ই দেখেছেন দাদা নিশ্চই, কারন একদিনই আপনার ভাই আমাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেছিল, আমাকে দেখেছিলেন কী ? আমার দিক থেকে কিছুই ছিল না । আমরা একসাথে পড়তামই শুধু । ভালোবাসার সম্পর্ক আমাদের ছিলনা । আমি আসতাম রোজ আপনাদের বাড়ি, কিন্তু তার কারন অন্য ছিল, আমি আসতাম একটু পড়াগুলো বুঝে নিতে, আপনার ভাই এর কাছে । আমরা কলেজে একসাথে পড়তাম, আর আপনার ভাই ই বলতো আসতে, কারন ওর অনেক টীচার ছিলো, সেই নোট গুলো ও আমায় দিতো, বদলে ওর সব নোট আমি করে দিতাম , কলেজের প্রোজেক্ট ও । আমার দাদা তো টিউশনির ব্যবস্থা করতে পারেনি, আমার বাবা ও ছিলনা । যাঁকে আমি বলতে পারি । কখনো আপনিও দেখিয়ে দিয়েছেন পড়া । আপনাদের সাহায্য পেয়েই আমি গ্রাজুয়েট হতে পেরেছি। কিন্তু তারপর আর পড়তে পেলাম কই । আপনিও মিলিটারি তে জয়েন করলেন । আপনার ভাই তো তারপর এম কম করলো, চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পড়ল । আজকে কত বড়ো চাকরি ও করছে” ।

– “কিন্তু তোমার মনে আছে ? সেই যেবার আমি ছুটিতে এসেছিলাম, সেই যে বছর তোমাদের বিয়ে দিলাম । মা ছিলো না বাড়িতে, মাসির বাড়ি গেছিলো মাসতুতো বোনের বিয়ের জন্য । আমি এসে হটাৎ ই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম । তখন ই তুমি এসেছিলে, আমায় অসুস্থ দেখে আমার অনেক সেবা যত্ন করেছিলে, তারপর খবর দিয়েছিলে মা কে , খবর পেতে মা ও চলে আসে। সেই তখন ই আমি মা কে বলেছিলাম, মেয়েটাকে কতদিন ধরে দেখছি, ওর বাবা ও নেই । মন টা খুব নরম, যত্ন করতে পারে, আমার মায়ের একজন অবলম্বন হবে । বুড়ো বয়েসে মা সেবা যত্ন পাবে, সেই আশায় তোমায় এ বাড়ির বৌ হিসেবে আনতে চেয়েছিলাম । তারপরই চোখে পড়লো হিমু তোমায় কিস করছে । তাই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম যে তোমরা দুজনে দুজনকে ভালোবাসো । তাই তখনই তোমাদের বাড়িতে কথা বলে তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করলাম” ।

– “না দাদা, হিমাদ্রী কোনোদিন ই আমায় ভালবাসেনি । ওটা ওর সেই মুহূর্তে র মোহ ছিলো । ভালবাসা ছিলনা । কিন্তু বিয়ে হবার পর মেনেও নিয়েছিল, কিন্তু কোন এক সময়ে আপনাদের মায়ের মুখে আপনার বৌ করে আনার ইচ্ছের গল্প শোনার পর থেকেই এই অত্যাচার চলছে । ওর ধারনাই হয়ে গেছে যে আপনার সাথে আমার কোন অনৈতিক সম্পর্ক আছে । আমি হাজার চেষ্টাতেও সেটা মুছতে পারিনি । কিন্তু তাও আমি মানিয়ে চলছিলাম, আমারতো ফিরে গিয়ে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিলনা । প্রায় রাতেই হিমাদ্রী অত্যাচার চালাতো নৃশংস ভাবে , নিজের স্বামী হবার অধিকার ফলাতো আমার এই শরীরের ওপর । তারপর ও এত বছর আমার কোন সন্তান আসেনি। হয়তো ঈশ্বরের ই কৃপা, এত বছরে বাদে আমার সন্তান আসতে চলেছে, কিন্তু এটা গতকাল রাতে জানার পরই ও আরো হিংস্র হয়ে উঠেছে। ও কোনোভাবেই এই সন্তান কে আসতে দিতে চায়না । এখানে থাকলে আমি আর আমার সন্তান কেউই বাঁচবো না দাদা” ।

– “তা ওর কি ধারণা ? এটা আমার সন্তান? এত বছরেও নিজের স্ত্রী কে চিনলো না, নিজের দাদা কেও না ! ! তুমি ভয় পেও না অহনা, কিছু একটা ব্যবস্থা আমি করবো ই” ।

কুড়ি বছর পর :

– কার্শিয়াং এর পাহাড়ের কোলে ছোট্টো বাড়িতে ………

– “ জেঠুউউ তুমি এসেছো ? কত্তদিন ধরে অপেক্ষায় থাকি” জোরে ডাকতে ডাকতে ঢোকে অয়না , নর্থবেঙ্গল মেডিক্যাল এর সেকেন্ড ইয়ার এর ঝকঝকে স্টুডেন্ট, গলা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, “এবারে আমাদের বাড়ি থাকবে তো, এখন কিন্তু বড়ো বাড়ি আমাদের। সেই ছোটবেলা থেকে বলে এসেছো, তোদের তো ছোট্টো বাড়ি, আমি থাকলে আঁটবে না । ছোটবেলায় বিশ্বাস করতাম, পরে বুঝতাম তুমি জেঠু বলে, আমার মা কে বদনামের হাত থেকে বাঁচাতে চাও । কিন্তু দ্যাখো এখন তো আমি বড়ো হয়েই গেছি । আমি সব জানি ও । আমি মায়ের কাছে সব জেনেছি জেঠু । কিভাবে তুমি মাকে বাড়ি থেকে বার করে এনে আমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলে । এখানে সবার নাগালের বাইরে রেখে কিভাবে নতুন করে মাকে পড়াশোনা করতে সাহস যুগিয়েছো, মাকে নিজের ও আমার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে দিয়েছ, মা তোমাকে নিজের দাদার আসনে বসিয়েছে জেঠু । মা বলে, ‘ দাদার জন্যই আজ আমি সি.এ হবার স্বপ্ন কে ছুঁতে পেরেছি’ । এখন আমাদের বাড়িতে তিন তিনটে ঘর ও আছে। এখনো কি তুমি থাকবে না”?

– “ থাকবো রে বাবা থাকবো । আমিও তো বুড়ো হয়েছি, নাকি । পাকা বুড়ি হয়েছিস একটা মিঠুরে । তোর মাকে দেখছি নাতো, অহনা কোথায়” ?
– “ এখন মা! তুমিও না জেঠু, মাতো এখন চেম্বারে, ইয়ার এন্ডিং চলছে না ! ! মা এখন নাওয়া খাওয়ার সময় পাবে নাকি” ॥