“লড়াইটা কিন্তু কঠিন, সহজ নয় ” – শঙ্করলাল চক্রবর্তী

সামনেই রাখা ‘ব্ল্যাক টি’। চা টা বেশ কড়া হলেও সামনে বসে থাকা মানুষটা কিন্তু একদম কড়া নন। তা সে মাঠেই হোক বা বাড়িতে, কিংবা অচেনা মানুষের সাথে। তার মতে রেগে যাওয়া কোনো সমস্যার সমাধান না। তিনি আর কেউ নন টাটা একাডেমি থেকে উঠে আসা সেই মিড ফিল্ডার তথা এই বারের কলকাতা লিগ জয়ী মোহন বাগানের হেড কোচ শঙ্কর লাল চক্রবর্তী।
“প্রত্যাবর্তনের সম্রাট “…. না এই উপাধি তাকে প্রত্যক্ষ ভাবে না দেওয়া গেলেও, পরোক্ষভাবে নি:সন্দেহে বলা যায়। হ্যাঁ, এভাবেও ফিরে আসা যায়। ১৯৯৭ র ২রা আগষ্ট ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলতে নেমে চিমা ওকোরির একটা টাফ ট্যাকল তার জীবনে অভিশাপ ডেকে আনে। এরপর থেকে যতবারই মাঠে নেমেছেন ভাগ্য তার সহায় হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিজের ব্যার্থতা মেনে খেলা ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু হারিয়ে গেলেও তার রক্তে থাকা ফুটবলের নেশা তাকে হারতে দেয়নি। তাই তিনি খেলার জীবন না হলেও আইএফ এর কোচিং এর লাইসেন্সটা তার অর্ধাঙ্গিনীর কথায় করিয়ে রাখেন। তারপরই তার ভাগ্য ফেরে। ফোন আসে মোহন বাগান দফতর থেকে। প্রথমে ডেপুটি হিসেবে কাজ করেন। এখন তিনি হট সিটে। দীর্ঘ ৮ বছর পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে মোহন বাগান প্রেমীদের জন্য এনে দিলেন কলকাতা লিগের ট্রফি। আর এবার তো সামনেই আইলিগ। কতটা প্রস্তুত তার দল? আরও নানান বিষয়ে মুখ খুললেন মোহন বাগানের হেড কোচ শঙ্কর লাল চক্রবর্তী আমাদের  সংবাদ টুডের প্রতিনিধি নন্দিনী দে এবং সৌমিত্র চক্রবর্তীর কাছে। শুরু হল ‘ব্ল্যাক টি’ র সাথে আড্ডা।
* আপনি তো টাটা একাডেমির ছাত্র ছিলেন। এবছরে মোহন বাগান দলে টাটা একাডেমি থেকে কে কে খেলছে?
উ: আমি ১২ বছর ধরে টাটা একাডেমির সাথে যুক্ত আছি। সম্প্রতি নতুন কোন ছেলে আসেনি। তবে দুবছর ধরে খেলছে সৌরভ দাস।
* আপনি তো খেলা শুরু করেছিলেন মিড ফিল্ডার হিসেবে। তো মোহন বাগানের এই বছরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিড ফিল্ডার কে?
উ: (অসংশয়ে) সৌরভ দাস। তাছাড়াও পিন্টু মাহাতো, কিনোওয়াকি, মিল্টন. ডি. সিলভা, অভিনাশ রুঅয়াইডাস।
* কলকাতা লিগে যে সমস্ত দল খেললো, তাদের মধ্যে সেরা মিড ফিল্ডার কে আপনার মতে?
