মাতৃ রূপেন সংস্থিতা

 

শরৎকালের এক সন্ধ্যায় কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকার বর্তমান যান্ত্রিক ব‍্যস্ততার যুগে পূর্বের ন‍্যায় সাবেকিয়ানার ছোঁয়াতে কিভাবে পুরাতনকে নতুন সাজে সজ্জায় অলংকৃত করা যায়, সেটি ঘোষ পরিবারের কর্তা শৈলেন ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী কাকলী ঘোষকে দেখলে বোঝা যায়, শান্ত প্রদীপ্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সাক্ষাৎ অন্নপূর্নার অন‍্য এক রূপ। একদিকে সংসার, অন‍্য দিকে কর্তার অসুস্থতার কারনে ব‍্যবসার হাল ও ধরেছেন।এ যেন জীবন্ত ‘দশভূজা’।
এইরকম একজন প্রভাবশালী শিল্পপতির অর্ধাঙ্গিনী হওয়া সত্বেও কি সহজ সরল ভাষায় এবং অতুলনীয় ব‍্যবহারের অধিকারিণী। সাধারণত এরকম খুবই কমই দেখা যায়। কাকলী ঘোষের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় সংবাদ টুডের তিন প্রতিনিধি হেমশ্রী বিশ্বাস, রুমি সরকার ও শর্মিষ্ঠা সরকার।

IMG-20180925-WA0006

কিভাবে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে একা হাতে করে আসছেন দেবী দূর্গার অকাল বোধন। শুধু তাই নয় কাকলী দেবী এর সঙ্গে একটি মহৎ কাজও করেন, প্রতি বছর উনি দুস্থ অনাথ শিশুদের ভোজন ব‍্যবস্থা ও পূজোর জামাকাপড় বিতরন করেন‌। তবে এই বছর সেই পরিকল্পনার কিছুটা রদ বদল করেছেন কাকলী দেবী। আমরা তুলে ধরবো তারই কিছু চিত্র আপনাদের সামনে।

প্র.বৌদি এই দূর্গাপূজা কত বছর ধরে উৎযাপন করছেন, এবং এই পূজার শুরু কার হাত ধরে?

উ.এই পূজা ১৪ বছর ধরে চলছে, আমিই প্রথম শুরু করি এই পূজা আমার বাড়িতে।

প্র.বাঙালির বড় উৎসব দূর্গোৎসব, এই পূজার আচার বিধিও তেমনি বড় ও সময় সাপেক্ষ, আপনি গৃহবধূ হয়ে কি ভাবে সামাল দেন?

উ. (একটু হেসে) আরে ঝামেলা বলে মনে করলেই ঝামেলা, আমি ভীষণ ভালোবেসে করি মায়ের পূজা। আমি সারা বছর ধরে প্রতিমাসে ১০০০ টাকা করে পূজা উপলক্ষে আলাদা করে জমিয়ে রাখি। যদিও এটি খুবই কম (হাসলেন) আসলে কর্তাই সমস্ত ব‍্যয় করেন যেহেতু আমি গৃহবধূ তাই। ঐ সংসার খরচ থেকে কিছুটা আলাদা করে রাখি। আর তুমি শুধুমাত্র পুজোটাই দেখছো? আমি দূর্গা মায়ের ভোগ থেকে শুরু করে পূজার উপকরন সবই নিজের হাতে করি নিজেই রান্না করি। একে বারে ৬টা ওভেন জ্বেলে। আর কর্তা যেহেতু অসুস্থ ব‍্যবসা ও আমাকেই দেখতে হচ্ছে। আমার কাছে এটা তেমন একটা কষ্টসাধ‍্য কাজই নয়।

প্র.মহালয়া থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় এক এক জায়গাতে নিয়মগুলি ভিন্ন ভিন্ন হয়, আপনাদের পূজো কিভাবে শুরু হয়?

