বয়স যত বাড়ছে নিজের প্রাপ্য সন্মান থেকে ততই বঞ্চিত হচ্ছি” – রমেন রয় চৌধুরী।

টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা রমেন রয় চৌধুরীর একান্ত সাক্ষাৎকারে সংবাদ টুডের প্রতিনিধিরা।

ঘড়িতে তখন বিকেল ৫:৩০ টা। গীতাঞ্জলি স্টেশন থেকে কিছুটা হেঁটে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের কাছে নতুন ধাঁচের একটি ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটের একতলার দরজাটা খোলাই ছিল। ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল দিদি নং ওয়ান দেখতে ব্যাস্ত কর্তা গিন্নি। হ্যাঁ এই পরিস্থিতিতেই ছিল তখন বাংলা সিনেমার প্রখ্যাত অভিনেতা রমেন রয় চৌধুরীর বাড়ি। তিনি আর তার স্ত্রী নাকি নিয়মিত ‘জয়ী’ সিরিয়ালটি দেখেন। জিঙ্গাসা করায় বলেন ‘এই সিরয়ালটা এখন খুব ভালো হচ্ছে’। তাদের এই টিভি দেখার মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি ঘটিয়েই শুরু হল রমেন রয় চৌধুরীর সাক্ষাৎকার।  সাক্ষাৎকারে- নন্দিনী দে, বেবী চক্রবর্তী।

* ১৯৭৯ সালে সবুজ দ্বীপের রাজা আর ১৯৮০ সালে বাঞ্ছারামের বাগান। বাংলা সিনেমায় আপনার পথ চলা শুরু অনেকদিন আগে। এই পথ কতটা মসৃণ ছিল?
উ: খুব একটা মসৃন ছিল না আবার সেরকম ভয়ংকর ও ছিল না। ১৯৭৯ সালে সবুজ দ্বীপের রাজায় আমি প্রথম পরিচিতি পাই কারন ছবিটা খুব চলেছিল। তবে বাঞ্ছারামের বাগানে আমার চরিত্রটা খুব ছোটো ছিল। সেই সময়ে বাংলা ইন্ড্রাস্ট্রিতে কালো ছায়া নেমে আসে উত্তম কুমার চলে যাওয়ায়। খুব খারাপ পথে চলে যায় বাংলা ইন্ড্রাস্ট্রি। তখন কাজ পেতে খুন অসুবিধে হয়। তো সেই সময় একটু কষ্ট হয়েছে। তখন যাত্রা, প্রফেশনাল থিয়েটার করে চালিয়েছি। সত্যি কথা বলতে দরজায় দরজায় ঘুরে কাজ নেওয়াটা আমার খুব প্রয়োজন হয়নি। সেই দিক থেকে আমার ভাগ্য আমার সাথেই ছিল। এখনও পর্যন্ত নয় নয় করে ২৫০-৩০০ টা ছবিই হয়ে গেল। বহু দাপুটে পরিচালকের সাথে কাজও করেছি। তপন সিনহা, মৃনাল সেন, হরনাথ চক্রবর্তী আরও অনেকের সাথে কাজ করেছি। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্ট্রাগল টা আরও বেড়েছে। বয়স যত বাড়ছে তত বুঝতে পারছি গুরুত্ব কমছে। আমাদেরকে অফ করিয়ে দিয়ে নতুন যারা আসছে তাদের বয়স্ক সাজিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে। এতে কম খরচে কাজ হয়ে যাচ্ছে বড় বড় চ্যানেলগুলোর। যার জন্য বয়স হওয়ার পর স্ট্রাগল করতে হচ্ছে।

