অভিনয় আমার কাছে সব – বৃন্দা মুখার্জী

ছোটবেলায় গ্রুপ থিয়েটার করতাম , পাশাপাশি নাচ ও অভিনয় করে বড় হয়েছি। যদিও বাবার আপত্তি ছিল আমার অভিনয় করা নিয়ে । কিন্তু এই অভিনয়ের জন্য আমাকে পুরোপুরি সাহায্য করেছে আমার মা । আজ আমি যে স্থানে রয়েছে তাই একমাত্র আমার মায়ের জন্য । ২০১০ সালে অডিশন দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় আমার অভিনয় যাত্রা । কিভাবে সেই অভিনয় যাত্রা শুরু হল । সেই শুরুর উত্তর খুঁজতে অভিনেত্রী বৃন্দা মুখার্জীর মুখোমুখি সংবাদ টুডের এডিটর আয়ুষ রায়

IMG-20190818-WA0012

প্রঃ আপনার ফিল্ম জার্নি কি ভাবে শুরু?

উঃ আমার জার্নি বলতে ফার্স্ট আমি যে কাজ করেছি সেটা হচ্ছে ‛গেম’ মুভিতে, আমি ছোট একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। তারপরে সাধক বামাক্ষ‍্যাপাতে মায়াপরীর চরিত্রে কাজ করেছিলাম। শ্রী ভেনকাটেশ ফিল্মস থেকে কিছু পরে একটা অফার আসে, সেটা হচ্ছে ‛ঠিক যেন লাভ স্টোরি’ সিরিয়ালে হিয়ার চরিত্রতে ছিলাম আমি। ওটা খুবই ইম্পরট্যান্ট একটা ক্যারেক্টার ছিল। তার পরে আস্তে আস্তে ‛মা দুর্গাতে’ রানী সুমিত্রার চরিত্রটা করি। এর পর থেকে আমি সম্পূর্ণ ভাবে ব্লুস প্রোডাকশনে চলে আসি। ব্লুসে ‛রাখি বন্ধন’ দিয়ে শুরু। ওখানে লুসির চরিত্রটা করেছি, ওটা খুব ইম্পরট্যান্ট চরিত্র বা যেটা থেকে বলা যায় মানুষ আমাকে আস্তে আস্তে চিনতে ও ভালোবাসতে শুরু করলো। তারপর আমি করি ‛হৃদয়হরণ বিয়ে পাস’ সিরিয়ালে লালির চরিত্রটা, সেটাও একটা সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। তার পর ‛ঠাকুমার ঝুলিতে – সোনার কাঠি রুপোর কাঠি’ গল্পতে পরীর চরিত্রটা করি। এখন আমি সান বাংলাতে একটা কাজ করছি, নতুন একটা প্রজেক্ট আসছে যেটা ব্লুস প্রোডাকশনের প্রজেক্ট, ওখানে আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছি একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে।

প্রঃ জীবনে প্রথম কখন মনে হল অভিনয় জগতে আসা উচিত?

উঃ আমি ছোটবেলা থেকে গ্রুপ থিয়েটার করতাম, আমি কত্থক নিয়ে ডিপ্লোমা করেছি, তাই নাচ ও অভিনয়ের সাথেই আমি বড়ো হয়েছি। প্রফেশনালী আমি এটাই বরাবরই নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অভিনয় নিয়ে প্রফেশনে বাবার ভীষণ আপত্তি ছিল। কারণ আমি এম বি এ কমপ্লিট করেছি, বাবাই এটা করতে বলেছিলেন, যেহেতু বাবা নিজে সরকারি চাকরি করতেন তাই চেয়েছিলেন আমিও যেন পুরোপুরি ভাবে চাকরি করি, অভিনয় নয়। আমি অভিনয় করতে ভালোবাসি, আমি ঠিক করেছিলাম যে ভাবেই হোক করতে হবে, অনেক সময় পড়াশোনা চলাকালীন লুকিয়ে লুকিয়ে অডিশন দিতে যেতাম। অডিশন আমি দিতে শুরু করি ২০১০ সাল থেকে, যেটা আমার বাবা জানতেন না। আমার মা আমায় ভীষণ ভাবে সাহায্য করতেন, আজকে আমি এই স্থানে মায়ের জন্যেই এসে পৌঁছেছি। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে আমি একটা ভালো কিছু সুযোগ পেয়েছি কিন্তু পড়াশোনা আর পরীক্ষার ক্ষতি হবে বলে বাবা করতে দেননি। কিছু সময় আমি চুপ চাপ হয়ে গিয়েছিলাম, শুধু নাচ আর অভিনয় চর্চা করতাম। তার পর একসময় ফাইনালি হটাৎ আমি ‛গেম’ মুভির অফার পাই, সেখান থেকেই প্রথম কাজ শুরু করি। তখনও বাবা আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু তার পর থেকে আস্তে আস্তে অনেক কাজ করার পর এখন বাবাও মেনে নিয়েছেন। আমার অভিনয়ের কাজ দেখে এখন বাবা আমায় খুবই সাপোর্ট করেন।

প্রঃ কোন ডিরেক্টরের সাথে আগামী দিনে কাজ করার ইচ্ছে আছে বা প্রিয় পরিচালক কে?

