সঙ্গীতাচার্য্য শ্রী সুবিনয় রায় এর শুভ জন্ম দিনে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারনা করলেন তাঁরই সুযোগ্যা শিষ্যা রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী জয়তি ভট্টাচার্য্য ।

কোলকাতা, সুমন ভূঞ্যাঃ-  আজ ৮ই নভেম্বর। সঙ্গীতাচার্য্য সুবিনয় রায় এর শুভ জন্ম দিন। তাঁরই সুযোগ্যা শিষ্যা রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী জয়তি ভট্টাচার্য্য তাঁর স্মৃতিচারন করলেন এবং সংবাদ টুডের ওয়েব পোর্টালে মাধ্যমে তুলে ধরলেন সেই স্বর্ণালী সময়ের টুকরো টুকরো কিছু ছবি। আর তাঁর মুখোমুখি আমাদের প্রতিনিধি সুমন. ….

দিদি আজতো সঙ্গীতাচার্য সুবিনয় রায় এর জন্ম দিন। আপনার সঙ্গীত গুরু। সঙ্গীত জগতের গুরু। আমি বা আমরা সৌভাগ্যবান যে তাঁরই সুযোগ্যা শিষ্যার মুখো মুখি বসে তাঁর কথা শ্রবন করবো। এটা আমাদের মতন সাধারন শ্রোতাদের কাছে পরম প্রাপ্তি।আজকের দিনে কি ভাবে স্মরন করেন তাঁকে, আপনার সঙ্গীত সাধনায় তাঁর প্রভাব কতখানি, তাঁর কথা যদি কিছু বলেন…..

“সুবিনয় রায় এক সুধানির্ঝর ”

সেটা ১৯৭৭ সাল ! কলকাতার নেহরু চিলড্রেন্স মিউসিয়াম কমিটি আয়োজিত একটি সঙ্গীত মেধা অন্বেষন প্রতিযোগিতায় নাম নথিভুক্ত করিয়েছি। আমি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী । বিষয় -রবীন্দ্রসঙ্গীত । গেয়ে শোনাতে হবে ”হৃদয়নন্দনবনে” গান খানি । গান আমার জানা নেই,শিখতে হবে । সেই বয়সের তুলনায় বেশ কঠিন সুর এবং তালের গান । ঠিক সেই সময়ে as ill luck would have it , আমার তখনকার শিক্ষিকা শ্রীমতি মীরা মুখোপাধ্যায় কঠিন অসুখে শয্যাশায়ী হলেন । আমি পড়লাম ঘোর সঙ্কটে । কে আমাকে শেখাবেন ওই গান ? এই চরম বিপদে ত্রাতার ভূমিকায় নামলেন আমার মাসী শ্রীমতি লাবণ্য চক্রবর্তী । ওনার সংগ্রহে ওই গানের রেকর্ড ছিল শ্রী সুবিনয় রায় এর গাওয়া । সেই গান শুনে শুনে গান তৈরি করে যথানির্দিিষ্ট দিনে হাজির হলাম প্রতিযোগিতা কেন্দ্রে ।

একটা বড় হলঘরের বন্ধ দরজার বাইরে অপেক্ষা করছে আমারি মতন আরও অনেক প্রতিযোগী, হলঘরের ভিতরে যিনি বিচারকের আসনে বসে আছেন, কানাঘুষোয় শুনতে পেলাম তিনি স্বয়ং শ্রী সুবিনয় রায়। সেই শুনে আমার মা আমার কানের কাছেে ফিসফিস করলেন,”ঘাবড়ে যেও না, গানটা ভালই গাইছ”। আমার মনে তখন কৈশোরের অদম্য সাহস,মনে মনে বললাম, ঘাবড়াব কেন ? গানটা শিখেছি তো ওনার রেকর্ড শুনে শুনেই, ভুল গাইবার অবকাশই নেই । যাইহোক,একসময়ে আমার ডাক পড়ল,ভিতরে গেলাম, মেঝেতে হারমোনিয়াম, তবলা, খোল বড়মুখের তবলা ইত্যাাদি,তবলাবাদক বসে আছেন । মধ্যমনি হয়ে বসে আছেন আমার সুরের ঈশ্বর শ্রী সুবিনয় রায় । বললেন,”বোসো” । আমি ওনার পা দুখানি ছুঁয়ে প্রণাম করে হারমোনিয়ামের সামনে বসলাম । ইশারায় উনি গান শুরু করতে বললেন । আমি আমার সমস্ত প্রাণটুকু ঢেলে দিয়ে শুরু করলাম,”হৃদয়নন্দনবনে”। যাঁকে একলব্যের মত অনুসরন করি তিনি আমার সামনে বসে আমার গান শুনছেন, এই সুযোগ কেউ নষ্ট করে ? আমার সেরাটুকু দিতেই হবে ।

