খেলোয়াড় হিসেবে যা পাইনি কোচ হিসেবে সেটা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি- রঞ্জন চৌধুরি

“খেলোয়াড় হিসেবে যা পাইনি কোচ হিসেবে সেটা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি ,ক্ষোভ টা মেটাতেই হবে” এমনটাই জানালেন ইস্টবেঙ্গলের সহ-কোচ রঞ্জন চৌধুরি
রিয়া বাগ:
টালিগঞ্জ,মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল থেকে শুরু করে মন্টু ঘোষ সব নিয়ে আলোচনা করলেন খোলামনে। প্রত্যেক প্রশ্নে একদম সহসা উত্তর।
প্র: আপনার ফুটবল জীবন শুরুর দিন গুলো কেমন ছিল?
উ: ১৯৯০-১৯৯১ এ শুরু করি। সেই সময়টা এখন কার মতো অবশ্যই ছিল না। এখনতো প্রযুক্তির যুগ, এখন ফোন, মিডিয়ার প্রাচুর্য। আমরাতো শুধু খবরের কাগজের ওপর নির্ভর করে থাকতাম। খেলাধূলাই আমাদের কাছে মুখ্য এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, বিশেষ করে ফুটবল। কিন্ত আমাদের সময় সবাই সব খেলা খেলতো।আমিই যেমন ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন এবং ভলিবল খেলেছি ফুটবলের পাশাপাশি। তখন প্রতিটা অঞ্চলে খেলাধুলার একটা আলাদা পরিবেশ ছিল , যেটা এখন আমাদের শহরের বুকে অন্তত বিলুপ্তপ্রায়, গ্রাম বাঙলায় এখনো কিছু কিছু আছে। শহরের পরিবেশ থেকে সেই জিনিসটা হারিয়ে গেছে। আমরা বোধহয় বড্ড বেশি প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে পরেছি। টিভি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোনতো আরো বেশি করে সময় খেয়ে ফেলছে। পরের জেনারেশনতো বোধহয় আরো এর মধ্যে ঢুকে পরবে।
প্র: একদম গোড়ায় যাদের কাছে আপনি ফুটবলের এবিসিডি শিখেছিলেন তাদের কথা একটু বলুন।
উ: আমি মোট তিন জন কোচের কাছে ফুটবল শিখেছি।তাদের কেউই হয়তো খুব বড় নাম করা কেউ নন কিন্তু সেই মানুষ গুলো আমাদের মতো বহু খেলোয়াড়কে জন্ম দিয়েছেন। তাদের মধ্যে যেমন আছে সমীর বোস, প্রবীর ঘোষ ওনার আবার খগলা দা নামটাই বেশি পরিচিত।
প্র: টালিগঞ্জ ক্লাবের কর্ণধার সদ্য প্রয়াত মন্টু ঘোষের গুরুত্ব আপনার জীবনে কতোটা?
উ: মন্টু দা অমার খুব কাছের একজন ছিল। মন্টু দার ওই সময় কাজই ছিল কোন জুনিয়র ভালো খেলছে তাকে খুঁজে এনে খেলানো, প্রতিষ্ঠা দেওয়া। এরকম কয়েক ছেলের মাঝে আমিও একজন। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে ওনার মতো একজনের নজরে এসেছিলাম। মন্টু দার ক্লাবে ঢোকার আগে আমি ইন্ডিয়া খেলেছি। আমি যখন রাজস্থান খেলছি তখন প্রথম বার রাজীব গান্ধী গোল্ড কাপ হল U- ২১ ইন্ডিয়া। সেখানে আমি অংশগ্রহণ করলাম। খেলে এসে দলের কেউ মোহনবাগান তো কেউ ইস্টবেঙ্গলে সই করেছিল। মন্টু দা আমাকে বলেছিল আর একটা বছর টালিগঞ্জে খেলে যেতে। আমিই একমাত্র টালিগঞ্জে সই করেছিলাম।
প্র: আপনার খেলোয়াড় জীবন টালিগঞ্জ, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল ক্লাবগুলো কেমন ছিল?