উ: সৌরভ দাস।
* যদিও কারোর সাথে কারোর তুলনা চলে না, আপনি তো সঞ্জয় সেন এবং সুভাষ ভৌমিকের ডেপুটি হিসেবে কাজ করেছেন। দুজনের কাজ করার পদ্ধতিটা যদি বলেন।
উ: সুভাষ দা যেমন একটু বেশি ট্যাকটিকালি স্ট্রং, কেয়ারফুলি প্ল্যানড। না হারার একটা প্রবনতা আছে ওনার। অন্যদিকে সঞ্জয় দা খুব এগ্রেসিভ। সুভাষ দা যেমন প্লেয়ারদের মধ্যে ঢুকে যায়। ‘কী করছিস, কী খাচ্ছিস, নাইট আউট করছিস কী না’। এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে প্লেয়ারদের লাইফস্টাইলে ঢুকে যায়। কিন্তু সঞ্জয় দা এই এগুলোর মধ্যে নেই। মাঠে যেটা হচ্ছে সেটা।
* মোহন বাগানের এসিস্ট্যান্ট কোচ এখন হট সিটে। এটা কেমন উপভোগ করছেন?
উ: এটা খুব ইনজয় করছি। আমি চাপ নিতে খুব ভালোবাসি। কারণ আমি মনে করি চাপেই সেরাটা আসে।
* দীর্ঘ ৮ বছর পর আরও একবার বাঙালি কোচের হাত ধরে মোহন বাগান কলকাতা লিগ জিতল। এই বিষয়ে কী বলবেন?
উ: এটা ভালো লাগছে। আগের বছর অল্পের জন্য জিততে পারেনি মোহন বাগান। এই অনুভূতিটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তবে ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে সাফল্যটা এসেছে সেটা কোনো ব্যাক্তিগত সাফল্য নয় কিংবা গোটা টিম অর্থাৎ যে ১১ জন প্লেয়ার খেলছে শুধুমাত্র তাদেরও নয়। এই সাফল্য সবার। এই সাফল্য হল রিজার্ভ বেঞ্চে যেসব প্লেয়ার বসে আছে, কোচিং সাপোর্টিং স্টাফ এবং মিডিয়ার। একটা টোটাল টিমের পেছনে টিম। আমরা যেটাকে বলি ‘টিম বিহাইন্ড টিম’। যদি টোটালটা সাকসেস হয় তাহলে সাকসেস রেটটা বেশি হয়।
* কলকাতা ময়দানে এখন বিদেশী কোচের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। বাঙালি কোচের ওপর কেন এত অনীহা?
উ: না শুধু কলকাতায় না, সারা ভারতবর্ষেই এটা। আইএসএল এও এখন বিদেশী কোচ বেশি দেখা যায়। অনেক সময় দেখা যায় ঘরকা মুরগী ডাল বরাবর। এটা ঠিক যে ফুটবলে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের বিদেশী কোচের দরকার। আমাদের আরও শিক্ষিত করা দরকার। কিন্তু সেই মানের যদি বিদেশী আসে তাহলে অলওয়েজ ওয়েলকাম।
* আপনার টিমে এই বছরের সেরা আবিষ্কার কে?
উ: পিন্টু মাহাতো। জঙ্গলমহলের ছেলে। গতবার সুযোগ না পেয়ে চলে যেতে হয়েছিল ওকে। আটকে দিয়েছি। ও যদি চলে যেত তাহলে বাচ্ছা ভেবে আবার আটকে দিত। সুযোগ দিয়েছি ওকে। ও এই সুযোগের সদ ব্যাবহারও করেছে ও ওর খেলার মাধ্যমে। ইচ্ছে না থাকলে তো আর খেলাতে পারতাম না।
* পিন্টু মাহাতোর খেলা কেমন লাগে?
উ: খুব ভাল। এবং ওকে এটা আরো ইম্প্রুভ করতে হবে। কারণ আইলিগ আরও কঠিন লড়াই। আরও স্ট্রেনথ, স্ট্যামিনা, শক্তির লড়াই।
* সামনে তো আইলিগ, প্রস্তুতি কেমন চলছে?
উ: প্রস্তুতি শুরু করেছি গত সপ্তাহ থেকে। এখনও দুই তিন জন প্লেয়ারের আসা বাকি আছে। ওভারওল ঠিক আছে।
* এই টিম নিয়ে আইলিগ জয়। কতটা আশাবাদী আপনি?
উ: ১০০%। তবে কঠিন। এটা এমন একটা খেলা যেখানে তুমি ঘরেও খেলছ আবার বাইরেও খেলছ। কোথাও ঠান্ডা তো কোথাও গরম। এই জিনিস গুলোর সাথে যত তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিতে পারব তত সাফল্য পাওয়া যাবে।
* কলকাতা লিগের রানার্সআপ দল পিয়ারলেস আইলিগে অংশগ্রহণ করছে না। এই সম্পর্কে কী বলবেন?