উঃ এখন সবাই আমার সিনিয়র, প্রত্যেকেই এক এক জন গুণী মানুষ। তাই প্রত্যেকের সাথেই আমার কাজ করার ইচ্ছে আছে। যেমন এখনকার ফিল্মের মধ্যে শিবু দার সব ফিল্ম আমার খুব ভালো লাগে, ভীষণ ভালো গল্পের ওপর ফিল্ম করছেন। কমলেশ্বর মুখার্জী, সৃজিত মুখার্জীর মতন পরিচালকের ফিল্ম আমার ভালো লাগে, এনাদের সাথে কাজ করা আমার কাছে একটা স্বপ্ন।

প্রঃ ঠিক যেন লাভ স্টোরি, মা দুর্গা, রাখি বন্ধন এবং হৃদয় হরন সিরিয়ালে আপনার চরিত্র নিয়ে যদি কিছু বলেন?

উঃ ‛ঠিক যেন লাভ স্টোরি’ সিরিয়ালে আমাকে ডাকা হয়েছিল তারপর লুক সেট হল, লুক সেটে এপ্রুভ হয়ে গেলাম। এই সিরিয়ালে হিয়ার চরিত্রটা খুবই ভালো একটা চরিত্র ছিল। ঐ সিরিয়ালে হিরোর চরিত্রে ছিলেন নীল ভট্টাচার্য্য। ওনার বিপরীতেই আমি ছিলাম। আমার সাথে ওর বিয়েটা হবার কথা ছিল চরিত্র অনুযায়ী। কিন্তু লিড হিরোইনের সাথে বিয়েটা হয়েছিল অবশেষে। এটাই ছিল আমার চরিত্র, খুবই ইম্পরট্যান্ট আমার চরিত্রটা ছিল। ওটা সত্যই আমার মনে রাখার মত।

‛মা দুর্গা’ সিরিয়ালে আমি রানী সুমিত্রা, রামায়ণের ট্রাকে রাজা দশরথের ছোটরানীর ভূমিকায়, ভাল চরিত্র ছিল।

‛রাখি বন্ধনের’ লুসির চরিত্রটা করতাম। ওটা সিরিয়ালে আমার ছিলো একটা ট্র‍্যাক এসেছিল সার্কাসে। লুসি নামে সার্কাসেরই একটি মেয়ে, সার্কাস করত। বন্ধন যে ছিল, সে ওই টাইমে সার্কাসে এসে যোগ দিয়েছিল। সিরিয়ালে বন্ধনের যে জার্নিটা দেখানো হয়েছে, সেখানে লুসির অনেকটা ভূমিকা ছিল।

‛হৃদয় হরনে’ সিরিয়ালে লালীর চরিত্রটা করতাম। ওটা খুব ইম্পর্টেন্ট একটা চরিত্র। একটা মেস বাড়ির ট্র‍্যাক। সেখানে অনেক মেয়ে ছিল। লালীও তাদের মধ্যে একটা চরিত্র খুব ফানি চরিত্র। ওখানে সারাক্ষণ মজা হতো।

প্রঃ আগামী দিনে ওয়েব সিরিজ বা শর্ট ফিল্ম করার ইচ্ছে আছে?

উঃ এখন তো শর্ট ফিল্ম বা ওয়েব সিরিজ খুব ভালো ভালো হচ্ছে, যদি ভালো স্টোরির অফার পাই অবশ্যই করবো। আমি ভালো কাজ করতে চাই, যেই কাজে মানুষের ভালোবাসা পাবো ও সবাই আমায় মনে রাখবে আগামী দিনে।

প্রঃ অভিনয় জগতে এসে কোন দিন কোন বাধা প্রাপ্ত হতে হয়েছে, নাকি জার্নিটা একেবারেই সহজ ছিল?