উ.আমার পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় পূজার ২মাস আগে থেকেই। প্রতিমা বায়না দিতে নিজেই যাই কুমারটুলিতে। পূজা আমার বাড়িতে বৈঠকখানায় হয়, ৬ফূটের প্রতিমা। তারপর ধরো পূজার সরঞ্জাম মহালয়া থেকে কিনতে আরম্ভ করি, কলকাতার সেরা মিষ্টি রসগোল্লা, বাগবাজার থেকে নিই, বোঁদে আমি বাড়িতে বানাই, দশকর্মা মায়ের শাড়ি, রূপসজ্জা সবই নিজে হাতে কিনি, আর নিজের সঞ্চয় থেকে ধিরে ধিরে মায়ের গহনা ও বানিয়ে নিয়েছি সোনার। তার পর আত্মীয়দের জন‍্য জামাকাপড় কেনা আমিই করি, সহকর্মীরা সহায়তা করে। মহালয়া থেকেই নিরামিষ রান্না শুরু হয়ে যায়। যেটা দশমীর পর ভঙ্গ হয়। পঞ্চমীতে কলা বউ স্নান দিয়ে আচার বিধি শুরু হয়, আমার বাড়ির পূজাতেও আমি তাই করি।

download3b8f00e0_2fWhatsApp_2fMedia_2fWhatsApp_20Images_2fIMG-20180925-WA0004

 

প্র : পূজোতে আপনার সঙ্গে আর কে কে সহযোগিতা করেন , পাড়া প্রতিবেশীর প্রভাব কেমন ?

উ : ( একটু হেসে ) এতো বড়ো পূজো তো আর একা সামলানো যায় না । তাই পূজোতে আমার বাড়ির আত্মীয় – স্বজনও যথেষ্ট সাহায্য করে । এই পূজোটাকে ওরাও নিজের বাড়ির পূজোই মনে করে আমার সঙ্গে হাতে – হাত মিলিয়ে কাজ করে । এমন কি পাড়া প্রতিবেশীও প্রতিবছর আমার বাড়ির এই পূজোর অপেক্ষায় থাকে । কোনো সংকোচ না করেই তারা সকলে মিলে মুক্ত মনে আনন্দের সাথে আমার বাড়ির এই পূজোটাকে আরো সাফল্যময় করে তোলে ।

প্র.শুনেছি বৌদি আপনাদের এই বাড়ির পুজোতে দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে অনাথ শিশু দের এনে খাওয়ানো হয় ও তাদের জামাকাপড় দেওয়া হয় এটা কি প্রতি বছর দেওয়া হয় ও কত জনকে দেওয়া হয়?

উ.হ্যাঁ, আমরা প্রত্যেকবারই পুজোতে অনাথ ছেলে মেয়েদের খাওয়ায় এবং তাদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিয়। কিন্তু এবার যারা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন তাদের জন্য এই সব ব্যবস্থা করেছি।কারণ আমার মনে হয় তারা ভীষণ অসহায়, এবং পূজোর আনন্দে সামিল হওয়ার অধিকার তাদেরও আছে। আমাদের এখানে প্রায় ৫০ জন অনাথ শিশুকে জামাকাপড় দেওয়া হয়। তবে এবার সেই প্রথার একটু পরিবর্তন করেছি।এই বছর আমি একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ‘অনাথ মা বাবা’ দের আমন্ত্রন করেছি, মায়েদের জন‍্য শাড়ী আর বাবাদের জন‍্য ধুতি পাঞ্জাবী।

IMG-20180925-WA0005

প্র : নবমীর দিন এর ব্যস্ততা কাটিয়ে বিজয়ার সিঁদুর খেলার জন্য নিজেকে কী ভাবে তৈরী করেন?

উ : পূজোর কটা দিন বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় । দশমী মানেই মায়ের বিদায় বেলা । সত্যি বলতে ঐদিন মায়ের মুখ দেখলে কান্না আসে, দশমীর সকাল থেকেই সকলের মনটা খারাপ থাকে । আর সন্ধ্যেবেলায় দেবী বরণ আর মিষ্টি মুখ দিয়েই শেষ হয় বিজয়া দশমী । প্রথমে দর্পন বিসর্জন দিয়ে শুরু হয় অন্তিম প্রস্তুতি। তার পর সিন্দুর খেলা চলে, সকলে অপেক্ষায় থাকে আগামী বছরের পূজোর জন্য ।

শত ব্যাস্ততার মাঝে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ বৌদি।আপনার পূজা আরো বড় হোক,সাফল্যমণ্ডিত হোক, সেই সঙ্গে আপনি দশভূজার মতো আপনার ব্যাবসাও একই রকমভাবে দেখভাল করুন, আপনি একইভাবে এগিয়ে চলুন আমরা সংবাদ টুডে পোর্টালের তরফ থেকে এই কামনা করি।