উ: এরা সেকেন্ড ডিভিশন খেলতে পারবে। সেখানে আবার কতগুলো টার্মস এন্ড কন্ডিশন আছে। সেগুলো ওদের আবার ঠিক করতে হবে। তবে তারা আইলিগ খেলতে পারবে।
* ইস্টবেঙ্গলের স্প্যানিশ কোচতো আপনাকে সহকারী হিসেবে চেয়েছিল। আপনি গেলেন না কেনো?
উ: কারণ আমার তো জব সিকিউর এখানে। আমাকে তো ক্লাব দায়িত্ব দিয়েছে। সেটা ছেড়ে আমি কেন কারোর অধীনে যেতে যাব। যেখানে আমি একা দায়িত্ব পেয়েছি।
* এই বছরে আইএসএল – এ সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন কে আপনার মতে?
উ: সেটা বলাটা খুব কঠিন। সবে তিন চারটে খেলা হয়েছে। এই সমস্ত লিগগুলোতে উত্থান পতন যেকোনো সময় হতে পারে। এই যে সেদিন বার্সেলোনা হারল, রিয়াল মাদ্রিদ হারল। এটাই লিগের মজা।
* এই প্রথমবার এটিকে পরাজয় দিয়ে আইএসএল -এ নিজেদের অভিযান শুরু করল। আপনার কী মনে হয় এটিকে এইবার আইএসএল-এ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে?
উ: এখন কিন্তু ঘুরে দাড়াচ্ছে এটিকে। একটায় হেরে ওরা এলার্ট হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই কোচ আরো সতর্ক হয়ে গেছে। যখন এতগুলো খেলা এখনও বাকি তখন একটা হার বা একটা ড্র তে কিছু এসে যায় না।
* ইষ্টবেঙ্গলের মেহতাব হোসেন তো এখন মোহনবাগান পরিবারের সদস্য। তার চোট কতটা গুরুতর? তাকে কী আইলিগে খেলতে দেখা যাবে?
উ: ও প্র‍্যাক্টিস করছে। আর কিছুদিন পরই হয়ত হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়া হবে।
* এই বারের আইলিগে তো আমরা স্প্যানিশ মস্তিষ্ক বনাম বাঙালি মস্তিষ্কের লড়াই দেখতে পাব। লড়াইটা কতটা কঠিন?
উ: ইষ্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে যিনি এসেছেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ক্লাব থেকে তিনি। এটা ঠিক যে তাদের যে চিন্তাভাবনা, স্টাইল, বিচারবুদ্ধি আমাদের থেকে অনেক উপরে। এটা একটা কঠিন লড়াই সহজ নয়।
* যদিও ফুটবল একটা দলগত খেলা। তবুও মোহন বাগান দল থেকে আপনার ব্যাক্তিগত কোন পছন্দের প্লেয়ার আছে?
উ: না আমি টিম টাকে যেভাবে পরিচালনা করি সেখানে পিন্টু মাহাতো ( জুনিয়ার প্লেয়ার) এবং দিপান্ডার ডিকা ( সিনিয়র প্লেয়ার) দুজনের সাথেই আমার ব্যাবহার এক। একজন জুনিয়ার বলে তাকে কথা শোনাব আর একজন সিনিয়র বলে সন্মান করব, ওটা ঠিক হয় না। আর এগুলো করলে দলে একটা বৈষম্যতার ছায়া চলে আসে।
* ১৩০ কোটির দেশ হয়ে বিদেশী কোচ থাকা সত্তেও ভারতবর্ষ বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। আপনার কী মনে হয় কোথায় খামতি থেকে যাচ্ছে?
