হোলি কি পিচকারি

আয়ুষ রায়

“খেলুঙ্গি হোলি, খাজা ঘর আয়ে,
ধন ধন ভাগ হামারে সজনী,
খাজা আয়ে অঙ্গন মেরে’।”

ত্রয়োদশ শতকে আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫) হোলি উৎসব নিয়ে লিখেছেন উপরিউক্ত ছন্দ।

হিন্দু সমাজের বহু ধর্মীয় উৎসব আদি কাল থেকে প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তীকালে ইসলামের আগমন ঘটে ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে ভারতে। ফলে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারার বহু উত্থান-পতন ঘটেছে। ব্যবসা ও সামাজিক প্রয়োজনে ভারতীয় উৎসবের সঙ্গে সকলেই এক হবার চেষ্টা করেছে, আকর্ষিত হয়েছে। ধর্মের কথা ভুলে বিভিন্ন উৎসব, বিশেষ করে রাধা-কৃষ্ণের হোলি উৎসব সবার মনেই রঙ লাগিয়েছে, যেন এক অন্তরে লীন — তা’ বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকেই জানা যায়।

images (19)

উল্লেখযোগ্য, সম্রাট আকবর ভীষণ উৎসাহী ছিলেন রঙের উৎসব হোলিকে নিয়ে। হোলিতে অসংখ্য জলাধার তৈরী করে রঙিন জলে পূর্ণ করতেন। তখনকার চিত্রশিল্পীদের আঁকা চিত্রতে প্রমাণিত হয় রং খেলার ধরণ। জানা যায়, মুঘল সম্রাটরা লালকেল্লাতে বিরাট ভাবে হোলি উৎসব করতেন, ঈদের মতোই। নাচ-গান-বাজনা প্রদর্শন হতো, প্রচুর মানুষের ভিড়, রঙিন ফুলের বৃষ্টি ঝরানো হতো — ঈদ-ই-গুলাবি। সম্রাটের হাত থেকে পুরস্কারও পাওয়া যেত।

muglon-ki-holi

মোগল যুগের অনেক তৈলচিত্রে সম্রাট জাহাঙ্গীরের হোলি খেলার দৃশ্য অঙিত হয়। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীর – এ হোলির আনন্দ ও আলোক মালায় সজ্জিত পথঘাটের বিবরণ পাওয়া যায়। চিত্রশিল্পী গোবর্ধন ও রশিকের চিত্রে জাহাঙ্গীর ও বেগম নূরজাহানের সঙ্গে হোলি খেলার দৃশ্য আছে। সম্রাট শাজাহানও হোলির উৎসব নিয়ে মেতে উঠতেন। অনেক চিত্রে সেইসব পাওয়া যায়।

১৭৩৭ সালে ভূপাল সিং এর অঙ্কিত চিত্রে সম্রাট মহম্মদ শাহ – র হোলি খেলা ও উৎসবের দৃশ্য পাওয়া যায়। নবাব আলীবর্দী, বাংলার দেওয়ান শাহামত জঙ্গ মতিঝিলের বাগানে সাত দিন ধরে বিরাট আনন্দ উৎসব করতেন, বাসন্তী পঞ্চমীতে যোগ দিতেন।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা ইংরেজদের হাত থেকে কলকাতা বিজয় শেষে হোলির আনন্দ করে ছিলেন ফিরে এসে।

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে দোল ও হোলিতে নৃত্য-গীত-আবিরে রঙিন হয়ে উঠে আজও। বীরভূমের ‘শান্তিনিকেতনে’ বসন্ত উৎসব পালিত হয়, বিশ্ব জানে। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আগাম বসন্ত উৎসব পালিত হয়। মন রাঙানো এই উৎসবের কত নাম — ফাগুয়া, দোলযাত্রা, বসন্ত পঞ্চমী, কামায়ন, হোলি। এই উৎসব মিলনের দিন।