* তপন সিনহা, মৃনাল সেনের সেই যুগের থেকে এখনকার যুগে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?
উ: হ্যাঁ এটা ঠিক তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, মৃনাল সেন, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকের সময় ছিল এক ‘স্বর্নালী সময়’। কিন্তু এটাও বলতে হবে যে বর্তমানে কিছু কিছু টিপিকাল কমারসিয়াল ছবি ছাড়া ভালো সিনেমা বানানোর চেষ্টা চলছে। অনেকের হয়তো নাম বলতে পারবো না কিন্ত কৌশিক, সৃজিত এরা ভালো কাজ করছে। কদিন আগে পরমব্রতর একটা সিনেমা দেখলাম ভালো লাগল। কিছু কিছু ভালো সিনেমা হচ্ছে তবে তার পরিমাণটা কম।

* একজন সিনিয়র অভিনেতা হয়ে নতুন নতুন তারকাদের সাথে কাজ করতে কেমন লাগছে?
উ: ভালোই লাগছে অনেকেই খুব ভালো অভিনয় করছে। আমার তো মনে হয় ওদের থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। মাঝে মাঝে টিভিতে দেখি ওদের অভিনয়। কিন্তু আমার মনে হয় আগের থেকে অভিনয় করাটা এখন অনের সহজ হয়ে গেছে কারণ ওরা প্র‍্যাক্টিস করার সময় পায়। একজন সিরিয়ালের অভিনেতা বা অভিনেত্রী কে গোটা এক মাসই শুটিং করতে হয়। তাই তারা চর্চার মধ্যে থাকতে পারে। আমাদের সময় সেই চর্চার সুবিধাটা ছিল না। এখন যেমন একজন নতুন অভিনেতাকে প্রথম দিন খুব নার্ভাস দেখায় সেই এক মাস পর অভিনয়ের সাথে বেশ সরগর হয়ে যায়। কদিন বাদে ফ্ল্যাট, গাড়িও কিনে ফেলে। তাই জন্য দলে দলে লোক এই প্রফেশনে আসছে। সুযোগটা অনেক বেশি ওদের কাছে।

* নতুনদের সাথে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় না তো?
উ: মাঝে মাঝে একটু অসুবিধা হয়। তবে ধৈর্য্য হারাইনা। ওদেরকে ভালোভাবে শেখানোর চেষ্টা করি। কারণ আমার সিনেমার হাতেখড়ি যার কাছে তিনি হলেন তপণ সিনহা। সে কখনও আমাদের ওপর ধৈর্য হারায়নি। বরং কেউ বিরক্ত প্রকাশ করলে উনি বলতেন ওরা নতুন ওদের শিখতে হবে।

* এতদিন তো ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে আছেন। আপনি যেটুকু পরিচিত পেয়েছেন তা নিয়ে কি সন্তুষ্ট?
উ: দেখো সত্যি বলতে কি স্যাটিসফ্যাকশান আসাটাতো উচিত নয়। স্যাটিসফ্যাকশান আসা মানে বুঝতে হবেলোকটির মৃত্যু হয়েছে। তবে একটা ক্ষোভ বা দুঃখ রয়ে গেছে। আমাদের অনায়াসে গ্রামের বা শহরের লোক চিনতে পারলেও আজকালকার যারা চ্যানেলের মাতব্বর তারা আর আমাকে সন্মান করে না। তাদের কাছে আর কোনো দাম নেই আমাদের। অথচ এই মেগাসিরিয়াল গুলোর সূত্রপাত আমাদের হাত ধরেই। আর যার জন্য কোনো এওয়ার্ড ফানশান থেকেও নিমন্ত্রণ পাই না। এখন ব্যাবসাটা তো অন্য রকম হয়ে গেছে। নতুন ছেলে মেয়েদের নাচিয়ে পয়সা তুলছে চ্যানেলগুলো। এটা তো আর আমি পারব না। এই নিয়েই একটা দুঃখ রয়ে গেছে। শুধু আমি নয় অনেকেরই এই অবস্থা।

* আপনার জীবনের এচিভমেন্ট..
উ: এওয়ার্ড পেয়েছি। পায়নি তা না। তবে সেরকম খুব একটা না। তবে আমি যেটা বলতে চাই সেটা হল এখন আর প্রাপ্য সন্মানটুকু পাইনা। এখনও গুটিকয়েক লোকজন আছে যারা মনে রেখেছে। এই দুঃখ টা থেকে থেকে যাবে।