উ: খামতি আমাদের গ্রাসরুটে। সারা বিশ্বের রিপোর্ট বলছে একটা বাচ্চার বয়স যখন ৫-৬ তখন তাকে খেলাধূলায় পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তারপর তাদের নার্সিং করা উচিত। তাই গ্রাসরুটটা সবার আগে ধরতে হবে। এখন যেসমস্ত সিনিয়র প্লেয়াররা আছে তাদেরকে দিয়ে আর হবে না। কারণ তাদের স্ট্রেনথ, স্ট্যামিনা আর বাড়বে না। তাই নীচ থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এখন ইউথ এ অনেক কাজ হচ্ছে। অল্পের জন্য বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারল না।
* ১৯৯৭ র ২রা আগষ্ট ইস্টবেঙ্গলের সামনে মোহন বাগান। চিমা ওকোরির একটা টাফ ট্যাকল শঙ্কর লাল চক্রবর্তীর জীবনে অভিশাপ বয়ে আনল। তারপর থেকে যতবারই মাঠে নেমেছেন চোট আপনাকে আপনার খেলা খেলতে দেয়নি। তখনতো নিশ্চয়ই ফ্রাসট্রেশন হয়েছিল?
উ: ২রা আগস্ট। কলকাতা লিগের চোটটা পেয়েছিলাম। তারপরে আবার লাগল। হ্যাঁ, এটা চরম হতাশা। আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে। ছোট বেলায় এই ফুটবল খেলেই টাকা রোজগার করতাম। পড়াশোনা করার সেভাবে সুযোগ পায়নি। তাই আমার চোটের ফলে বাড়ির আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। আস্তে আস্তে চোট সারিয়ে আবার মাঠে ফেরার চেষ্টা করি।
* যখন এই চোট আপনার খেলার জীবন ছোট করে দিল, তখনই কি ভেবেছিলেন কোচ হিসেবে দাপট দেখাবেন?
উ: না আমার বন্ধু সুভাষ চক্রবর্তী ইস্টবেঙ্গলের অনেক বড় ভক্ত। ওর সূত্রেই আমার চাকরিটা হয়। তখন চাকরি আর বাড়ি নিয়েই সময় কেটে যেত। তারপর প্রেমে পড়ি যিনি এখন আমার বর্তমান স্ত্রী। সাধারণত আমরা দেখি বিপদের সময় কেউ পাশে থাকে না। তখন ও দেখি আমার সাথে মিশতে শুরু করি। আমার ওকে ভালো লাগতে শুরু করল। ওই আমাকে ইনসিস্ট করল কোচিং এর জন্য লাইসেন্স করিয়ে রাখতে। কিন্তু আমি একেবারেই তখন সহমত পোষণ করিনি। তখন ও বলল কোচ হতে হবে না, লাইসেন্সটা করিয়ে রাখো। তো ঈশ্বরের এতটাই কৃপা যে যখন আমি সি পাশ করলাম তখন মোহন বাগানে চাকরি পেয়ে গেলাম। যখন ডি পাশ করলাম আইএফএ তে চাকরি পেলাম। আর যখন এ পাশ করলাম তখন সুভাষ ভৌমিক আমাকে ডেকে নিল।
* পূজো নিয়ে কী চিন্তাভাবনা রয়েছে?
উ: পূজোতে ফুল প্র‍্যাক্টিস। প্লেয়ারদেরকে বলে দিয়েছি নিয়ম মেনে চলতে। ৮দিন অলরেডি ছুটি দিয়ে দিয়েছি।
* অন্যান্য দলের সাথে খেলার তুলনায় যখন ডার্বি খেলেন তখন কী বেশি টেনশন হয়?
উ: টেনশন নয়। অঙ্ক কষতে হয়। ওই দলের কী দুর্বলতা আছে, কী কী স্ট্রেন্থ আছে সমস্ত কিছু। সেগুলোকে ধরে প্লেয়ারদের নামাতে হয়। দেখে মনে হয় টেনশন, কিন্তু না অঙ্ক কষতে হয়।

আইলিগের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ হয় এই সাক্ষাৎকার পর্ব। হঠাৎই মনে পড়ল সামনে রাখা ‘ব্ল্যাক টি’ টাতে এখনও চুমুক দেওয়া হয়নি। উনি এবার আমাদের বললেন ‘এবার খাওয়া যাক’।

IMG-20181007-WA0029