গান একটু এগোতেই লক্ষ্য করলাম, উনি আর তবলাবাদক চোখাাচুখি করছেন আর মৃদু হাসছেন,আমি আর অনাদের দিকে তাকালাম না,দুুচোখ বুজে গান শেষ করলাম,গান শেষ হতেই উনি জিজ্ঞেস করলেন,”গান টা কার কাছে শিখেছ ?”বুকের ভেতরের অদম্য্ সাহসে ভর করে আমার চটজললদি উত্তর,”আপনার রেকর্ড থেকেে”। আবার দুজনের দৃষ্টিবিনিময় , আবার দুজনের হাসি।

আসলে হয়েছিল কি, রেকর্ড শুনে গান শিখতে গিয়ে কম বয়েসের আবেগের বশবর্তী হয়ে ওনার গানের prelude, interlude,এমনকি গানের সঞ্চারির পরে সংক্ষিপ্ত interlude নেবার ওনাার যে নিজস্ব স্টাইল তার সবটুকু আমি নকল করেছিলাম ।

আমার স্মার্ট উত্তর শুনে উনি আমাকে কাছে ডেকে মাথায় হাত রেখে বললেন, ”খুব ভাল গেয়েছ, ভাল করে গান শেখ, হারিয়ে যেও না, তুমি বড় হলে তোমার সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে,এমনভাবে গান শেখ যেন দেখা হয়”।। আমাকে তখন পায় কে ? আমার ঈশ্বর আমার গান শুনে বললেন আবার দেখা হবে ।। যেন দুটো ডানায় ভর করে বাইরে এলাম,মাকে সব বললাাম ,দেখলাম মায়ের চোখের কোণ চিকচিক করছেে ।।

এরপর থেকে শুরু হল এক সাধনার পথে চলার শুরু । স্বপ্ন সরনী বেয়ে এগিয়ে চলা ! স্বপ্ন একটাই, ওনার কাছে শিখতে যাওয়া,কিন্তু তার জন্য তো নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে,শুরু হল সেই প্রস্তুতি । দীর্ঘ সাধনার পথ, যখন যাব,নিরাশ হয়ে ফিরতে রাজি নই আমি ।এই প্রস্তুতি পর্বে ভাগ্যের ইশারায় পৌঁছে গেলাম শ্রীমতি সুচিত্রা মিত্রের কাছে, সেও এক আসাধারন পথ পাড়ি দেওয়া , গভীর সাধনা , যেন আমার ঈশ্বরের কাছে যাবার পথ। দীর্ঘ ৯/১০ বছর পর অবশেষে ওনার কাছে পৌঁছনোর একটা সুযোগ এসে গেল,গিয়ে হাজির হলাম । ‘৭৭ সালের সেই ঘটনার কথা বললাম,সব শুনে উনি বললেন, ”সেদিনের সেই রোগা পাতলা মেয়েটিকে আবছা মনে আছে,সেদিনের তুমি আর আজকের তুমি কি এক,?”অফিসঘরেই বসে একটা গানের অল্প খানিকটা শুনলেন,খালি গলায়, শুনে বললেন সামনের সপ্তাহ থেকে এস। এবার নতুন করে শুরু হল আমার স্বপ্নপুরনের উৎসব ।

অসম্ভব রসিক সুরেলা একজন মানুষ, সত্ত্যিকারের ভালমানুষ,স্নেহশীল,জীবনের প্রতি পল সুরে সুরেই কাটান,বলা ছলে চেইন স্মোকার,কিন্তু কি অবাক কাণ্ড অত সিগারেট কন্ঠের কন ক্ষতি করতে পারেনি গান গেয়ে উঠলেই মনে হয় আমরা গাইব না, ছুপ করে বসে শুনি,সেই করতে গিয়ে আবার বকুনিও খেতাম।”তোমরা কি আমার গান শুনতে এসেছ ?”