* আপনার কী ছোটোবেলা থেকেই ইচ্ছে সিনেমা জগৎ এ আসার?
উ: না না একদমই না। ছোটোবেলা থেকে নাটক, থিয়েটার করেছি। অভিনয় করতে ভালো লাগে।

* থিয়েটার সম্পর্কে যদি কিছু বলেন..
উ: এখন তো প্রফেশনাল থিয়েটার একদমই উঠে গেছে। কিছু কিছু গ্রুপ থিয়েটার হচ্ছে। ওদের এই চেষ্টাটা ভালো লাগে। এই থিয়েটারের মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে। আমি আর এখন করতে পারছি না বিভিন্ন শারীরিক কারনে। থিয়েটার একটা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। অন স্টেজ সমস্ত ডায়লগ মনে রেখে পাবলিকের রিয়্যাকশন দেখতে পাওয়া। থিয়েটার থিয়েটারের জায়গাটেই রয়েছে। যারা এখনও করছে তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা।

* আপনার সামনের আপকামিং প্রোজেক্ট কী
উ: দেখো ছবি অনেকগুলো হচ্ছে।আবার কিছু কিছুর শুটিং ও শেষ। কিন্তু রিলিজ হচ্ছে না। ফিল্মফেয়ার বলে একটি ছবি জয়শ্রীর পরিচালনায়। খুব খেটে কাজ করেছি সকলে। পাওলি রয়েছে মেন লিডে। আমি ওর বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছি। কিন্তু ওই একই রিলিজ হচ্ছে না বহু কারণে।

* এখনকার দিনের অভিনেতাদের মধ্যে কাকে এগিয়ে রাখবেন অভিনয়ের খাতিরে?
উ: এটা বলাতো খুব মুশকিল। তবে আমার ঋত্বিক ছেলেটিকে ভালো লাগে। শাশ্বত, খরাজ, রুদ্র, অনির্বাণ এরা তো আছেই। এদের অভিনয়ের স্টাইল অনেকটা বিদেশী অভিনেতাদের মতো।

* আর পরিচালনায় দিক থেকে?
উ: এই রে কাকে বলি বলো তো। কৌশিক গাঙ্গুলিকে খুব ভালো লাগে আমার।

* মেগাসিরিয়ালের জনপ্রিয়তা বাড়ার কারনে লোকের সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার পরিমাণ কমে গেছে। এই বিষয়ে কী বলবেন?
উ: হ্যাঁ এটা তো এখন এক অনের বড় সমস্যা। মাসের ৩০ টা দিন মানুষ নিজের চাহিদা মিটিয়ে নিচ্ছে ফলে কেউ আর সিনেমা হলে যাচ্ছে না। আর এখন ইউটিউব, পেনড্রাইভের সৌজন্যে আরও সুবিধা হয়ে যাচ্ছে সিনেমা দেখা।

* সামনেই দুর্গাপূজা। সেই   উপলক্ষ্যে বন্ধুদের যদি কিছু বলেন.
উ: পূজার কদিন তো আনন্দ করবেনই। ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে পুজো আমাদের সবার উৎসব। পুজোর সময় খাওয়া আড্ডার পাশাপাশি এটা ভাবারও সময় এসে গেছে যে ব্রিজগুলো ভেঙে পড়ার ফলে সাধারণ মানুষের নিদারুন ক্ষতি হচ্ছে। এই পুজোতে যে এত টাকা খরচ হচ্ছে সেই টাকাটা যদি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দেওয়া হয় তাহলে খুব ভালো হয়।

সংবাদ টুডের পক্ষ থেকে অগ্রিম শারদীয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ হল এই সাক্ষাৎকার। আর তারপরই আবার শুরু হল রমেন রয় চৌধুরীর ‘জয়ী’ সিরিয়াল দেখা।