উ: টালিগঞ্জে সই করার পরের বছর ৯১-৯২ এ মোহনবাগানে সই করলাম। ৩-৪ বছর খেলার পর ইস্টবেঙ্গলে গেলাম। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ২-৩ বছর খেললাম। ফের মোহনবাগানে ২-৩ বছর খেলে ফিরলাম টালিগঞ্জে। তখন টালিগঞ্জ ন্যাশনাল লিগ খেলে। এখন যেটা আই লিগ নামে খ্যাত। ২০০১-২০০২ এ টালিগঞ্জের হয়ে খেলতে খেলতেই অবসর নিলাম। টালিগঞ্জ, মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল মিলিয়ে মোট ১০ বছর খেলেছি। ইন্ডিয়া টিম খেলেছি, বেঙ্গলের হয়ে সন্তোষ ট্রফি খেলে চ্যাম্পিয়ন ও হয়েছি। ভারতবর্ষের যত গুলো ট্রফি আছে সব আমার আছে। ৫ বার সন্তোষ ট্রফি খেলে ৪ বার জিতেছি। কলকাতা লিগ জিতেছি ৭ বার।
প্র: তাহলে আর কোন ক্ষোভ নেই তো?
উ: না সেটা সঠিক নয়। খামতি বা চাহিদা মানুষের শেষ হয়না। আরো চেয়েছিলাম কিন্তু সেটা হয়নি। আমার মনে হয় খেলোয়াড় হিসেবে আমার যা প্রতিভা ছিল সেটা পরিপূর্ণ করতে পারিনি। সেই কারণেই নিজেকে কোচিংয়ের সাথে এত জড়িয়ে রেখেছি। খেলোয়াড় হিসেবে যা পাইনি কোচ হিসেবে সেটা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ক্ষোভ টা মেটাতে চাই।
প্র: কত বছর হল কোচিংয়ে?
উ: ২০০৬-২০০৭ থেকে শুরু করেছি। ১২ বছর হতে যায়।
প্র: কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা কেমন?
উ: এটা এমন একটা বিশাল বিষয় আমার মনে হয় এখানে মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শেখার আছে।
প্র: খেলোয়াড় জীবনের সাথে কোচের জীবনের তফাৎ কি কি?
উ: দুটোর বিরাট তফাৎ। কারণ কোচিং টা তো বললাম বিশাল বিষয়। তেমনি যখন খেলোয়াড় ছিলাম শুধু নিজের কথা, নিজেকে উন্নত করার কথা ভাবলেই হত।কিন্তু এখন পুরো টিমের কথা ভাবতে হয়। শুধু টিমের খেলোয়াড়দের কথা নয় অফিসিয়াল বিষয় গুলোও দেখতে হয়। কোচিংয়ে অনেক বেশি দায়িত্ব। কো স্টাফ, খেলোয়াড় ও সদস্যদের সাথে কীভাবে মানিয়ে নেবে সব জানতে হবে। এখানে শুধু টেকনিক্যাল সেন্স দিয়ে হবে না এগুলো জরুরি। নাহলে সাফল্য আসবে না। টেকনিক্যাল দিক ও জরুরি কিন্তু ম্যান ম্যানেজমেন্ট জরুরি ৮০% আর চাই লাক।
প্র: আপনাকে কি কখনো মোহনবাগানের কোচিংয়ে দেখা যেতে পারে?
উ: দেখা যেতেই পারে। এটা তো পেশা শুধুই সেন্টিমেন্ট নয়।
প্র: বিখ্যাত ফুটবলারদের ছেলেদের অন্যান্য পেশায় দেখা যাচ্ছে কিন্তু আপনি তো বেশ যত্ন নিয়েই ছেলেকে ফুটবল শেখাচ্ছেন। পরিকল্পনা কি?
উ: যত্ন নিয়ে শেখাচ্ছি ঠিকই। প্রতিভা আছে। কিন্তু চালিয়ে যেতে হবে এভাবেই,মাঝপথে সরে গেলে হবেনা। ওর ওপর কোনো চাপ নেই যে ফুটবল খেলতেই হবে। ওর যা ভালোলাগবে সেটাই করতে বলেছি। কিন্তু আপাতত দেখছি ফুটবলেই মন দিয়েছে।
প্র: বাড়ির পাশের মাঠ জীবনে কতোটা গুরুত্ব রেখেছে?
উ: ওটার গুরুত্ব জীবনে অনেকটাই । বাড়ির পাশে মাঠ ছিল বলেই খেলাটাতে কোনো সমস্যা হয় নি। নিয়ম করে বিকেলে খেলতে চলে যেতাম। অবশ্য পেশা বানাবো ভেবে কখনো খেলিনি। ফুটবল টা খেলেছি ভালোবেসে । ভালোবেসেই এখন কোচিং করছি।