প্রথম যেদিন ক্লাসে গেলাম, একখানা খুব শক্ত ব্রহ্মসঙ্গীত শেখাচ্ছেন,” নিত্য সত্যে চিন্তন করো রে বিমল হৃদয়ে”…। আমাকে বললেন,”এই গান নিয়ে তুমি bother কোরোনা, গানটা শেখান হয়ে গেছে।। আমি মনে মনে বললাম, এত সুন্দর গান ,bother তো করতেই হবে,সেই গান আজ ৮ই নভেম্বর ওনার জন্মদিনের উৎসবে গাইব।এ আমার পরম পাওয়া,এই গান ই হবে প্রনাম।।

রসিকতা বোধ ছিল আতি সুক্ষ । উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রীটের এক খুব পুরনো বাড়ির দোতলার ঘরে ক্লাস নিতেন, এক দিন ক্লাসে গিয়ে দেখি সিলিং এর এক বড় অংশ ভেঙ্গে পড়েছে,ভয় পেয়ে মেয়েরা সবাই ঘরের অন্যদিকে সরে ভিড় করে বসে আছে । অন্যদিক একেবারে খালি,উনি ঘরে ঢুকেই এক পলক দেখে নিয়ে গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করলেন,” ওইদিকের density of population এত বেশি কেন ?”

সুক্ষ রসিকতা বোধ,অসাধারন আত্মসম্মান বোধ,শিষ্য শিষ্যাদের প্রতিও যথাযথ গুণের কদর,এমনিতে মাটির মানুষ,প্রয়োজনে রাগ দেখানো, মাত্রা বজায় রেখে বকুনি,গান ভাল গাইলে,সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কার । এই ছিলেন আমাদের সুবিনয়দা, আমাদের মাস্টারমশাই ! ৫/৬ মাস টানা অনেকগুলো গান শেখানো হয়ে গেলে একবার করে পরিক্ষা নেবার নাম করে সবার গান শুনতেন।। পরিক্ষা শেষ হলে সবাইকে একে একে অফিস ঘরে ডেকে, কার গানে কি ভাল লেগেছে, কার কি ভুল, কিভাবে সেই ভুল ঠিক করা যাবে,সমস্ত সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতেন । কিন্তু গান শুনতে চাইলেে কেউ যদি বলত গলা ভাল নেই,গাইতে পারব না,খুব বিরক্ত হতেন,নরম অথচ দৃঢ় কন্ঠে জিজ্ঞেস করতেন, গাইতে পারবে না,তাহলে এসেছ কেন? খুব সঙ্গত প্রশ্ন।। রাগের আমন ধরন দেখে আমি গলা খারাপ থাকলেও কোনদিন বলিনি, খারাপ গলাতেই গেয়েছি,।।এমনভাবে একবার আমার গান শুনে বল্লেন,আমাকে,”তোমার কন্ঠখানি বেশ,style of singing khub bhalo, keep it up” কোনো কথিন গান তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারলে কি সহজে ,কি অনায়াসে,কি অকপটে বলতেন,”গানটা তোমরা নিজগুনে শিখে নিলে,আমার কোনো credit নেই । শুনে আমরা লজ্জা পেতাম , উনি তখন হাসতেেন । কথায় কথায় ইন্রেজি শব্দ বলতেন,প্রায়ই বলতেন,”শীতকালে বেশি করে গান গাইবে, music makes body temperature”।।………..শীত,গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ জানিনা, শিল্পী আপনার গানের কন্ঠ,উদার সুর, শব্দের উচ্চারন শ্রোতার হৃদয়ে আজো নির্ভুল ভাবে উষ্ণতা দান করে ।। লহ প্রণাম !!

ধন্যবাদ দিদি। সংবাদ টুডে নিউজ পোর্টালের তরফ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে । তাঁর অনেক অজানা কথা আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য। আমরা ভাগ্যবান যে তাঁরই সুযোগ্যা শিষ্যার মুখ থেকে তা শুনতে পাওয়ায় । সংবাদ টুডে পরিবারের তরফ থেকে অসংখ্য শুভেচ্ছা জানাই। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন।