শিষ্যার স্মৃতিতে মুখর তার গুরুকথা।

সুচিত্রা মিত্র (19 সেপ্টেম্বর,1924 – 3 জানুয়ারী, 2011) ছিলেন একজন প্রথিত যশা ও স্বনামধন্য ভারতীয় বাঙালি কন্ঠ শিল্পী | রবীন্দ্র সংগীতের একজন  অগ্রগন্য গায়িকা ও বিশেষজ্ঞ | আজ তার 94 তম জন্ম দিন | সংবাদ টুডে নিউজ পোর্টালে তাঁকে নিয়ে স্মৃতিচারন করলেন তাঁরই অত্যন্ত স্নেহের, প্রিয় শিষ্যা, যোগ্য উত্তরসুরী এবং বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী জয়তী ভট্টাচাৰ্য্য……

রবিতীর্থের বড় হলঘর , রবিবার বিকেলে আমরা মাত্রই গুটিকয়েক গানপাগল আর আপনাকে ভয় পাওয়া মেয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি । সেই বিকেলে ক্লাসে উপস্থিতির হার বোধহয় ২০ % । দূরদর্শনে সেদিন উত্তমকুমারের ”নায়ক”! আপনি গাড়ি থেকে নামলেন , সিঁড়ি বেয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিমায় অফিসঘরে ঢুকলেন । স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই হলঘরের দরজা খুলে আমাদের দেখে নিয়ে বললেন,”যারা আজ আসেনি তাদের জন্য উত্তমকুমার,আর যারা এসেছ তাদের জন্য আজ সুচিত্রা মিত্র লাইভ ” বলে একটু হেসে হারমোনিয়ামটা টেনে নিলেন ! কত গান যে শুনিয়েছিলেন সেদিন !

বেশ অনেকবছর আগের কথা, আপনার স্মৃতিচারনা আপনার নিজের মুখে, সেটা ভুলি কি করে ? তখনো আপনি মিত্র হন নি, তখন আপনি মুখুজ্জ্যে, অর্থাৎ সুচিত্রা মুখোপাধ্যায় । তখন আপনি বিশ্বভারতীর সঙ্গীতভবনে, আপনার সতীর্থ অনেকের মধ্যে একজন মোহর (কণিকা বন্দোপাধ্যায়) আর একজন শ্রীমতি অরুন্ধতি দেবী (অভিনেত্রী )! আপনি মিষ্টি খেতে বড় ভালোবাসতেন, নিজেই বলেছেন, গুড়ের কলসিতে চুমুক দিয়ে গুড় খেতেন,সেই কথা জেনে বা শুনে বা দেখে সঙ্গীতাচার্য শ্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদার মহাশয় আপনাকে বলেছিলেন,” তোর গলায় দেখবি পিঁপড়ে ধরে যাবে !”
একবার আপনারা তিনসখী,” কণিকা-সুচিত্রা-অরুন্ধতি” গান শোনাবার জন্য আমন্ত্রিত হলেন শান্তিনিকেতনের কোনো একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তির বাড়িতে ! গান শুরুর আগে থরে থরে মিষ্টি এল থালা সাজিয়ে,কণিকাদি লাজুক মুখে বললেন,” এখন নয়, গানের পরে ।” অরুন্ধতিও স্বল্পভাষী,ইশারায় বললেন ”পরে খাওয়া ”! আপনি মিষ্টির লোভনীয় হাতছানি অবহেলা না করতে পেরে কামড় বসালেন , চকোলেট কেকে !
এবার গান , কে আগে গাইবেন ? সুচিত্রা ! গান শুরু করলেন আপনি,”পথে যেতে ডেকেছিলে মোরে ” কিন্তু……. চকোলেট কেক তখন আপনার কণ্ঠকে জব্দ করেছে, গলা ধরে গেছে ।বাকি দুই সখী সেদিন দারুণ গেয়ে জলযোগ সেরে ……. ফিরতি পথে আপনি চোখের জল মুছতে মুছতে
দুই সখীর কাছে মৃদু বকুনি খেলেন,” আগে কেক নয়,আগে গান !” আপনি বললেন,” আগে বললি না কেন ?” দুই সখীর ঝঙ্কার,”বলব কেন ?”

আরো একটা দিনের ঘটনা, সেই দিনটা ছিল রবিবার সকাল, আগের সপ্তাহে শেখানো বিদ্যাপতির পদ, রবিঠাকুরের সুরে ”এ ভরা বাদর মাহ ভাদর ” আমরা গেয়ে শোনাচ্ছি, গান যত এগোচ্ছে….আপনার ভ্রুযুগল কুঞ্চিত, ফর্সা মুখটা থমথম করছে, রাগে গনগন করছে, গান হচ্ছে না, …..”বিদ্যাপতি কহে কৈছে গোঙায়বি হরি বিনে দিন রাতিয়া”……. আমাদের গান গান হচ্ছে না….. স্বরলিপির যান্ত্রিক উচ্চারন হচ্ছে….. কিছুই হচ্ছে না….. থামিয়ে দিলেন আমাদের….. অনেক করে বোঝালেন আমাদের….. ”হরিবিনে দিনরাতিয়া”…… সে কেমন…. বোঝাতে বোঝাতে আপনি অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন…… আপনার কান্নার ছোঁয়া আমাদেরও সবার মধ্যে চারিয়ে গেল….. লজ্জায় কাঁদছি…… চোখের জল ঝরছে তখনো,গেয়ে উঠলেন…….”……হরিবিনে দিনরাতিয়া”! শিহরন জাগল আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে…… সে কি আকুতি….. আবার জলের ধারা দুচোখে…আমার চোখে…. সবার চোখে…..গাইতে বললেন, আমরা পারলাম না…..গলা বুজে এসেছে যে !! ” নাঃ আজ তোদের দ্বারা হবে না,কেঁদেই ভাসাচ্ছিস,তোদের আবেগ শুধু চোখের জলে, এই জল শ্রোতার চোখ থেকে নামাতে পারলে তবে বুঝবি গান হল ! চল তোদের একটু মিষ্টি খাওয়াই, বড্ড বকাবকি করলাম আজ !”
মিষ্টি সেদিন জুটেছিল অঢেল, সেনমহাশয়ের…..!! প্রায়ই জুটত….বকুনি followed by মিষ্টি !
#শুভ জন্মদিন#