উঃ যে মানুষটার গাইডেন্স জীবনে সব থেকে বেশি পেয়েছি, যার জন্য আপনি ভেবেছেন যে আমারও ইন্টারভিউ করা যেতে পারে, তিনি হলেন দাদা স্নেহাশিস চক্রবর্তী। উনি না থাকলে আজ আমি এখানে থাকতাম না। আমি আজ যা কিছু করেছি তা’ ওনারই জন্য। না হলে আমি সম্পূর্ণ হারিয়েই যেতাম। একটা সময় এমন এসেছিল, যখন আমি ভাবতে শুরু করেছিলাম যে আমি কি আর এই প্রফেশনে থাকতে পারবো? আমার মনে একটা প্রশ্ন এসেছিল। সেই জায়গা থেকে উনি আমাকে তুলেছেন। কোনভাবেই কোন জায়গা থেকে কিছু হচ্ছিল না, লম্বা একটা গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল। আমার পরিবারের ব্যাপারেও মানসিক ভাবে আমি খুব সমস্যায় ছিলাম। সেই জায়গা থেকে উনি আমাকে সাহায্য করেন। আমাকে খুব ভালো একটা চরিত্রে কাজ দেন ও অভিনয়ে সুন্দরভাবে গাইডও করেন তিনি।

প্রঃ যেসব চরিত্র আসে কাজের ক্ষেত্রে সেগুলো কি সবসময় পছন্দের হয়?

উঃ হ্যাঁ, মাঝে মাঝে বেশ কিছু চরিত্র এসেছে, যেগুলো মনে হয়েছে যে এই চরিত্রে অভিনয় করলে মন থেকে আরও শেষ হয়ে যাব। আমার ঠিক পছন্দ হয়নি। আমার বয়সে মানানসই নয়। আমাকে বয়েস বাড়িয়ে কাজ করতে বলা হতো। কেন আমি সেটা করবো? অভিনয় জগতটা আমি খুব ভালোবাসি। আমি এম বি এ করেছি, তবু এই জগত ছেড়ে, স্টুডিও ছেড়ে আমি থাকতে পারি না। যে চরিত্র ভালো লাগবে না, তা করবো কেন। আমি তো চিরদিনের জন্যই এই জগতে এসেছি। শুধু টাকার জন্যই অভিনয় করি না আমি, ভালোবাসি অভিনয়।

IMG-20190818-WA0011

প্রঃ মঞ্চে নাটকের অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি কিছু বলেন?

উঃ থিয়েটার আমি করেছি। বিধাননগর গ্রুপ থিয়েটারে অনেকদিন আমি ছিলাম। তখন থেকেই অভিনয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। যতটা সোজা মনে হয় দেখলে, ততটা সোজা নয় থিয়েটার। অভিজ্ঞতা ভালোই। থিয়েটার ও স্ক্রিনে তফাৎ আছে অনেকটাই।

প্রঃ ঐতিহাসিক ও গোয়েন্দা জাতীয় ঘটনার ওপরে কোন চরিত্র করতে ভালো লাগে?

উঃ অবশ্যই, আমার স্বপ্ন যে ঐ ধরনের চরিত্র। পেলে দারুণ হবে। যোধা আকবর এর যোধা আবার রানী পদ্মাবতী ধরনের চরিত্র ভীষণ ভাল লাগে। কারণ বাস্তবে আমি একজন প্রতিবাদী চরিত্রের মেয়ে, তাই ঐ ধরনের বা পুলিশ অফিসারের চরিত্র খুব ভালো লাগে।

প্রঃ পূজো সামনে আসছে, কি প্ল্যানিং আছে?

উঃ আমি খুব শপিং করতে ভালোবাসি, খেতেও ভালোবাসি। শপিং সারাবছরই চলে আমার। ভিড় ঠেলে ঘুরতে পারি না, পুজোয় বন্ধুদের সঙ্গে খুব আড্ডা হবে, খাওয়া-দাওয়া তো হবেই। তবে হ্যাঁ, তার আগে একটা ভালো কাজ হলে খুব ভালো হয় এটাই ইচ্ছে।

প্রঃ আপনার প্রিয় খাবার কি?

উঃ পোলাও আর মটন কষা আমার খুব প্রিয়।

প্রঃ এতো ব্যস্ততার মধ্যে শরীরের যত্ন কিভাবে নেওয়া হয়?

উঃ বাইরের খাবার খাওয়া হয়ে যায় বন্ধুরা সঙ্গে থাকলে। তবে একা খাই না বাইরের খাবার। আসলে ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলতে চাই। যোগাসন করি। হেলথ টিপস হিসাবে বলা যেতে পারে – বাইরের ফাস্টফুড না খাওয়া উচিত।

প্ৰঃ ব্লুশ প্রোডাকশন হাউস সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন?

উঃ দাদা স্নেহাশীষ চক্রবর্তী প্রোডাকশন একা চালান। কোথায় কি হচ্ছে, স্ক্রিপ্ট, গান, সিন কোথায় কি হবে, একটা পিন পড়া পর্যন্ত সর্বত্র ওনার খেয়ালে থাকে। এখন ওনার পাঁচটা সিরিয়াল চলছে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একাই প্রোডাকশন চালাচ্ছেন উনি।

প্রঃ পরবর্তী কি কাজ হতে চলেছে?

উঃ সান বাংলায় সিরিয়াল আসছে, শুটিং চলছে, সবে শুরু হয়েছে। আমি ওই পরিবারের সদস্য, বোন হয়েছি।