দেশভক্তির ললিপপ ও গেরুয়া বসন বাঁচাতে পারবে কি বিজেপিকে?

স্বপন কারিকর
লোকসভা নির্বাচনের আগেই বিপদ-ঘন্টা বেজে গেল গেরুয়া শিবিরে। ৪ লোকসভা ও ১১ বিধানসভা আসনে রাম ধাক্কা খেল বিজেপি। এই ১৫ টি আসনের মধ্যে মাত্র ২ টি তেই জয় পেল গেরুয়া। আর বাকি সবকটি আসনেই বাজিমাত করল বিরোধী জোট প্রার্থীরা। গত উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মোদী -অমিত জুটি মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসিয়েছিলেন গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্য নাথকে।বিজেপি এবং RSS -এর অনেক তাবড় নেতাই তখন বলেছিলেন যোগীকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসানোটা হচ্ছে মোদী -অমিত জুটির মাস্টারস্টোক। এখন সেই মাস্টারস্টোকই বুমেরাং হয়ে দেখা দিয়েছে মোদী -অমিতের কাছে।
এই উপনির্বাচনের পর বেশ কিছু বিজেপি নেতা আঙুল তুলেছেন সেই যোগীর বিরুদ্ধেই। মুখ্যমন্ত্রীকে বিঁধে বিজেপির বিধায়ক শ্যাম প্রকাশ ফেসবুকে লিখেছেন, “মোদীর নামে রাজত্ব পেয়েছেন, কিন্তু জনতার মনের মতো কাজ করতে পারেননি। জনতা ও বিধায়ক ত্রস্ত,প্রশাসন দুর্নীতি গ্রস্ত”।
আসলে এটা হওয়ারই ছিল। গেরুয়া বসনধারী কোনো এক জনকে যদি মুখ্যমন্ত্রী করা হয় তাহলে রাজ্যের সমস্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতি প্রবণ মানুষ কতোটা বিশ্বাস করবে সেটা সন্দেহজনক। মনে রাখতে হবে উত্তরপ্রদেশ কোনো এক হিন্দু রাজ্য নয়। সেখানে তো বটেই অন্যান্য সব রাজ্যতেই কমবেশী সব ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। তাইতো বিশ্বের কাছে ভারত ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ হিসেবেই পরিচিত। ধরা যাক আমাদের পশ্চিম বাঙলাতে টুপি পরিহিত মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী আসনে বসানো হল। সেখানে মুসলিম সম্প্রদায় ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষ কি ওঁকে মেনে নেবেন? অবশ্যই এ বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। কারণ, যে ধর্মীয় কাজকর্ম নিয়েই থাকতে চান তিনি কি করে একটি রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করবেন এবং সবার মন জয় করবেন? এটা হতে পারে না। তাই অন্যান্য বিরোধী দলতো বটেই বিজেপির RSS এরও কেউ মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলছেন,’উনি যোগী নন,ভোগী’। সঙ্গে তকমা পেয়েছেন দুনীতিগ্রস্তেরও।
এবার আসি কংগ্রেসে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর কর্ণাটক নির্বাচনের পর JDS -এর সঙ্গে হাতমিলিয়ে প্রথম মাস্টার স্টোকটা তিনিই দেন। কংগ্রেসের থেকেও কম আসন পাওয়া JDS-এর কুমার স্বামীকে মুখ্যমন্ত্রীর সিংহাসন দিয়ে। এর পর আঞ্চলিক দল গুলির মন জয় করতে শুরু করেন কংগ্রেসের যুবরাজ। আঞ্চলিক দলগুলি বুঝতে পারে যে রাহুল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মোদী বিরোধী হাওয়ায় সকলকে নিয়ে চলতে সক্ষম।
ভারতে ৭৫% রাজ্য এখন বিজেপি শাসিত। বিজেপির হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে বিরোধী জোটগুলিকে যে একত্রিত হতে হবে তা সকলেই বুঝে যায়। ওদিকে যোগীকে হটানোর দাবীও উঠেছে বিজেপির অন্দরেই। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভেবে যোগীকে এখন মোদী -অমিত জুটি না পারছে গিলতে না পারছে দূরে ছু্ঁড়ে ফেলে দিতে।

images (41)
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী বিভিন্ন জনবিরোধী প্রকল্পে যেমন GST,বিমুদ্রাকরণ এবং হাল ফিলের পেট্রোল,ডিজেলের দিন-দিন দাম বৃদ্ধি ও সর্বশেষ রান্নার গ্যাসের দাম অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় বিজেপি বেশ চাপেই পড়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যাবহৃত সামগ্রীর দাম বাড়ায় সংসার চালাতে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। কর্মসংস্থান বা বেতন বাড়ার কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। অথচ এবছরই সাংসদের বেতন ৫০ হাজার থেকে এক লাফে বেড়ে হয়েছে ১ লক্ষ টাকা। আবার ভারতের ১০ টি রাজ্যে ১০০ দিনের কাজের মজুরী এবছর ১ টাকাও বাড়ানো হয়নি। অর্থাৎ যারা সংসার চালাবে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত তাদের উপার্জন ১ পয়সাও বাড়ছে না।কিন্তু পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। আর যারা সাংসদ, কোটিপতি হওয়া সত্ত্বেও তাদের বেতন ১০০% বাড়ানো হল।
আহা, সত্যিই বিকাশ হচ্ছে ভারতের!
২০১৯ এ বিজেপির বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে উপনির্বাচনেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দলিত, সংখ্যালঘু মানুষেরাই মোদীর গদি উলটে দেবে এটা অনেক রাজনীতিবিদেরই ধারণা। সাধারণ ভারতবাসী জীবন ধারণের জন্য নূন্যতম যে পরিকাঠামো দরকার তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।আর অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী এই ৪ বছরে পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই সুট বুট পড়ে, প্লেনে চড়ে বেড়ানোর সুখ ও আনন্দ অনুভব করছেন দুর্ভাগা ভারতবাসীর রাজস্বের টাকা নিয়ে। এরপরও মানুষ গেরুয়াকে ক্ষমতায় আনবেন কিনা তা দেখা যাবে ২০১৯ লোকসভায়।