লেখক ও দানবীর মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ

আয়ুষ রায়

বিশেষ সংগঠক, সাংবাদিক, লেখক, সমাজসেবী হিসেবে সুপরিচিত কালীপ্রসন্ন সিংহ। ২৪ জুলাই, ১৮৭০ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি তাঁর বিশাল অবদান ও ভূসম্পত্তি পিছনে ফেলে রেখে পরলোক গমন করেন।

কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার সুবিখ্যাত কায়স্থ ‛সিংহ’ পরিবারে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪০ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন নন্দলাল সিংহ। তাঁর পিতামহ জয়কৃষ্ণ সিংহ ছিলেন হিন্দু কলেজের একজন পরিচালক। দেওয়ান শান্তিরাম সিংহ ছিলেন উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর জমিদার। তাঁরই বংশোদ্ভূত ছিলেন বাবু কালীপ্রসন্ন। কালিপ্রসন্নের মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা মারা যান। বাবু হরচন্দ্র ঘোষ, যিনি নিম্ন আদালতের বিচারক ছিলেন, পিতার মৃত্যুর পর কালীপ্রসন্নর অভিভাবক হিসাবে নিযুক্ত হন। ধনী ও অভিজাত পরিবারের মতো কালীপ্রসন্নও ইংরেজ শিক্ষক এবং দেশীয় খ্যাতনামা পন্ডিতদের নিকট শিক্ষালাভ করেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্যে দুই অমর অবদানের জন্য চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন। যেমন, বৃহত্তম মহাকাব্য ‛মহাভারতের’ বাংলা অনুবাদ এবং ‛হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা’। তিনি ঊনবিংশ শতকের একজন বাংলা-সাহিত্য আন্দোলনে অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

কালীপ্রসন্নের খুব অল্প বয়সেই বহুগুণে গুণান্বিত বুদ্ধিমত্তা ও সাংগঠনিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটে। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’। এখানে সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে মিলিত হয়ে নিয়মিত প্রবন্ধ উপস্থাপন ও আলোচনা করতেন। এই সভাতে বিধবাবিবাহ এবং অন্যান্য সংস্কার আন্দোলনের কাজ কর্ম চলতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়ে বিধবা র্বিবাহ প্রবর্তনের লক্ষ্যে বেঙ্গল কাউন্সিলে আবেদনপত্র পেশ করার জন্য কালীপ্রসন্ন তিন হাজারেরও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। বিধবাবিবাহ আইন পাস হলে তিনি বিধবা-বিবাহকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজ তহবিল থেকে এক হাজার টাকা পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করেন। বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তনের জন্য মাইকেল মধুসূদন দত্তকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে এই সভা। নীলকরদের নিপীড়নমূলক আচরণ উদ্ঘাটনে অবদানের জন্য রেভারেন্ড জেমস লং-কেও তাঁরা সংবর্ধিত করেন। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ (১৮৬০) নাটক অনুবাদের অভিযোগে জেমস লঙের এক মাসের কারাদন্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা হলে (২৪ জুলাই ১৮৬১) কালীপ্রসন্ন তা পরিশোধ করেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তার উপন্যাস সেই সময় (Those Days) লেখার সময়, প্রতীকী হিসাবে কালিপ্রসন্ন চরিত্রের পুনঃনির্মাণ করে নবীনকুমার নামে সমকালিক চরিত্রের অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়েছেন।

কালিপ্রসন্ন ১৮৫৪ সালে বাগবাজারের লোকনাথ বসুর কন্যার সঙ্গে বিবাহ করেন, কিন্তু কয়েক বছর পর তাঁর স্ত্রী বিয়োগ হয়। কিছুদিন পরে, কালিপ্রসন্ন রাজা প্রসন্ন নারায়ণ দেবের নাতনী এবং চন্দ্রনাথ বসুর কন্যা শরত্‍কুমারী দেবীকে বিবাহ করেন।

কালিপ্রসন্নের অসংযত ব‍্যয় সমাজের কল্যাণে নিবেদিত ছিল, যার জন্য তাঁর শেষ দিন তাকে মাশুল দিতে হয়েছিল। এটা বলা হয়ে থাকে যে এক মহাভারতের কতিপয় প্রতিলিপি বিতরণের জন্যেই ঐ সময়ে তাঁকে আড়াই লাখ টাকার বিপুল আর্থিক ধাক্কা মেনে নিতে হয়েছিল। এটি জানা সত্বেও যে জমিদার পরিবারের প্রধান আয়ের উত্‍স কৃষকদের দেওয়া রাজস্ব থেকে আসে, কালিপ্রসন্ন একজন জমিদার হয়েও, কৃষকদের মঙ্গলের জন্য এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং বেশ কিছু কৃষককে রাজস্ব বোঝা থেকে মুক্তি প্রদান করেছিলেন। তাঁর শেষের দিনগুলিতে, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে কী বিশাল ঋণে পতিত হয়েছেন, এবং ফলস্বরূপ উড়িষ্যার বড় জমিদারি ও কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব বিক্রি হয়ে যায়। তিনি বন্ধু ও আত্মীয়দের দ্বারাও প্রতারিত হন।

কালিপ্রসন্ন কোন সমস্যা হওয়ার আগেই মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর স্ত্রী বিজয় চন্দ্র সিংহ-কে দত্তক নেন, যিনি হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকাটি অধিগ্রহণ করেন।

কালীপ্রসন্নর অকাল মৃত্যুতে তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। তাই আজকের এই দিনটিতে তাঁকে স্মরণে আসে।